তৃণমূল কংগ্রেস ছেড়ে ন্যাশনালিস্ট সিটিজেনস পার্টি অব ইন্ডিয়ার সঙ্গে হাত মেলানো ২০ জন লোকসভা সদস্যের সদস্যপদ খারিজের প্রশ্নে এ বার সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হল তৃণমূল। দলের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় শীর্ষ আদালতে আবেদন জানিয়ে বলেছেন, দলত্যাগবিরোধী আইনে তাঁর দায়ের করা অভিযোগগুলির দ্রুত নিষ্পত্তি করার জন্য লোকসভার অধ্যক্ষ ওম বিড়লাকে নির্দেশ দেওয়া হোক।

সুপ্রিম কোর্টের কার্যতালিকা অনুযায়ী, মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চে আবেদনটির শুনানি হওয়ার কথা। পশ্চিমবঙ্গের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এই মামলার গুরুত্ব যথেষ্ট। কারণ, এর ফল কেবল ২০ জন সাংসদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না; সংসদে তৃণমূলের শক্তি, বিদ্রোহী শিবিরের স্বীকৃতি এবং এনসিপিআইয়ের সঙ্গে তাঁদের প্রস্তাবিত সংযুক্তির বৈধতার উপরেও প্রভাব ফেলতে পারে।

তৃণমূলের অভিযোগ, দলের প্রতীকে নির্বাচিত ওই সাংসদেরা প্রকাশ্যে অন্য একটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন এবং জাতীয় গণতান্ত্রিক জোটের সংসদীয় কর্মকাণ্ডে অংশ নিচ্ছেন। সংবিধানের দশম তফসিল অনুযায়ী, কোনও নির্বাচিত সদস্য স্বেচ্ছায় নিজের দলের সদস্যপদ ত্যাগ করলে তাঁর সদস্যপদ খারিজ হতে পারে। তৃণমূলের বক্তব্য, আনুষ্ঠানিক ইস্তফা না দিলেও বিদ্রোহী সাংসদদের আচরণ থেকে স্পষ্ট যে তাঁরা কার্যত দলের সদস্যপদ ত্যাগ করেছেন।

গত ১৪ জুন ১৯ জন বিদ্রোহী সাংসদ লোকসভার অধ্যক্ষের কাছে চিঠি দিয়ে তাঁদের এনসিপিআইয়ের সঙ্গে সংযুক্তিকে স্বীকৃতি দেওয়ার আবেদন জানান। পরের দিন একই ধরনের চিঠি দেন সাংসদ রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে তাঁদের সেই আবেদন এখনও অনুমোদিত হয়নি। তা সত্ত্বেও সংসদের ভিতরে ওই সাংসদেরা এনসিপিআই গোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত হচ্ছেন এবং এনডিএ-র বিভিন্ন সংসদীয় বৈঠক ও কর্মকাণ্ডে অংশ নিচ্ছেন বলে অভিযোগ।

অন্যদিকে, অভিষেক প্রত্যেক বিদ্রোহী সাংসদের বিরুদ্ধে পৃথক সদস্যপদ খারিজের আবেদন জমা দিয়েছিলেন। তাঁর দাবি, সেই আবেদনগুলির নিষ্পত্তিতে অযৌক্তিক বিলম্ব হচ্ছে। ২৭ জুলাই তিনি লোকসভার অধ্যক্ষকে লিখিত অনুস্মারক পাঠান। পরে ১২ আগস্ট ওম বিড়লার সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অনুরোধ জানান। তাতেও কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়ায় তিনি সুপ্রিম কোর্টে গিয়েছেন।

শীর্ষ আদালতের সামনে প্রধান প্রশ্ন হবে, দলত্যাগের অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য লোকসভার অধ্যক্ষকে কোনও নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া যায় কি না। অতীতের একাধিক মামলায় সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, অধ্যক্ষের কাছে অনির্দিষ্টকাল সদস্যপদ খারিজের আবেদন ফেলে রাখা গ্রহণযোগ্য নয়। তবে সংসদের অভ্যন্তরীণ কার্যপ্রণালি এবং অধ্যক্ষের সাংবিধানিক ক্ষমতার সীমার মধ্যে আদালত কত দূর হস্তক্ষেপ করবে, সেটিই এই মামলার গুরুত্বপূর্ণ দিক।

বিদ্রোহী সাংসদদের পাল্টা যুক্তি হতে পারে, তাঁরা ব্যক্তিগতভাবে দলত্যাগ করেননি; বরং একটি গোষ্ঠী হিসেবে অন্য দলের সঙ্গে সংযুক্ত হতে চেয়েছেন। কিন্তু দশম তফসিলে আগে থাকা ‘বিভাজন’-সংক্রান্ত সুরক্ষা ২০০৩ সালের সংশোধনের মাধ্যমে তুলে দেওয়া হয়েছে। এখন দলত্যাগের হাত থেকে রেহাই পেতে হলে মূল আইনসভা দলের অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যকে অন্য দলের সঙ্গে বৈধ সংযুক্তিতে সম্মতি জানাতে হয়। ফলে ২০ জনের গোষ্ঠী তৃণমূলের মোট লোকসভা সদস্যের দুই-তৃতীয়াংশ কি না এবং সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক সম্মতি রয়েছে কি না, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

শুধু সংসদ নয়, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভাতেও একই ধরনের জটিলতা তৈরি হয়েছে। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন ৬২ জন বিধায়ক তৃণমূল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছেন। কিন্তু তাঁদের সাংবিধানিক ও দলীয় পরিচয় এখনও চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হয়নি। নির্বাচন কমিশনও ঋতব্রত-শিবিরকে ‘প্রকৃত তৃণমূল’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানায়নি।

এই প্রক্রিয়া দীর্ঘ হতে পারে বলে সরকারি আধিকারিকদের একাংশের ধারণা। তাঁদের মতে, শিবসেনার নাম ও প্রতীক নিয়ে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে উদ্ধব ঠাকরের দায়ের করা মামলার ফলাফলের দিকে কমিশন নজর রাখছে। একনাথ শিন্ডের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠীকে প্রকৃত শিবসেনা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার যে সিদ্ধান্ত কমিশন নিয়েছিল, তার বিরুদ্ধে মামলাটি রাজনৈতিক দলের বিভাজন, আইনসভা দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং মূল দলের পরিচয় নির্ধারণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ নজির তৈরি করতে পারে।

তবে তৃণমূলের বর্তমান আবেদন সরাসরি দলের নাম বা প্রতীক নিয়ে নয়। তাদের মূল দাবি, সাংসদদের সদস্যপদ খারিজের আবেদন সম্পর্কে অধ্যক্ষকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্ট যদি লোকসভার অধ্যক্ষের কাছে জবাব চায় অথবা নিষ্পত্তির সময়সীমা নির্ধারণ করে দেয়, তা হলে বিদ্রোহী সাংসদদের উপর চাপ বাড়বে। আবার আদালত বিষয়টিকে অধ্যক্ষের বিবেচনার উপর ছেড়ে দিলে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক অনিশ্চয়তা আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে।