নয়টি প্রাণ ঝলসে গেল হোটেল নামক জতুগৃহে

যা জানা জরুরি
- কলকাতার প্রাণকেন্দ্রে একটি পুরনো বহুতলে গভীর রাতে আগুন লেগে মৃত্যু হল ন’জনের।
- তাঁদের মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশের কুষ্টিয়ার এক সাংবাদিক, তাঁর স্ত্রী, তিন বছরের পুত্র এবং শ্বশুর।
- নিহতদের তালিকায় ঝাড়খণ্ডের এক বাসিন্দাও রয়েছেন বলে পুলিশ সূত্রের খবর।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
কলকাতার প্রাণকেন্দ্রে একটি পুরনো বহুতলে গভীর রাতে আগুন লেগে মৃত্যু হল ন’জনের। মৃতদের মধ্যে পাঁচজন বাংলাদেশের নাগরিক। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশের কুষ্টিয়ার এক সাংবাদিক, তাঁর স্ত্রী, তিন বছরের পুত্র এবং শ্বশুর। নিহতদের তালিকায় ঝাড়খণ্ডের এক বাসিন্দাও রয়েছেন বলে পুলিশ সূত্রের খবর। আহত হয়েছেন অন্তত ছ’জন। বুধবার রাত প্রায় দুটোয় মির্জা গালিব স্ট্রিটের ১৫এইচ নম্বর ঠিকানায় এই অগ্নিকাণ্ড ঘটে।
পুলিশ এবং দমকল সূত্রে জানা গিয়েছে, পুরনো পাঁচতলা ভবনটির ভিতরে একাধিক ছোট আবাসিক হোটেল চলত। আগুনের সূত্রপাত হয় দ্বিতীয় তলায় অবস্থিত ‘শিখা ইন’ নামে একটি হোটেলে। গভীর রাত হওয়ায় তখন অধিকাংশ আবাসিক ঘুমিয়ে ছিলেন। আগুনের চেয়ে ঘন কালো ধোঁয়াই দ্রুত গোটা ভবনে ছড়িয়ে পড়ে। সংকীর্ণ সিঁড়ি, ছোট ছোট ঘর, পর্যাপ্ত জানলার অভাব এবং অবরুদ্ধ বেরোনোর পথের কারণে আবাসিকদের অনেকেই বাইরে আসতে পারেননি।
মৃত পাঁচ বাংলাদেশি নাগরিকের পরিচয় নিশ্চিত করেছে কলকাতায় বাংলাদেশের উপদূতাবাস। তাঁরা হলেন কুষ্টিয়ার সাংবাদিক দেবাশিস দত্ত, তাঁর স্ত্রী আফসানা শিম্মিন, তাঁদের তিন বছরের পুত্র স্বর্ণাশিস দত্ত, আফসানার বাবা মহম্মদ আকরাম আলি এবং ঢাকার সাভারের বাসিন্দা আহমেদ বাবু। দেবাশিস বাংলাদেশের কুষ্টিয়ায় সাংবাদিকতা করতেন। বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, তিনি ‘আজকের পত্রিকা’ এবং একটি বেসরকারি বৈদ্যুতিন সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
চিকিৎসার জন্যই পরিবারটিকে ভারতে আসতে হয়েছিল। তাঁরা প্রথমে বেঙ্গালুরু গিয়েছিলেন। সেখান থেকে মঙ্গলবার কলকাতায় ফিরে মির্জা গালিব স্ট্রিটের ওই হোটেলে ওঠেন। বুধবারই তাঁদের বাংলাদেশে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু দেশে ফেরার কয়েক ঘণ্টা আগেই আগুন কেড়ে নিল পরিবারের চার সদস্যকে।
এই পরিবারের একমাত্র জীবিত সদস্য দেবাশিসের আট বছরের মেয়ে পাখি। সে বাবা-মা এবং ছোট ভাইয়ের সঙ্গে ভারতে আসেনি; বাংলাদেশেই ছিল। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে বাবা, মা, ভাইকে হারিয়েছে শিশুটি। বাংলাদেশে দেবাশিসের সহকর্মী এবং আত্মীয়দের মধ্যে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
পঞ্চম বাংলাদেশি আহমেদ বাবু ঢাকার সাভারের আমিনবাজার এলাকার বাসিন্দা বলে উপদূতাবাস সূত্রে জানানো হয়েছে। বাংলাদেশের উপদূতাবাসের আধিকারিকেরা ঘটনাস্থল, থানা এবং মর্গে গিয়ে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। মৃতদের পরিচয় যাচাই করে পরিবারের সদস্যদের খবর দেওয়া হয়। দেহ বাংলাদেশে ফেরানোর প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়াতেও উপদূতাবাস সাহায্য করছে। আহত ছ’জন বাংলাদেশি নাগরিককে প্রাথমিক চিকিৎসার পরে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে বাংলাদেশের বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছে।
দমকলের কাছে রাত ২টা ৭ মিনিট নাগাদ খবর পৌঁছয়। এক মিনিটের মধ্যেই উদ্ধার অভিযান শুরু হয় বলে দমকলমন্ত্রী কৌশিক চৌধুরী জানিয়েছেন। পাঁচটি দমকলের ইঞ্জিনের পাশাপাশি পুলিশ এবং বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর কর্মীরা ঘটনাস্থলে যান। প্রায় ৮০ জনকে ভবনটি থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। কয়েক ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও ঘন ধোঁয়ার কারণে উদ্ধারকারীদের উপরের তলাগুলিতে পৌঁছতে সমস্যা হয়।
ন’জনকে অচৈতন্য অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন। মৃতদের মধ্যে ছ’জন পুরুষ, দু’জন মহিলা এবং একটি শিশু রয়েছে। প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছে, অধিকাংশেরই আগুনে পুড়ে নয়, বিষাক্ত ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে মৃত্যু হয়েছে। তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত মৃত্যুর নির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
ভবনটির অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে ইতিমধ্যেই গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। দমকলের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে জানা গিয়েছে, অনেক ঘরেই কোনও জানলা ছিল না। সিঁড়ি ছিল অস্বাভাবিক সরু। ভবনের পিছনে জরুরি বহির্গমনের রাস্তা থাকার কথা থাকলেও অন্য একটি নির্মাণের কারণে সেটি কার্যত বন্ধ হয়ে গিয়েছিল বলে অভিযোগ। একই ভবনের ভিতরে ছোট ছোট ঘর তৈরি করে একাধিক হোটেল চালানো হচ্ছিল।
ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পরে দমকলমন্ত্রী বলেন, ভিতরের পরিস্থিতি দেখে তিনি স্তম্ভিত। কীভাবে এতগুলি হোটেল ওই ভবনে চলছিল, তাদের বