‘আর নয়’: বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু হতেই কানাডার বিরুদ্ধে তোপ ট্রাম্পের, পাল্টা শুল্কের ঘোষণা কার্নির

যা জানা জরুরি
- আমেরিকা ও কানাডার বাণিজ্য আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্ক কার্যত বাণিজ্যযুদ্ধে গড়াল।
- কানাডা থেকে আমদানি করা প্রায় ২ হাজার কোটি ডলার মূল্যের পণ্যের উপর ৫০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর করেছে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন।
- পাল্টা জবাবে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি জানিয়েছেন, আমেরিকার প্রতিটি আঘাতের সমান জবাব দেবে তাঁর দেশ।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
আমেরিকা ও কানাডার বাণিজ্য আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্ক কার্যত বাণিজ্যযুদ্ধে গড়াল। কানাডা থেকে আমদানি করা প্রায় ২ হাজার কোটি ডলার মূল্যের পণ্যের উপর ৫০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর করেছে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। পাল্টা জবাবে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি জানিয়েছেন, আমেরিকার প্রতিটি আঘাতের সমান জবাব দেবে তাঁর দেশ। আমেরিকান পণ্যের উপর কানাডার সমমূল্যের শুল্ক কার্যকর হওয়ার কথা ৮ সেপ্টেম্বর থেকে।
শুক্রবার ওয়াশিংটনে শেষ মুহূর্তে বাণিজ্য আলোচনা ভেঙে পড়েছিল। তার পর প্রথম প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প সমাজমাধ্যমে লেখেন, “কানাডা অঙ্গরাজ্য না হয়েও অঙ্গরাজ্য হওয়ার সুবিধা চায়!” আমেরিকার কৃষকদের কাছ থেকে বহু বছর ধরে কানাডা বিপুল শুল্ক নিয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর সংক্ষিপ্ত ঘোষণা—“আর নয়!”
শনিবার থেকেই কানাডার বিভিন্ন পণ্যের উপর নতুন মার্কিন শুল্ক কার্যকর হয়েছে। তালিকায় রয়েছে হকি খেলার সরঞ্জাম থেকে চিকিৎসায় ব্যবহৃত জিভ পরীক্ষার কাঠি পর্যন্ত বহু পণ্য। বাণিজ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এর ফলে সীমান্তের দুই পাশেই কর্মসংস্থান এবং ছোট ব্যবসায় ধাক্কা লাগতে পারে। তবে অর্থনৈতিক ক্ষতির চেয়েও গভীর হতে পারে রাজনৈতিক অভিঘাত। কারণ, দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র ও প্রধান বাণিজ্য সহযোগী দুই দেশের মধ্যে অবিশ্বাস এখন প্রকাশ্য সংঘাতে পরিণত হয়েছে।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী কার্নি পরিস্থিতিকে সরাসরি যুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করেছেন। অটোয়ায় সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “আপনার উপর আক্রমণ হলে আপনি যুদ্ধে রয়েছেন। আমাদের উপর আক্রমণ হয়েছে।” তাঁর অভিযোগ, শুল্ক বাড়িয়ে ট্রাম্প গুরুতর হিসাবের ভুল করেছেন। আমেরিকা আলোচনায় যে প্রস্তাব দিয়েছে, তা কানাডার পক্ষে গ্রহণ করা সম্ভব নয়; আবার ওয়াশিংটন যে ছাড় দাবি করেছে, সেটিও অটোয়া দিতে রাজি নয়।
অন্য দিকে, মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার দায় চাপিয়েছেন কানাডার উপরেই। তাঁর দাবি, এক বছর ধরে কানাডা পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ায় আমেরিকা বাধ্য হয়ে এই পদক্ষেপ করেছে। মার্কিন শ্রমিক এবং সরবরাহব্যবস্থা রক্ষাই ট্রাম্প প্রশাসনের লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন তিনি। অর্থাৎ, আলোচনা ভাঙার জন্য দুই পক্ষই পরস্পরকে দায়ী করছে।
