‘ভেবেছিলাম মরে যাব, শ্বাস নিতে পারছিলাম না’: মির্জা গালিব স্ট্রিটে মৃত্যুফাঁদ হয়ে উঠেছিল হোটেল

যা জানা জরুরি
- কলকাতার প্রাণকেন্দ্রে শতবর্ষের একটি পাঁচতলা বাড়ি।
- তার ভিতরে গাদাগাদি করে এক ডজনেরও বেশি ছোট হোটেল।
- জানালায় লোহার শিক, কোথাও বেরোনোর পথ রুদ্ধ, সর্বত্র ঝুলছে বিদ্যুতের তার।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
কলকাতার প্রাণকেন্দ্রে শতবর্ষের একটি পাঁচতলা বাড়ি। তার ভিতরে গাদাগাদি করে এক ডজনেরও বেশি ছোট হোটেল। অধিকাংশ হোটেলে চার-পাঁচটি করে খুপরির মতো ঘর। জানালায় লোহার শিক, কোথাও বেরোনোর পথ রুদ্ধ, সর্বত্র ঝুলছে বিদ্যুতের তার। আগুন লাগার বিপদ সম্পর্কে অতিথিদের সতর্ক করার কোনও ঘণ্টাও ছিল না। বুধবার গভীর রাতে আগুন ছড়িয়ে পড়ার পরে ১৫ নম্বর মির্জা গালিব স্ট্রিটের এই বাড়িটি তাই কার্যত মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছিল।
বাড়িটির দ্বিতীয় তলায় থাকা শিখা ইন হোটেলে রাত দুটো নাগাদ আগুন লাগে। ধোঁয়া এবং আগুন দ্রুত উপরের তলাগুলিতে ছড়িয়ে পড়ে। ঘুমন্ত অতিথিদের অধিকাংশই আগুনের সতর্কবার্তা শুনে নয়, অন্যদের চিৎকারে জেগে ওঠেন। অন্ধকারে ধোঁয়ায় ঢেকে গিয়েছিল ঘর ও বারান্দা। সিঁড়ি দিয়ে নামার পথও তখন প্রায় বন্ধ। ভয়াবহ এই অগ্নিকাণ্ডে ন’জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে চিকিৎসার জন্য কলকাতায় আসা একই পরিবারের চার সদস্য এবং ঝাড়খণ্ডের এক তরুণ হোটেলকর্মীও রয়েছেন।
পঞ্চাশ বছর বয়সি মহম্মদ নাজমুল চিকিৎসার জন্য কলকাতায় এসেছিলেন। তিনি হোটেলের চারতলায় ছিলেন। গভীর রাতে ‘আগুন, আগুন’ চিৎকারে তাঁর ঘুম ভাঙে। দরজা খুলেই দেখেন, চার দিক ঘন কালো ধোঁয়ায় ঢেকে গিয়েছে। কিছুই দেখা যাচ্ছে না। নিচে নামার উপায় না পেয়ে কোনও রকমে ছাদে পৌঁছন তিনি। পরে দমকলকর্মীরা সেখান থেকে তাঁকে এবং আরও কয়েকজনকে উদ্ধার করেন।
সেই মুহূর্তের কথা বলতে গিয়ে নাজমুল জানিয়েছেন, হোটেলের ঘর এবং যাতায়াতের পথ এতটাই সঙ্কীর্ণ ছিল যে পালানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছিল। ধোঁয়ায় অক্সিজেনের অভাব দেখা দেয়। তাঁর মনে হয়েছিল, আর বাঁচবেন না। শ্বাস নেওয়ার শক্তিটুকুও যেন ফুরিয়ে আসছিল। শেষ পর্যন্ত ছাদে পৌঁছতে পারাই তাঁকে বাঁচিয়েছে।
উত্তরপ্রদেশ থেকে কলকাতা ঘুরতে এসেছিলেন বিশের কোঠায় থাকা পৃথ্বী এবং তাঁর বন্ধু পঙ্কজ আগারি। সারা দিন ঘোরাঘুরির পরে ক্লান্ত দুই বন্ধু রাতের খাবার খেয়েই ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। রাত আড়াইটে নাগাদ চিৎকার শুনে তাঁদের ঘুম ভাঙে। তাঁরা ছিলেন তিনতলায়। ঘর থেকে বেরিয়েই দেখেন, ধোঁয়ায় সামনের কিছুই দেখা যাচ্ছে না।
