সঞ্চয়ের ১০% থাক সোনায়

যা জানা জরুরি
- বিনিয়োগের কথা উঠলেই অধিকাংশের মাথায় আসে শেয়ার ও স্থির আয়ের প্রকল্প।
- শেয়ারে মূলধন বাড়ানোর সম্ভাবনা, আর স্থির আয়ের প্রকল্পে তুলনামূলক নিরাপত্তা—এই দুইয়ের ভারসাম্যেই তৈরি হয় একটি বিনিয়োগভান্ডার।
- তবে এর সঙ্গে সোনা যোগ করা নিছক বাড়তি ঝুঁকি নেওয়া নয়।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
বিনিয়োগের কথা উঠলেই অধিকাংশের মাথায় আসে শেয়ার ও স্থির আয়ের প্রকল্প। শেয়ারে মূলধন বাড়ানোর সম্ভাবনা, আর স্থির আয়ের প্রকল্পে তুলনামূলক নিরাপত্তা—এই দুইয়ের ভারসাম্যেই তৈরি হয় একটি বিনিয়োগভান্ডার। তবে এর সঙ্গে সোনা যোগ করা নিছক বাড়তি ঝুঁকি নেওয়া নয়। বরং অনিশ্চয়তার সময়ে গোটা বিনিয়োগভান্ডারের ধাক্কা সামলানোর ক্ষমতা বাড়াতে পারে সোনা। সেই কারণেই আর্থিক পরিকল্পনাকারীদের বড় অংশ মোট বিনিয়োগের প্রায় ৫ থেকে ১০ শতাংশ সোনায় রাখার কথা বলেন।
সোনার সবচেয়ে বড় সুবিধা, তার আচরণ অন্য সম্পদের থেকে আলাদা। শেয়ার ও ঋণপত্রের দাম অর্থনৈতিক বৃদ্ধি, সুদের হার, সংস্থার আয় কিংবা সরকারের আর্থিক নীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ভাবে যুক্ত। সোনার দাম আবার প্রভাবিত হয় মুদ্রার মূল্যহ্রাস, ভূরাজনৈতিক সংঘাত, মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা, কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের কেনাকাটা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে নিরাপদ সম্পদের চাহিদায়। ফলে শেয়ারবাজার পড়লেই সোনার দাম বাড়বে—এমন কোনও নিশ্চয়তা নেই। তবে দুই সম্পদ সব সময় একই কারণে বা একই মাত্রায় ওঠানামা করে না।
এই ভিন্ন আচরণই বৈচিত্র্যকরণের মূল কথা। বিনিয়োগের সব টাকা একই ধরনের সম্পদে থাকলে একটি প্রতিকূল ঘটনা গোটা সঞ্চয়কে একসঙ্গে ধাক্কা দিতে পারে। কিন্তু বিভিন্ন সম্পদের মধ্যে সম্পর্ক কম থাকলে একটির ক্ষতি অন্যটির স্থিতিশীলতা বা লাভ দিয়ে কিছুটা সামলানো সম্ভব। সেই অর্থে সোনা দ্রুত মুনাফা করার হাতিয়ার নয়; বরং বিনিয়োগভান্ডারকে আরও শক্তপোক্ত করার একটি উপায়।
আর একটি কারণ মূল্যস্ফীতি। সময়ের সঙ্গে মুদ্রার ক্রয়ক্ষমতা কমতে থাকলে নগদ অর্থের প্রকৃত মূল্যও কমে। ব্যাঙ্কের আমানত বা ঋণপত্র থেকে পাওয়া সুদের হার যদি মূল্যস্ফীতির তুলনায় কম হয়, তা হলে কাগজে টাকা বাড়লেও সেই টাকায় কেনাকাটার ক্ষমতা কমতে পারে। সোনা নিয়মিত সুদ বা লভ্যাংশ দেয় না। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে মুদ্রার অবমূল্যায়নের বিরুদ্ধে মূল্য ধরে রাখার একটি ইতিহাস তার রয়েছে। অবশ্য প্রতি বছর সোনা মূল্যস্ফীতিকে হারাবে, এমন দাবি করা ঠিক নয়। এর গুরুত্ব বেশি বোঝা যায় দীর্ঘ সময়ের গড় ফল এবং সংকটের সময় তার আচরণে।
সঙ্কটের সময় সোনার আর একটি ভূমিকা সামনে আসে। যুদ্ধ, ব্যাঙ্কিং সঙ্কট, ঋণ সমস্যা কিংবা রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ে বিনিয়োগকারীরা এমন সম্পদের দিকে ঝোঁকেন, যার মূল্য কোনও একটি সংস্থা বা সরকারের ঋণ শোধের ক্ষমতার উপর পুরোপুরি নির্ভরশীল নয়। আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃত এবং সহজে কেনাবেচা করা যায় বলে সোনা সেই জায়গায় কিছুটা সুবিধা পায়। তবে ‘নিরাপদ সম্পদ’ মানেই তার দাম কখনও পড়বে না—এমন ধারণা ভুল। স্বল্প মেয়াদে সোনার দামও যথেষ্ট ওঠানামা করতে পারে।
