সংঘর্ষে কলঙ্ক, যাদবপুরে বার্তা

যা জানা জরুরি
- নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা: যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ (এবিভিপি) এবং এসএফআই-সহ বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলির সংঘর্ষের ঘটনায় কড়া বার্তা দিলেন রাজ্যের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত।
- তাঁর বক্তব্য, ছাত্রগোষ্ঠীর মধ্যে এমন প্রকাশ্য শারীরিক সংঘর্ষ শুধু যাদবপুরের গৌরবকেই ম্লান করে না, গোটা পশ্চিমবঙ্গের ভাবমূর্তিতেও আঘাত করে।
- বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য ও মর্যাদা ফিরিয়ে আনতে রাজনৈতিক দল এবং বহিরাগতদের ক্যাম্পাসের উত্তেজনা থেকে দূরে থাকার আবেদন জানিয়েছেন তিনি।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা: যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ (এবিভিপি) এবং এসএফআই-সহ বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলির সংঘর্ষের ঘটনায় কড়া বার্তা দিলেন রাজ্যের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত। তাঁর বক্তব্য, ছাত্রগোষ্ঠীর মধ্যে এমন প্রকাশ্য শারীরিক সংঘর্ষ শুধু যাদবপুরের গৌরবকেই ম্লান করে না, গোটা পশ্চিমবঙ্গের ভাবমূর্তিতেও আঘাত করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য ও মর্যাদা ফিরিয়ে আনতে রাজনৈতিক দল এবং বহিরাগতদের ক্যাম্পাসের উত্তেজনা থেকে দূরে থাকার আবেদন জানিয়েছেন তিনি।
শুক্রবার এক ভিডিয়ো-বার্তায় স্বপন বলেন, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় প্রায়ই ‘ভুল কারণে’ সংবাদে উঠে আসে। দু’টি ছাত্রগোষ্ঠীর মধ্যে এমন সংঘর্ষ অত্যন্ত দুঃখজনক বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর কথায়, এই ধরনের ঘটনা রাজ্যের বদনাম করে এবং দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে যাদবপুরের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত করে।
বুধবার রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল ও প্রযুক্তিবিদ্যা ছাত্র সংসদের সাধারণ সভাকে ঘিরেই বিবাদের সূত্রপাত। গত ছ’বছর যাদবপুরে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়নি। এবিভিপির অভিযোগ, নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকা সত্ত্বেও বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলি একতরফা ভাবে ছাত্র সংসদ গঠনের চেষ্টা করছিল। তার প্রতিবাদ করতেই তাদের সদস্যদের উপর হামলা চালানো হয় বলে দাবি এবিভিপির। অন্য দিকে, বাম ছাত্র সংগঠনগুলির অভিযোগ, লাঠিসোঁটা নিয়ে বহিরাগতদের ক্যাম্পাসে ঢুকিয়ে পরিকল্পিত ভাবে হামলা চালায় এবিভিপি।
সংঘর্ষে দু’পক্ষেরই বেশ কয়েক জন আহত হন। এবিভিপির যাদবপুর শাখার সভাপতি নিখিল দাস-সহ দু’জনকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। বাম ছাত্র সংগঠনগুলির দাবি, তাদের অন্তত পাঁচ সদস্যও আহত হয়েছেন। সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি ভিডিয়োয় মোটরবাইকে করে কয়েক জনকে লাঠি হাতে ক্যাম্পাসে ঢুকতে, স্লোগান দিতে এবং অরবিন্দ ভবনের কাছে দেওয়ালচিত্র ও পতাকা ছিঁড়ে আগুন ধরাতে দেখা যায়। তবে ভিডিয়োগুলির সত্যতা স্বাধীন ভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। পুলিশ এসে বহিরাগতদের ক্যাম্পাস থেকে বার করে দেয় বলে জানিয়েছে।
বৃহস্পতিবার পরিস্থিতি ক্যাম্পাস ছাড়িয়ে যাদবপুর থানা ও বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়ে। এবিভিপি ও বামপন্থী সংগঠনগুলির মিছিল-পাল্টা মিছিল ঘিরে উত্তেজনা তৈরি হয়। পুলিশের ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা, ডিম ও জলের বোতল ছোড়া, পতাকা পোড়ানো এবং ধস্তাধস্তির মতো ঘটনাও ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স মোতায়েন করতে হয়।