কানাডার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ ইতিমধ্যেই স্পষ্ট। কানাডিয়ান ফেডারেশন অব ইন্ডিপেনডেন্ট বিজনেসের সভাপতি ড্যান কেলির হিসাব অনুযায়ী, সে দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ ছোট রফতানিকারক নতুন মার্কিন শুল্কের সরাসরি আঘাতের মুখে পড়বেন। প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ব্যবসায়ীর আশঙ্কা, তাঁদের আয় অর্ধেক বা তারও বেশি কমে যেতে পারে।
ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের সমালোচনা এসেছে আমেরিকার ভিতর থেকেও। বিশেষত কানাডা-সংলগ্ন মিনেসোটা, নিউ ইয়র্ক এবং ওয়াশিংটনের ডেমোক্র্যাট নেতা ও প্রশাসকেরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। নিউ ইয়র্কের গভর্নর ক্যাথি হোকুলের অভিযোগ, মিত্র দেশের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় সংঘাত বাধিয়ে ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত দেশের মানুষের জন্যই জিনিসপত্রের দাম বাড়াচ্ছেন। মিনেসোটার সেনেটর অ্যামি ক্লোবুচার বলেছেন, কানাডা তাঁর রাজ্যের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য সহযোগী। নতুন শুল্কের মূল্য দিতে হবে ছোট ব্যবসায়ী, কৃষক এবং সাধারণ পরিবারগুলিকে।
কার্নি অবশ্য ট্রাম্পের চাপ মোকাবিলার প্রতিশ্রুতি দিয়েই গত বছর কানাডার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছিলেন। ব্যাঙ্ক অব ইংল্যান্ডের প্রাক্তন গভর্নর কার্নির রাজনৈতিক উত্থানের পিছনে বড় ভূমিকা নিয়েছিল ট্রাম্পের কানাডাকে আমেরিকার ৫১তম অঙ্গরাজ্য বানানোর হুমকি। ট্রাম্প এমনকি সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য “অর্থনৈতিক শক্তি” প্রয়োগের কথাও বলেছিলেন। ফলে বর্তমান সংঘাত কার্নির জন্য কেবল বাণিজ্যনীতি নয়, কানাডার সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় মর্যাদার প্রশ্নও।
কানাডার পাল্টা শুল্ক ইস্পাত, দুগ্ধজাত সামগ্রী, বৈদ্যুতিক গৃহস্থালি যন্ত্র এবং বৈদ্যুতিন পণ্যের উপর বসতে পারে। কার্নির ভাষায়, জবাব হবে “ডলারের বদলে ডলার”। এই সংঘাতের ফলে আমেরিকা, কানাডা ও মেক্সিকোর মধ্যে উত্তর আমেরিকার বাণিজ্যচুক্তির ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। বছরে প্রায় ২ লক্ষ কোটি ডলারের পণ্য ও পরিষেবা লেনদেন এই চুক্তির আওতায় হয়। নিজের প্রথম মেয়াদে ট্রাম্পই চুক্তিটি স্বাক্ষর করেছিলেন। কিন্তু কানাডা ও মেক্সিকো আরও ১৬ বছরের জন্য নবীকরণের আবেদন জানালেও এ বছর তিনি তাতে সম্মতি দেননি।
বাণিজ্যের বাইরেও দুই দেশের সম্পর্কে ফাটল বাড়ছে। ২০২৫ সালে কানাডা থেকে নিউ ইয়র্কে প্রবেশকারী মানুষের সংখ্যা ২১ শতাংশ কমেছিল; আগের বছরের তুলনায় সফর কমেছিল প্রায় ৩০ লক্ষ। কানাডায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিট হুকস্ট্রাকে বহিষ্কারের দাবিতে একটি আবেদনে প্রায় ২ লক্ষ ৪৮ হাজার মানুষ স্বাক্ষর করেছেন। এক সমীক্ষায় মাত্র ৯ শতাংশ কানাডাবাসী আমেরিকাকে বিশ্বাসযোগ্য মিত্র বলেছেন; ট্রাম্পের মন্তব্যের প্রতিবাদে ৫১ শতাংশ তাঁদের আমেরিকা সফর বাতিল করেছেন।
ফলে বর্তমান শুল্কযুদ্ধ নিছক কয়েকটি পণ্যের দাম বৃদ্ধির ঘটনা নয়। এটি দেখিয়ে দিচ্ছে, ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে দর-কষাকষির মাধ্যমে স্থায়ী সমাধান সম্ভব—কানাডার সেই বিশ্বাস দ্রুত ভেঙে পড়ছে। অর্থনীতির পাশাপাশি উত্তর আমেরিকার পুরনো রাজনৈতিক বন্ধনও এখন কঠিন পরীক্ষার মুখে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