তাহলে ১০ শতাংশই কেন? সোনায় বরাদ্দ খুব কম হলে বৈচিত্র্যকরণের সুবিধা গোটা বিনিয়োগভান্ডারে তেমন প্রভাব ফেলতে নাও পারে। আবার ২০ বা ৩০ শতাংশের মতো বড় অংশ সোনায় রাখলে দীর্ঘ মেয়াদে সম্পদ বৃদ্ধির সম্ভাবনা কমে যেতে পারে। কারণ সোনা কোনও ব্যবসার মতো মুনাফা তৈরি করে না, লভ্যাংশ দেয় না, ঋণপত্রের মতো নিয়মিত সুদও দেয় না। তাই ৫ থেকে ১০ শতাংশকে অনেকের কাছে একটি ব্যবহারযোগ্য সীমা হিসেবে দেখা হয়। তবে ব্যক্তির আর্থিক পরিস্থিতি অনুযায়ী এই অনুপাত বদলাতেই পারে।
ধরা যাক, কারও ১০ লক্ষ টাকার বিনিয়োগভান্ডারে ৬ লক্ষ টাকা শেয়ারে, ৩ লক্ষ টাকা স্থির আয়ের প্রকল্পে এবং ১ লক্ষ টাকা সোনায় রয়েছে। শেয়ারবাজারে বড় পতন হলে সোনার অংশটি সামগ্রিক লোকসানের তীব্রতা কিছুটা কমাতে পারে। আবার সোনার দাম বেড়ে তার অংশ যদি মোট বিনিয়োগের ১৫ শতাংশে পৌঁছে যায়, তখন কিছুটা সোনা বিক্রি করে শেয়ার বা স্থির আয়ের প্রকল্পে টাকা সরানো যায়। অর্থাৎ নির্দিষ্ট অনুপাত ধরে রাখার এই প্রক্রিয়া বিনিয়োগকারীকে দাম বাড়লে কিছুটা বিক্রি এবং অন্য সম্পদ তুলনামূলক সস্তা হলে তা কেনার শৃঙ্খলায় রাখে। বছরে এক বার, অথবা লক্ষ্যমাত্রা থেকে প্রায় ৩–৫ শতাংশ-বিন্দু বিচ্যুতি হলে পুনর্বিন্যাসের কথা ভাবা যেতে পারে।
তবে সোনা কিনতে গিয়ে গয়নার পিছনে ছোটা সব সময় বুদ্ধিমানের কাজ নয়। গয়নায় নির্মাণমূল্য, পণ্য ও পরিষেবা কর, বিশুদ্ধতা যাচাই এবং বিক্রির সময় কাটতির মতো বিষয় থাকে। সোনার মুদ্রা বা দণ্ড কিনলেও সংরক্ষণ এবং চুরির ঝুঁকি রয়েছে। তুলনায় নিয়ন্ত্রিত সোনা বিনিময়-লেনদেন তহবিল বা সোনা-নির্ভর পারস্পরিক তহবিলের মাধ্যমে বিনিয়োগ করলে দাম সম্পর্কে স্বচ্ছতা এবং সহজে কেনাবেচার সুবিধা পাওয়া যায়, পাশাপাশি সংরক্ষণের ঝুঁকিও কমে। ডিজিটাল সোনার ক্ষেত্রে অবশ্য নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, হেফাজত এবং কেনা-বেচার দামের ব্যবধান খতিয়ে দেখা জরুরি। কোন মাধ্যমে খরচ কত, প্রয়োজনে কত সহজে নগদে রূপান্তর করা যাবে এবং কী ধরনের ঝুঁকি রয়েছে—সেগুলিও বিবেচনায় রাখা দরকার।
সবশেষে মনে রাখা জরুরি, ১০ শতাংশ কোনও সর্বজনীন নিয়ম নয়। বয়স, আয়, ভবিষ্যতের আর্থিক দায়, জরুরি তহবিল, ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা এবং পরিবারের হাতে ইতিমধ্যে কতটা সোনা রয়েছে—সবই বিবেচনায় রাখতে হবে। কারও গয়না বা উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সোনাতেই যদি মোট সম্পদের বড় অংশ আটকে থাকে, তা হলে নতুন করে সোনা কেনার প্রয়োজন নাও থাকতে পারে। আবার অত্যন্ত রক্ষণশীল বিনিয়োগকারীর ক্ষেত্রে বরাদ্দ কিছুটা বেশি হতে পারে। দীর্ঘ মেয়াদের তরুণ বিনিয়োগকারীর ক্ষেত্রে তা আবার তুলনামূলক কম রাখার যুক্তিও রয়েছে।
তাই সোনা কেনার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত নয় দ্রুত লাভের আশায় দামের পিছনে ছোটা। বরং শেয়ার ও স্থির আয়ের পাশাপাশি তৃতীয় একটি সম্পদ হিসেবে সোনাকে রাখা—যাতে মূল্যস্ফীতি, বাজারের অস্থিরতা ও সঙ্কটের সময়ে বিনিয়োগভান্ডার কিছুটা ভারসাম্য পায়। সোনা সম্পদ তৈরির প্রধান ইঞ্জিন নয়; তবে ঝড়ের সময়ে সেই ইঞ্জিনকে সচল রাখার কাজে কার্যকর ভারসাম্যরক্ষক হতে পারে।
এটি সাধারণ আর্থিক বিশ্লেষণ, ব্যক্তিগত বিনিয়োগ-পরামর্শ নয়।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



