১,২০০ মিটার নীচে আছড়ে পড়ল হিমবাহের খণ্ড, নেপাল–তিব্বতে বিপর্যয় কীভাবে

যা জানা জরুরি
- বুধবার সকালে নেপালের ত্রিশূলী নদীর জলপরিমাপ কেন্দ্রগুলিতে ধরা পড়েছিল ভয়াবহ পরিবর্তন।
- মাত্র আধ ঘণ্টায় কোথাও কোথাও জলস্তর বেড়েছিল নয় মিটার পর্যন্ত।
- পাহাড় থেকে নেমে আসছিল জল, কাদা, বরফ ও পাথরের প্রবল স্রোত।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
বুধবার সকালে নেপালের ত্রিশূলী নদীর জলপরিমাপ কেন্দ্রগুলিতে ধরা পড়েছিল ভয়াবহ পরিবর্তন। মাত্র আধ ঘণ্টায় কোথাও কোথাও জলস্তর বেড়েছিল নয় মিটার পর্যন্ত। পাহাড় থেকে নেমে আসছিল জল, কাদা, বরফ ও পাথরের প্রবল স্রোত। প্রায় ১৭০ কিলোমিটার দক্ষিণ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়া সেই বিপর্যয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় নেপালের সাতটি জেলা। সীমান্তের অন্য দিকে, তিব্বতের গিরংয়েও নামে সংশ্লিষ্ট কাদাধস। চিনের সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানায়, কিছু রাস্তা দু’মিটারেরও বেশি মাটির নীচে চাপা পড়ে গিয়েছে।
প্রদত্ত প্রতিবেদনের হিসাব অনুযায়ী, নেপালে ৩৮০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে। নিখোঁজ প্রায় দেড় হাজার। তিব্বতেও কয়েকশো মানুষের খোঁজ নেই। নিখোঁজদের মধ্যে ভারত-সহ অন্তত ২৯টি দেশের পর্যটক ও বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। প্রথমে মনে হয়েছিল, ভূমিকম্পের অভিঘাতে কোনও হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদের বাঁধ ভেঙে এই হড়পা বান এসেছে। কিন্তু উপগ্রহচিত্র এবং ভূকম্পনের তথ্য বিশ্লেষণে পরে সামনে আসে ভিন্ন ঘটনাক্রম। বিপর্যয়ের সূচনা হয়েছিল হিমবাহের একটি বড় অংশ ভেঙে পড়ায়।
ভূমিকম্পের সংকেত, নাকি বরফধসের অভিঘাত?
বুধবার স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে কাঠমান্ডুর প্রায় ৬৬ কিলোমিটার উত্তরে একটি কম্পন ধরা পড়ে। প্রাথমিকভাবে সেটিকে ৪.৪ মাত্রার ভূমিকম্প বলে মনে করা হয়। কয়েক মিনিটের মধ্যেই তিব্বতের দিকে ভোটে কোশী নদী দিয়ে প্রবল স্রোত নামতে শুরু করে। সকাল ন’টার কিছু পরে নেপালের সীমান্তবর্তী স্যাব্রুবেসি ও তিমুরে আঘাত হানে সেই জলধারা।
সকাল ৯টা ১৫ মিনিটের মধ্যে রাসুয়া জেলা প্রশাসন ত্রিশূলীর নিম্ন অববাহিকায় সতর্কবার্তা পাঠায়। রাসুয়া, নুয়াকোট, ধাদিং, গোর্খা ও চিতওয়ান—এই পাঁচটি জেলার জন্য সতর্কতা জারি হয়। পরে নারায়ণী পর্যন্ত সতর্কতার আওতা বাড়ানো হয়। কিন্তু পাহাড়ি নদীপথ ধরে বিপর্যয় দ্রুত এগিয়ে যাওয়ায় বিপদের প্রকৃতি বোঝার সময় ছিল অত্যন্ত কম।
নেপালের বিদেশমন্ত্রী শিশির খানাল প্রথমে সংসদে জানান, সম্ভবত ভূমিকম্পের জেরে ভূমিধস নেমেছিল। সেই ধসে নদীর প্রবাহ আটকে গিয়ে পরে জমে থাকা জল নীচের দিকে ছুটে আসে। কয়েক ঘণ্টা পরে এই ব্যাখ্যা সংশোধনের প্রয়োজন হয়।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণ সংস্থা ইউএসজিএস জানায়, সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটের সংকেত আসলে হিমবাহের ধস এবং ধ্বংসাবশেষের প্রবাহের অভিঘাত। অর্থাৎ, তাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী কোনও ভূমিকম্প হয়নি। বরফ-পাথরের বিশাল ভর ভেঙে পড়ার কম্পনই যন্ত্রে ধরা পড়েছিল।
কতটা উঁচু থেকে ভেঙে পড়েছিল বরফ?
