সাদা রং টিকল না, যাদবপুরের দেওয়ালে ফিরল প্রতিবাদের ভাষা

যা জানা জরুরি
- যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়াল ঘিরে রাজ্য সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং বামপন্থী ছাত্রসংগঠনগুলির সংঘাত নতুন পর্যায়ে পৌঁছল।
- কর্তৃপক্ষের সাদা রং চব্বিশ ঘণ্টাও অক্ষত থাকল না।
- সোমবার বিকেলে রং, তুলি ও রঙের স্প্রে হাতে নিয়ে ক্যাম্পাসের একের পর এক দেওয়ালে নতুন করে রাজনৈতিক ছবি ও স্লোগান আঁকলেন পড়ুয়ারা।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়াল ঘিরে রাজ্য সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং বামপন্থী ছাত্রসংগঠনগুলির সংঘাত নতুন পর্যায়ে পৌঁছল। কর্তৃপক্ষের সাদা রং চব্বিশ ঘণ্টাও অক্ষত থাকল না। সোমবার বিকেলে রং, তুলি ও রঙের স্প্রে হাতে নিয়ে ক্যাম্পাসের একের পর এক দেওয়ালে নতুন করে রাজনৈতিক ছবি ও স্লোগান আঁকলেন পড়ুয়ারা। কর্মসূচির নাম—‘রিক্লেম ইয়োর ওয়াল’ বা ‘নিজের দেওয়াল ফিরিয়ে নাও’।
রবিবার সন্ধ্যায় ভারতের ছাত্র ফেডারেশনের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় শাখা সমাজমাধ্যমে এই কর্মসূচির ঘোষণা করেছিল। সোমবার কোনও প্রচলিত মিছিল বা বিক্ষোভ হয়নি। বামপন্থী ও অতি-বাম ছাত্রসংগঠনগুলির সদস্যেরা ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে সাদা করে দেওয়া দেওয়ালগুলিতে ছবি ও স্লোগান আঁকেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক জানিয়েছেন, “কেউ স্লোগান দিয়ে মিছিল করেননি। রঙের কৌটো, স্প্রে আর তুলি হাতে নিয়ে দেওয়াল আঁকাই ছিল তাঁদের প্রতিবাদ।”
নতুন দেওয়ালচিত্রে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ভগৎ সিংহ, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার এবং উধম সিংহের প্রতিকৃতি স্থান পেয়েছে। চার নম্বর প্রবেশদ্বারের কাছে রবীন্দ্রনাথের ছবি এঁকে তাঁর ‘ধর্মমোহ’ কবিতার পঙ্ক্তি লেখা হয়েছে—“ধর্মের বেশে মোহ যারে এসে ধরে/অন্ধ সে জন মারে আর শুধু মরে।”
মেঘনাদ সাহা ভবনের পিছনে লেখা হয়েছে—‘ভাবনাকে গুলি করে মারা যায় না’ এবং ‘প্রতিরোধ দীর্ঘজীবী হোক’। ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি জানিয়ে আবার লেখা হয়েছে ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন’। সঙ্গে আঁকা হয়েছে কাটা তরমুজ—যার লাল, সবুজ, কালো ও সাদা রং ফিলিস্তিনি পতাকার প্রতীক হিসেবে বিশ্বজুড়ে ব্যবহৃত হয়। ‘আর্ট এগেনস্ট অপ্রেশন’ নামে ছাত্রদের একটি সাংস্কৃতিক মঞ্চ প্যালেস্টাইনি কবি মাহমুদ দারবিশের কবিতা থেকেও কয়েকটি পঙ্ক্তি লিখেছে। হায়াও মিয়াজাকির ‘পোরকো রোসো’ চলচ্চিত্রের শূকর-চরিত্র এঁকে তার পাশে লেখা হয়েছে—“ফ্যাসিবাদী হওয়ার চেয়ে শূকর হওয়া ভাল।”
ছাত্রদের বক্তব্য, তাঁদের আন্দোলনকে ‘দেশবিরোধী’ বলে চিহ্নিত করার পাল্টা উত্তর হিসেবেই ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের প্রতিকৃতি আঁকা হয়েছে। এসএফআইয়ের স্থানীয় কমিটির সম্পাদক অভিনব বসুর দাবি, সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথের সম্প্রীতি ও আন্তর্জাতিকতাবাদই তাঁদের অস্ত্র। তাঁর কথায়, “দেশপ্রেম আমরা ভগৎ সিংহ, ক্ষুদিরাম, প্রীতিলতা ও উধম সিংহের কাছ থেকে শিখেছি।”
বিতর্কের সূত্রপাত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন সভা থেকে। শুক্রবার তিনি ‘কিষানজি জিন্দাবাদ’, ‘নকশালবাড়িই মুক্তির পথ’ এবং ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার দাবিতে লেখা স্লোগানগুলির তীব্র সমালোচনা করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, যাদবপুরকে মাওবাদী সমর্থকদের অবাধ বিচরণক্ষেত্র হতে দেওয়া হবে না। “রোগও জানি, ওষুধও জানি,”—বলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী।
তার পরেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগ এবং নিযুক্ত ঠিকাদার প্রায় ছয় ঘণ্টা ধরে বিভিন্ন দেওয়াল সাদা করে দেয়। ‘কিষানজি জিন্দাবাদ’, ‘নকশালবাড়িই মুক্তির পথ’, ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন’ এবং ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে হিংসাত্মক বার্তা মুছে ফেলা হয়। চার্লি চ্যাপলিনের একটি দেওয়ালচিত্র, শরজিল ইমামের ছবি এবং মুক্তমঞ্চের কয়েকটি লেখাও সাদা রঙে ঢেকে দেওয়া হয়েছিল। আরও বিতর্ক এড়াতেই সেগুলি মুছে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
উপাচার্য চিরঞ্জীব ভট্টাচার্যের বক্তব্য, বিশ্ববিদ্যালয় রাজনৈতিক দেওয়াল লিখনের বিরোধী নয়; কিন্তু অন্যের অনুভূতিতে আঘাত করতে পারে এমন ‘রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল’ স্লোগান এড়ানো উচিত। একই ধরনের লেখা এবিভিপি-সহ যে সংগঠনই লিখুক, সমানভাবে মুছে দেওয়া হবে বলেও তিনি জানিয়েছেন। তবে মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশেই কাজটি করা হয়েছে কি না, সেই প্রশ্নকে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়’ বলে এড়িয়ে যান।
অন্য দিকে, এবিভিপির যাদবপুর শাখার সভাপতি নিখিল দাসের দাবি, ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন’-এর মতো স্লোগান ক্যাম্পাসে লেখা চলবে না। কর্তৃপক্ষ তা বন্ধ করতে না পারলে উপাচার্য, সহ-উপাচার্য ও নিবন্ধকের পদত্যাগ করা উচিত।
ফলে বিতর্কটি এখন আর কয়েকটি দেওয়ালচিত্রে সীমাবদ্ধ নেই। এক দিকে প্রশাসনের প্রশ্ন—বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়ালে মতপ্রকাশের সীমা কোথায়; অন্য দিকে ছাত্রদের পাল্টা প্রশ্ন—কোন লেখা গ্রহণযোগ্য, তা সরকার বা কর্তৃপক্ষ ঠিক করে দিলে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীন পরিসর কতটা অক্ষুণ্ণ থাকে? সোমবারের ঘটনার পরে অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট—সাদা রং দিয়ে যাদবপুরের রাজনৈতিক বিতর্ক ঢেকে রাখা সহজ নয়।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