পৃথ্বী প্রথমে বন্ধুকে জাগিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামার চেষ্টা করেন। কিন্তু বাড়ির লোহার সিঁড়ি আগুনের উত্তাপে এতটাই গরম হয়ে গিয়েছিল যে তাতে পা রাখা অসম্ভব ছিল। অন্য দিকে, ছাদে ওঠার পাকা সিঁড়িটি ছিল অত্যন্ত সরু—এক বারে মাত্র একজন সেখান দিয়ে যেতে পারেন। প্রাণ বাঁচাতে শেষ পর্যন্ত তাঁরা তিনতলা থেকে ঝাঁপ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
বারান্দার বাইরে বেরিয়ে বাতানুকূল যন্ত্রগুলির উপর পা রেখে এগোতে শুরু করেন দুই বন্ধু। একটি যন্ত্র থেকে অন্যটিতে পা রাখার সময়ে তাঁদের একমাত্র আশঙ্কা ছিল, সেটি যদি ভেঙে পড়ে। নিচে একটি অ্যাসবেস্টসের চালা দেখতে পেয়ে তাঁরা সেখানেই ঝাঁপ দেন। পৃথ্বী পিছলে পড়ে পায়ে আঘাত পেলেও প্রাণে বেঁচে যান। তাঁর কথায়, বেঁচে ফিরে আসা কার্যত ঈশ্বরের কৃপা।
বাংলাদেশ থেকে আসা কাওসার হোসেন স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে প্রথম তলায় ছিলেন। হোটেলের কর্মীরা দরজায় ধাক্কা দিয়ে আগুনের খবর দেওয়ার পর তাঁরা দ্রুত বাইরে বেরিয়ে আসেন। বাইরে পৌঁছে কাওসারের মনে পড়ে, তাঁদের পাসপোর্ট ঘরেই রয়ে গিয়েছে। বিপদের মধ্যেই তিনি আবার হোটেলে ঢুকে নথিগুলি উদ্ধার করেন।
কিন্তু বাংলাদেশের সাংবাদিক দেবাশিস দত্তের পরিবারের কেউ বেরোতে পারেননি। দেবাশিস, তাঁর স্ত্রী আফসানা শিরমিন, তাঁদের চার বছরের ছেলে স্বর্ণাশিস এবং আফসানার বাবা আকরাম আলি—চারজনই আগুনে প্রাণ হারান। পরিবারটি ৩ আগস্ট ভারতে এসেছিল। আফসানার চিকিৎসার জন্য দেবাশিস স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে বেঙ্গালুরু গিয়েছিলেন। আকরাম কলকাতায় ছিলেন। চিকিৎসা শেষে তাঁরা কলকাতায় ফিরে এই হোটেলে উঠেছিলেন।
নিহতদের মধ্যে রয়েছেন ঝাড়খণ্ডের গিরিডির বাসিন্দা, ১৯ বছরের সন্দীপ পাসোয়ানও। বাবার মৃত্যুর পরে সংসারের পাশে দাঁড়াতে পড়াশোনা ছেড়ে মাত্র পাঁচ মাস আগে তিনি কলকাতায় এসেছিলেন। শিখা ইনেই কাজ করতেন এবং টাকা বাঁচাতে হোটেলের মধ্যেই থাকতেন।
সন্দীপের কাকা সীতারাম পাসোয়ানই তাঁর জন্য কাজটির ব্যবস্থা করেছিলেন। কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের মর্গের বাইরে দাঁড়িয়ে সীতারাম জানান, রাত তিনটে নাগাদ হোটেলে আগুন লাগার খবর পেয়ে তাঁকে হাসপাতালে যেতে বলা হয়। সেখানে পৌঁছে তিনি জানতে পারেন, সন্দীপ মারা গিয়েছেন। পরিবারের মুখোমুখি কী ভাবে হবেন, তা ভেবেই ভেঙে পড়েছিলেন তিনি।