প্ল্যানেট ল্যাবসের প্রকাশিত উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণ করেন কানাডার ক্যালগারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূপ্রকৃতিবিদ্যার গবেষক ড্যান শুগার। তাঁর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫,২০০ মিটার উচ্চতায় একটি হিমবাহের নীচের অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সেই বরফখণ্ড আছড়ে পড়ে প্রায় ১,২০০ মিটার নীচের উপত্যকার মেঝেতে।
শুগারের হিসাবে, বিচ্ছিন্ন অংশটির বিস্তার ছিল প্রায় ০.২ বর্গকিলোমিটার। এটি বরফের উপরিভাগের আয়তনের হিসাব; মোট কতটা বরফ ভেঙেছে, তার পরিমাপ নয়। তবে এতখানি অংশ এত উঁচু থেকে নেমে আসার পরে চলার পথে আরও উপাদান টেনে নিয়ে ক্রমে বড় হয়েছে ধসের প্রবাহ।
কাঠমান্ডুভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা ইসিমোডের প্রাথমিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছিল, নেপালের দিকে বরফ ও পাথরের ধস ভোটে কোশীর উপনদী লেন্দে খোলাকে আটকে দিয়েছিল। পরে সেই প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে জল নেমে আসে। উপগ্রহচিত্র হিমবাহ ভাঙার বিষয়টি স্পষ্ট করলেও পুরো ঘটনাক্রমের প্রতিটি ধাপ নির্ধারণে আরও অনুসন্ধান প্রয়োজন।
সিকিম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল ভূতত্ত্বের বিশেষজ্ঞ বিক্রম গুপ্ত রয়টার্সকে বলেন, হিমবাহের সামনের অংশের উল্লেখযোগ্য ভাঙন থেকেই ঘটনার সূচনা হয়েছিল বলে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে। তাঁর মতে, সেই প্রবাহে সম্ভবত যথেষ্ট পাথর ও পলিও মিশেছিল অথবা চলার পথে যুক্ত হয়েছিল।
বরফধস থেকে বিধ্বংসী বন্যা
জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক সাইমন অ্যালেনের ব্যাখ্যায়, প্রথমে একটি বিশাল বরফধস নামে, যার মধ্যে সম্ভবত পাথরও ছিল। বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরে সেই ভর ক্রমে তরলসদৃশ প্রবাহের চরিত্র নেয় এবং শেষ পর্যন্ত বিধ্বংসী বন্যায় পরিণত হয়।
এই ব্যাখ্যার তাৎপর্য হল, বিপর্যয়টিকে শুধু নদীর জল বেড়ে যাওয়ার ঘটনা হিসেবে দেখলে তার ধ্বংসক্ষমতা পুরো বোঝা যাবে না। প্রবাহের সঙ্গে ছিল বরফ, পাথর, মাটি ও ধ্বংসাবশেষ। ফলে তার আঘাত ছিল সাধারণ বন্যার চেয়ে আলাদা। নদীপথ ধরে এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে বিপজ্জনক উপাদানের মিশ্রণও বদলাতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার লা ট্রোব এশিয়ার অধিকর্তা রুথ গ্যাম্বল এই ঘটনাকে স্থলভাগের ভিতরে সুনামির মতো বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রায় ১৭০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করা প্রবাহ কাঠমান্ডু ও লাসার মধ্যে পর্যটকদের ব্যবহৃত সড়কেও আঘাত হানে। এই তুলনা স্রোতের ব্যাপ্তি ও আকস্মিকতা বোঝায়; এটি সমুদ্রের সুনামি ছিল না।
পাহাড়ের গায়ে থাকা হিমবাহ ভাঙে কেন?
