ঝাড়খণ্ডের গোড্ডায় বিজেপির বুথস্তরের প্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে একসঙ্গে বহু ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার আবেদন জমা দেওয়ার অভিযোগ ঘিরে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অন্তত চারটি বুথের বুথস্তরীয় আধিকারিকেরা জানিয়েছেন, বিজেপি কর্মীরা একাধিক ফর্ম ৭ জমা দিয়েছিলেন। আবেদনগুলির অধিকাংশই মুসলিম ভোটারদের বিরুদ্ধে এবং অনেকগুলি নির্ধারিত বিন্যাসে ছিল না বলে তাঁদের অভিযোগ। তবে আইন বলছে, ফর্ম ৭ জমা পড়া মানেই ভোটার তালিকা থেকে নাম মুছে যাওয়া নয়। প্রতিটি আপত্তির পৃথক তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট ভোটারকে বক্তব্য জানানোর সুযোগ না দিয়ে নাম বাদ দেওয়া যায় না।

গোড্ডার মহেশটিকরি, পাচুয়া কিতা, লোচনি ও বাঘাকোল—এই চার এলাকার বুথ থেকে অভিযোগ পাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন বাসন্তরাইয়ের প্রখণ্ড উন্নয়ন আধিকারিক তথা ভোটার নিবন্ধন আধিকারিক শ্রীমান মারান্ডি। তিনি জানিয়েছেন, আবেদনগুলি কোথা থেকে এসেছে এবং সেগুলি যথাযথ কি না, তা স্পষ্ট না হওয়ায় বুথস্তরীয় আধিকারিকদের আপাতত ব্যবস্থা না নিতে বলা হয়েছিল। মাঠপর্যায়ে যাচাই করে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।

মহেশটিকরির ৯ নম্বর বুথে বিজেপির বুথস্তরীয় প্রতিনিধি সঞ্জীবকুমার রোশন প্রায় ২৫টি ফর্ম ৭ জমা দিয়েছিলেন। বুথস্তরীয় আধিকারিক আনিশা বানোর দাবি, সব ক’টি আবেদনই মুসলিম ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার জন্য এবং পরে আরও ৫০টি আবেদন আনার কথা বলা হয়েছিল। যে ভোটারদের বিরুদ্ধে আপত্তি জানানো হয়েছে, তাঁদের অনেকের নাম ২০০৩ সালের ভোটার তালিকায় রয়েছে।

পাচুয়া কিতায় প্রায় ৭৫টি আবেদন নিয়ে গিয়েছিলেন আর এক বিজেপি প্রতিনিধি। সংশ্লিষ্ট বুথস্তরীয় আধিকারিক মুখতারের দাবি, আবেদনকারী নিজেই জানতেন না ফর্মগুলির উদ্দেশ্য কী। তিনি ভেবেছিলেন, এগুলি নাম তোলার আবেদন। প্রকৃত উদ্দেশ্য জানতে পেরে ওই ব্যক্তি ফর্মগুলি পুড়িয়ে দেন বলেও অভিযোগ। সেই প্রতিনিধিও পরে স্বীকার করেছেন, দলীয় কর্মীদের কাছ থেকে আবেদনগুলি পেয়ে তিনি জমা দিতে গিয়েছিলেন।

তবে ঝাড়খণ্ডের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক কে রবি কুমার বলেছেন, একসঙ্গে বহু ফর্ম ৭ জমা দেওয়া নিজে থেকে বেআইনি নয়। বুথস্তরীয় আধিকারিকেরও সরাসরি আবেদন প্রত্যাখ্যান করা উচিত নয়। তাঁকে আবেদন সহকারী ভোটার নিবন্ধন আধিকারিকের কাছে পাঠিয়ে মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানের ভিত্তিতে পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন দিতে হবে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন ভোটার নিবন্ধন আধিকারিক।

