শুভেন্দু অধিকারীর আরও কাছাকাছি পৌঁছতে তাঁর ব্যক্তিগত সহকারীকেই সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন সেই সহকারীর অধীনে কাজ করা এক যুবক—চন্দ্রনাথ রথ হত্যাকাণ্ডের তদন্তে এমনই অভিযোগ সিবিআইয়ের। প্রায় ছ’মাস ধরে প্রস্তুতি, একাধিক রাজ্যে অভিযুক্তদের যাতায়াত, ভুয়ো পরিচয়ে কেনা ফোন ও সিমকার্ড এবং ভাড়াটে খুনিদের ব্যবহারের সূত্র মিলিয়ে হত্যার ষড়যন্ত্রের বিবরণ তৈরি করেছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হয়ে উঠেছে আইক্লাউডে সংরক্ষিত চন্দ্রনাথের একটি ছবি।

গত ৬ মে রাত প্রায় দশটায় মধ্যমগ্রামে নিজের গাড়ির ভিতরে গুলিবিদ্ধ হন চন্দ্রনাথ। হামলায় আহত হন তাঁর সহযোগী বুদ্ধদেব বেরা। এর কয়েক দিন পরেই পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন শুভেন্দু। সিবিআই গত ৭ আগস্ট বারাসতের অতিরিক্ত মুখ্য বিচারবিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে। তদন্তকারীদের দাবি, পরিকল্পনার নেপথ্যে ছিলেন চন্দ্রনাথেরই ২৯ বছর বয়সি সহকারী সাগর সোনকর। তবে অভিযোগপত্রে উল্লিখিত বক্তব্য এখনও আদালতে প্রমাণিত নয়।

তদন্তে উঠে আসা সম্ভাব্য উদ্দেশ্যটি ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও ক্ষোভের। সিবিআইয়ের অভিযোগ, সাগর নিজেকে চন্দ্রনাথের সমকক্ষ মনে করতেন। তাঁর ধারণা হয়েছিল, চন্দ্রনাথকে সরাতে পারলেই শুভেন্দুর ঘনিষ্ঠ হওয়ার পথ খুলবে। সেই ভাবনা থেকে ২০২৫ সালের নভেম্বর নাগাদ তিনি ভাই সাহেব সোনকরকে পরিকল্পনায় যুক্ত করেন বলে তদন্তকারীদের দাবি। অন্যদের নামে ফোন ও সিমকার্ড সংগ্রহ করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল সাহেবকে।

এর পর সাগর যোগাযোগ করেন স্কুলজীবনের বন্ধু বিকাশ মিশ্রের সঙ্গে। উত্তরপ্রদেশের দেওরিয়ার সেলেমপুরের বাসিন্দা বিকাশের পরিচিত ছিলেন বিনয় রাই। সিবিআইয়ের দাবি, হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগের নথি থেকে দেখা যাচ্ছে, ২০২৬ সালের ২০ জানুয়ারি থেকে সাগর ও বিকাশ নিয়মিত যোগাযোগ রাখছিলেন। তদন্তকারীদের অভিযোগ, উদ্দেশ্য ছিল ভাড়াটে খুনি জোগাড় করা। ৩০ জানুয়ারি বিকাশ হোয়াটসঅ্যাপে বিনয়কে ফোন করেন। পরে তিন জনের মধ্যে আরও যোগাযোগ হয়।

তদন্ত অনুযায়ী, ৬ ফেব্রুয়ারি বিনয় তাঁর পরিচিত সঞ্জয় রাইকে যোগাযোগ করেন। সঞ্জয় তখন সুরাতে ছিলেন। তাঁকে ধানবাদে আসতে বলা হয়। সিবিআইয়ের অভিযোগ, সঞ্জয় সেখানে পৌঁছলে বিকাশ একটি বৈঠকের ব্যবস্থা করেন। সাগর, বিনয় ও সঞ্জয় সেই বৈঠকে খুনের পরিকল্পনা এবং তা কার্যকর করার পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করেন বলে তদন্তকারীদের দাবি। এর পর ধানবাদ, কলকাতা, বালিয়া, গাজিপুর-সহ বিভিন্ন জায়গায় অভিযুক্তদের যাতায়াত শুরু হয়।

সাগরের সঙ্গে বৈঠকের কিছু দিনের মধ্যেই সঞ্জয় কলকাতায় এসে ‘পঙ্কজ সিংহ’ নামে একটি হোটেলে ওঠেন বলে অভিযোগ। সিবিআই জানিয়েছে, ১৮ ফেব্রুয়ারি সাগর তাঁকে মধ্যমগ্রাম, চন্দ্রনাথের দফতর এবং বিধানসভা ও হাইকোর্ট সংলগ্ন এলাকা ঘুরিয়ে দেখান। এক ভাড়াগাড়ির চালক তাঁদের শনাক্ত করেছেন বলে তদন্তকারীদের দাবি। সঞ্জয় ওই দিনই ধানবাদে ফিরে যান। তবে মার্চ ও এপ্রিলেও তিনি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে কলকাতায় এসেছিলেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