খাড়া পাহাড়ি ভূখণ্ডে হিমবাহের স্থিতিশীলতা নির্ভর করে ঢাল, বরফের অবস্থা, নীচের জমাট ভূমি এবং আশপাশের পাথরের কাঠামোর উপরে। তাপমাত্রার পরিবর্তন এই ব্যবস্থাকে দুর্বল করতে পারে। সেই কারণেই এমন বিপর্যয়ের সম্ভাব্য পটভূমি হিসেবে বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রসঙ্গ উঠে আসে।
বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে দীর্ঘকাল জমাট থাকা ভূমি বা পারমাফ্রস্টের। তার মধ্যে থাকা বরফ মাটি ও পাথরের বন্ধন ধরে রাখতে সাহায্য করে। উষ্ণতা বাড়লে সেই বরফ গলে বন্ধন শিথিল হতে পারে। অস্ট্রেলিয়ার মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের হিমবাহবিজ্ঞানী অ্যান্ড্রু ম্যাকিনটশের বক্তব্য, উষ্ণায়নের ফলে পাহাড়ি অঞ্চলের এই জমাট ভূমির অবক্ষয় হচ্ছে—এটি জানা বিষয়।
হিমবাহ আবার পাশের পাহাড়ি ঢালকে ঠেকিয়েও রাখে। বরফ সঙ্কুচিত হয়ে পিছিয়ে গেলে সেই অবলম্বন সরে যায়। পাশাপাশি পাথরের ফাটলে জল ঢুকে জমে বরফ হলে প্রসারিত হয়। বার বার জমা ও গলার এই প্রক্রিয়া ফাটলকে বড় করে শিলাস্তর দুর্বল করতে পারে।
উষ্ণতা কি শেষ ধাক্কা দিয়েছিল?
শুগার উপগ্রহচিত্রে লক্ষ করেছেন, উপত্যকার কয়েকটি হিমবাহ বন্যার আগের দিন তুষারে ঢাকা থাকলেও বুধবার সেগুলিতে মূলত উন্মুক্ত বরফ দেখা যাচ্ছিল। এতে তাঁর ধারণা, ধসের আগের ২৪ ঘণ্টায় অস্বাভাবিক উষ্ণতা থাকতে পারে। তবে আবহাওয়া কেন্দ্রের তথ্য দিয়ে তখনও এই পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করা যায়নি।
প্রবল বৃষ্টিরও নথিভুক্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। ফলে অতিবৃষ্টি বা মেঘভাঙা বৃষ্টিকে তাৎক্ষণিক কারণ হিসেবে ধরে নেওয়ার ভিত্তি মেলেনি। একইভাবে ভূমিকম্পের প্রাথমিক ব্যাখ্যাও পরে বাতিল হয়েছে। সম্ভাব্য কারণ এবং প্রমাণিত কারণের এই ফারাক বজায় রাখা জরুরি।
বিজ্ঞানীরা তাই নির্দিষ্ট এই বিপর্যয়ের জন্য এখনই জলবায়ু পরিবর্তনকে সরাসরি দায়ী করতে সতর্ক করছেন। ম্যাকিনটশের মতে, এমন ঘটনার নথি এত কম যে হিমবাহের আকস্মিক পতনের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের নির্দিষ্ট সম্পর্ক স্পষ্টভাবে বলা কঠিন। যদিও হিমবাহের পশ্চাদপসরণের সঙ্গে উষ্ণায়নের সম্পর্ক নিয়ে আস্থা অত্যন্ত বেশি।
ডান্ডি বিশ্ববিদ্যালয়ের হিমবাহবিশেষজ্ঞ সাইমন কুকও বরফ সঙ্কোচন, তুষারগলন এবং জমাট ভূমির অবক্ষয়ের দিকে নজর দিয়েছেন। আপাতত সবচেয়ে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত—বিপর্যয়ের শুরুতে ছিল বিরাট বরফধস। কিন্তু ঠিক কেন সেই মুহূর্তে হিমবাহ ভাঙল, তার চূড়ান্ত উত্তর এখনও অনুসন্ধানসাপেক্ষ।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