তবে পুরো ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আঘাত করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশপথে থাকা ঐতিহাসিক প্রতীকচিহ্নের ক্ষতি। নন্দলাল বসুর পরিকল্পনায় তৈরি ওই প্রতীক যাদবপুরের ইতিহাস ও পরিচয়ের সঙ্গে গভীর ভাবে জড়িত। স্বপনের কথায়, প্রতীকটি হয়তো পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি এবং মেরামতও করা সম্ভব। কিন্তু তার ‘অবমাননা’ হয়েছে—এ নিয়ে কোনও সংশয় নেই।
যাদবপুরের ঐতিহাসিক গুরুত্বের কথাও মনে করিয়ে দেন অর্থমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিকড় ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং জাতীয় শিক্ষা আন্দোলনের সঙ্গে গভীর ভাবে যুক্ত। শ্রীঅরবিন্দের নেতৃত্বে জাতীয় শিক্ষা আন্দোলনের যে ধারার সূচনা হয়েছিল, যাদবপুরের প্রতিষ্ঠার ইতিহাস তারই সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। তাই শিক্ষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে এই প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা অন্য রকম। রাজনৈতিক সংঘর্ষে সেই ঐতিহ্যকে অসম্মান করা কোনও পক্ষেরই উচিত নয়।
ঘটনার পর রাজনৈতিক নেতাদেরও সংযত থাকার আবেদন জানিয়েছেন স্বপন। তাঁর বক্তব্য, ছাত্ররা কোন পথে চলবেন, সেই সিদ্ধান্ত তাঁদের উপরই ছেড়ে দেওয়া উচিত। বহিরাগতদেরও ক্যাম্পাসের বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করাই মঙ্গল। সব রাজনৈতিক রঙের নেতাদের যাদবপুরের পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত করা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে তাঁর দাবি, এটি কোনও দলীয় রাজনৈতিক বার্তা নয়; যাদবপুরের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ থেকেই তিনি এই আবেদন জানাচ্ছেন।
এদিকে উপাচার্যের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি ও বহিরাগতদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে যাদবপুর থানার পুলিশ। জোর করে ক্যাম্পাসে প্রবেশ, অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও ভয় দেখানোর অভিযোগে সরকারি সম্পত্তি নষ্ট প্রতিরোধ আইনের ৩ ও ৪ ধারা এবং ভারতীয় ন্যায় সংহিতার একাধিক ধারা প্রয়োগ করা হয়েছে। বেআইনি জমায়েত, দাঙ্গা, আঘাত, অবরোধ এবং সম্পত্তি নষ্টের মতো অভিযোগও রয়েছে। তদন্ত চলছে।
এর মধ্যেই উঠছে নিরাপত্তা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন—রাতে বহিরাগতরা কী ভাবে ক্যাম্পাসে ঢুকলেন? পুলিশ কি আগেই পরিস্থিতি আঁচ করতে পারেনি? বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব নিরাপত্তাব্যবস্থাই বা কেন কার্যকর হল না? কর্তৃপক্ষ অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি গঠনের পাশাপাশি ক্যাম্পাস সংলগ্ন এলাকায় পুলিশ ফাঁড়ি তৈরির বিষয়টি ভাবছে। প্রয়োজনে ২৪ ঘণ্টা পুলিশ মোতায়েনের কথাও জানিয়েছেন উপাচার্য চিরঞ্জীব ভট্টাচার্য।
স্বপনের বার্তা, এখন রাজনৈতিক আধিপত্যের লড়াই নয়, যাদবপুরকে তার পুরনো পরিচয়ে ফিরিয়ে আনাই অগ্রাধিকার। শিক্ষা, গবেষণা এবং মুক্ত চিন্তার উৎকর্ষই যেন আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান পরিচয় হয়ে ওঠে—এই আবেদনই তাঁর। তাঁর মতে, যাদবপুরের গৌরব ফিরলে শুধু বিশ্ববিদ্যালয় নয়, গর্বিত হবে গোটা পশ্চিমবঙ্গও।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