হামলায় ব্যবহারের জন্য গাড়ি সংগ্রহের ক্ষেত্রেও পরিকল্পিত প্রস্তুতির অভিযোগ রয়েছে। সিবিআইয়ের সংগ্রহ করা নজরদারি ক্যামেরার ফুটেজ অনুযায়ী, ৭ এপ্রিল সঞ্জয়, জ্ঞানেন্দ্র সিংহ ও রাজকুমার সিংহ পাটুলির এক গাড়ি বিক্রেতার কাছে গিয়ে একটি মারুতি সুইফ্‌ট দেখেন। ১৮ এপ্রিল গাড়িটি ৩ লক্ষ ৮০ হাজার টাকায় কেনা হয়। সেই গাড়িতে ধানবাদ যাতায়াতের সূত্রও ফুটেজ ও সড়কশুল্কের নথিতে মিলেছে বলে দাবি তদন্তকারীদের।

সিবিআই আরও জানিয়েছে, অভিযুক্তেরা একটি নিসান মাইক্রা গাড়ি এবং হিরো সুপার স্প্লেন্ডার মোটরসাইকেল সংগ্রহ করেছিলেন। ওই দু’টি যানের ইঞ্জিন ও কাঠামোর শনাক্তকরণ নম্বর মুছে দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ। সমস্ত যানে লাগানো হয়েছিল ভুয়ো নম্বরপ্লেট। বিভিন্ন গাড়ির চলাচল, সড়কশুল্ক মেটানোর তথ্য এবং নজরদারি ক্যামেরার ছবি মিলিয়ে অভিযুক্তদের গতিবিধি পুনর্গঠন করেছে তদন্তকারী সংস্থা।

৩ মে অভিযুক্তদের ধানবাদ থেকে কলকাতায় আসা এবং পরে বিরাটি হয়ে ফিরে যাওয়ার প্রমাণ মিলেছে বলে দাবি সিবিআইয়ের। পরের দু’দিন প্রস্তুতি চলতে থাকে। নিসান মাইক্রার জন্য আরও একটি নম্বরপ্লেট তৈরি করা হয় বলে অভিযোগ। তদন্তকারীদের বক্তব্য, ৬ মে হামলাকারীরা ধানবাদ থেকে কলকাতায় আসে। সে দিন সাগর ফেসটাইমের মাধ্যমে সঞ্জয়কে চন্দ্রনাথের অবস্থান জানান। সঞ্জয় সেই খবর জ্ঞানেন্দ্র ও কৃষ্ণকুমার সিংহের কাছে পৌঁছে দেন বলে অভিযোগ।

ডিজিটাল তথ্যের মধ্যে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে একটি ফোন নম্বরের সঙ্গে যুক্ত আইক্লাউড হিসাবে পাওয়া চন্দ্রনাথের ছবি। সিবিআইয়ের দাবি, ছবিটি ১৮ মার্চ সেখানে সংরক্ষিত হয়েছিল। তখন সংশ্লিষ্ট ফোনটি মধ্যমগ্রামে ছিল। হত্যার অব্যবহিত পরে সাগর ও সঞ্জয়ের ব্যবহৃত বলে চিহ্নিত ফোনের মধ্যে অন্তত এক বার ফেসটাইমে যোগাযোগের তথ্যও মিলেছে। কিছু ক্ষণ পরে আরও একটি ফোন হয়। তদন্তকারীদের ধারণা, চন্দ্রনাথের অবস্থা জানতে সাগর সেটি করেছিলেন।

অভিযোগপত্রে মোট ১২ জনের নাম রয়েছে বলে জানিয়েছে সংবাদপত্রটি। তাঁদের মধ্যে বিহারের কৃষ্ণকুমার সিংহ ছাড়া বাকিরা ধরা পড়েছেন। সাগর ও তাঁর ২০ বছর বয়সি ভাই সাহেবকে গ্রেফতার করা হয় ৩১ জুলাই। অন্য অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন বিকাশ মিশ্র, বিনয় রাই, সঞ্জয় রাই, জ্ঞানেন্দ্র সিংহ, রাজকুমার সিংহ, গোলু সিংহ, নবীনকুমার সিংহ, ময়ঙ্করাজ মিশ্র এবং ভিকি মৌর্য।

সব মিলিয়ে তদন্তের ভিত্তি হয়েছে ফোনের যোগাযোগ, ছবি, নজরদারি ক্যামেরার ফুটেজ ও যাতায়াতের নথির পারস্পরিক যোগসূত্র। হুগলি নদীর তলদেশে পাওয়া একটি ফোনের কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। তবে সেই ফোন থেকে কী তথ্য মিলেছে, সরবরাহ করা অংশে তা স্পষ্ট নয়। আপাতত সিবিআইয়ের অভিযোগ, চন্দ্রনাথের বিশ্বাসভাজন সহকারীর উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকেই দীর্ঘ প্রস্তুতির এই হত্যাচক্রান্তের সূত্রপাত।