বিশেষ নিবিড় সংশোধনের পরে ৫ আগস্ট প্রকাশিত ঝাড়খণ্ডের খসড়া ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ৪৩ লক্ষ, অর্থাৎ ১৬.৪৮ শতাংশ ভোটারের নাম বাদ পড়েছে। দাবি ও আপত্তি জানানোর সময়সীমা ৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। এই পরিস্থিতিতে কোনও বিশেষ সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে গণহারে ফর্ম ৭ জমার অভিযোগ উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

১৯৫০ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের ২২ নম্বর ধারায় ভোটার নিবন্ধন আধিকারিককে তালিকার ভুল সংশোধন, মৃত ব্যক্তির নাম বাদ দেওয়া কিংবা অন্যত্র স্থায়ীভাবে চলে যাওয়া বা সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রের সাধারণ বাসিন্দা না-থাকা ব্যক্তির নাম অপসারণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তিনি নিজে থেকে অথবা কারও আবেদনের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে পারেন। কিন্তু সিদ্ধান্তের আগে উপযুক্ত তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে বক্তব্য পেশের যুক্তিসঙ্গত সুযোগ দেওয়া বাধ্যতামূলক।

ফর্ম ৭ ব্যবহার করে কোনও ভোটার নিজের নাম বাদ দেওয়ার আবেদন করতে পারেন। আবার একটি বিধানসভা কেন্দ্রের নথিভুক্ত ভোটার অন্য কারও অন্তর্ভুক্তির বিরুদ্ধে আপত্তিও জানাতে পারেন। মৃত্যুর ঘটনা, স্থায়ীভাবে স্থানান্তর, একই ব্যক্তির একাধিক জায়গায় নাম থাকা, নির্ধারিত বয়স পূর্ণ না হওয়া বা ভারতীয় নাগরিক না-হওয়ার মতো কারণ দেখাতে হয়। আবেদনকারীকে নিজের পরিচয়, ভোটার নম্বর এবং আপত্তির নির্দিষ্ট কারণ জানাতে হয়।

প্রাথমিকভাবে কোনও নথি না দিলেও আবেদনকারীকে ঘোষণা করতে হয় যে তাঁর দেওয়া তথ্য নিজের জ্ঞান ও বিশ্বাস অনুযায়ী সত্য। জেনেশুনে মিথ্যা ঘোষণা শাস্তিযোগ্য। জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের ৩১ নম্বর ধারায় মিথ্যা বিবৃতি দিলে কারাদণ্ড, জরিমানা অথবা দুই-ই হতে পারে। ফলে রাজনৈতিক নির্দেশে যাচাই না করে ফর্মে স্বাক্ষর করাও আইনগত ঝুঁকিমুক্ত নয়।

ফর্ম গৃহীত হওয়ার পরে সংশ্লিষ্ট ভোটারকে নোটিস দিতে হবে। তিনি নথি দেখাতে, আপত্তির জবাব দিতে এবং প্রয়োজনে শুনানিতে অংশ নিতে পারবেন। বুথস্তরীয় আধিকারিক বাড়িতে গিয়ে বসবাসের সত্যতা যাচাই করতে পারেন। বাইরে কাজ করতে যাওয়া মাত্রই কেউ সংশ্লিষ্ট এলাকার সাধারণ বাসিন্দার মর্যাদা হারান না। সাময়িক অনুপস্থিতিও নাম বাদ দেওয়ার যথেষ্ট কারণ নয়।

অতএব, ফর্ম ৭ কেবল তদন্ত শুরু করার আবেদন, নাম মোছার পরোয়ানা নয়। গোড্ডায় আবেদনগুলি সত্যিই অযোগ্য বা মৃত ভোটারদের বিরুদ্ধে, না কি ধর্মীয় পরিচয় দেখে বৈধ ভোটারদের বাদ দেওয়ার সংগঠিত চেষ্টা, তা নির্ধারণের দায় নির্বাচন প্রশাসনের। প্রতিটি আবেদন আলাদা করে পরীক্ষা না করে গণহারে নাম বাদ দেওয়া হলে তা শুধু নির্বাচনী বিধির লঙ্ঘন নয়, নাগরিকের সাংবিধানিক ভোটাধিকারকেও বিপন্ন করবে।