পুলিশ জানিয়েছে, মৃত ন’জনের মধ্যে সাতজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে দু’জন ভারতীয় এবং পাঁচজন বাংলাদেশের নাগরিক। সন্দীপ ছাড়াও নিহত ভারতীয় হলেন শিলিগুড়ির ৬৮ বছরের যোগ নারায়ণ আগরওয়াল। বাংলাদেশের আর এক নিহতের নাম বাবু আহমেদ।
আগুনের পরে সামনে এসেছে বাড়িটির ভয়াবহ অগ্নিনিরাপত্তাহীনতার ছবি। শতবর্ষের পাঁচতলা বাড়িটিতে এক ডজনেরও বেশি হোটেল চলছিল। ঘরগুলি ছিল ছোট এবং গাদাগাদি। অধিকাংশ জানালা লোহার শিক দিয়ে বন্ধ। বাড়িজুড়ে বিপজ্জনক ভাবে বিদ্যুতের তার ঝুলছিল। কোনও অগ্নিসঙ্কেত ব্যবস্থা ছিল না। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, নিয়ম ভেঙে দুটি বাড়িকে জুড়ে দেওয়া হয়েছিল। লোহার সিঁড়িই ছিল অতিথিদের যাতায়াতের অন্যতম পথ; আগুনে তা উত্তপ্ত হয়ে পালানোর পথ বন্ধ করে দেয়।
স্থানীয়দের দাবি, ২০১৫ সালের পর ওই এলাকায় অনুমোদনহীন ছোট হোটেলের সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশ থেকে আসা মানুষদের কাছে কম ভাড়ার এই হোটেলগুলি বিশেষ জনপ্রিয়। কিন্তু অতিথিদের নিরাপত্তার মৌলিক ব্যবস্থাও সেখানে ছিল না। আরও বিস্ময়ের বিষয়, ঘটনাস্থল থেকে রাজ্য দমকল দফতরের সদর কার্যালয় অতি কাছেই; এক কিলোমিটারের মধ্যে কলকাতা পুরসভা এবং নিউ মার্কেট থানাও রয়েছে। তা সত্ত্বেও বছরের পর বছর এই বিপজ্জনক ব্যবস্থার দিকে প্রশাসনের নজর পড়েনি।
ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পরে দমকল ও জরুরি পরিষেবা প্রতিমন্ত্রী কৌশিক চৌধুরী জানান, বাড়িটির ভিতরের অবস্থা দেখে তিনি স্তম্ভিত। এতগুলি হোটেল কী ভাবে অনুমতি পেল এবং কারা সেগুলিকে চালাতে দিল, তা তদন্ত করে দেখা হবে। পুর ও নগরোন্নয়নমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল জানিয়েছেন, অগ্নিনির্গমন পথ বন্ধ ছিল বলে তিনি জানতে পেরেছেন। হোটেলগুলির বাণিজ্যিক অনুমতি এবং অগ্নিনিরাপত্তার ছাড়পত্র কারা দিয়েছিল, সেই প্রশ্নও তুলেছেন তিনি। একটি তদন্তকারী দল গঠন এবং বেআইনি হোটেল বন্ধের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী পূর্ববর্তী তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে অগ্নিনিরাপত্তা বিধি উপেক্ষা করার অভিযোগ তুলেছেন। তবে রাজনৈতিক দায় চাপানোর লড়াইয়ের ঊর্ধ্বে যে প্রশ্নটি থেকে যাচ্ছে তা হল—কলকাতার কেন্দ্রস্থলে, একাধিক প্রশাসনিক কার্যালয়ের এত কাছে, সতর্কবার্তার ঘণ্টাহীন, রুদ্ধ জানালা ও উত্তপ্ত হয়ে ওঠা লোহার সিঁড়িসমেত এই হোটেলগুলি এত দিন চলল কী ভাবে? মির্জা গালিব স্ট্রিটের ন’টি মৃত্যু সেই প্রশাসনিক উদাসীনতারই নির্মম মূল্য।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



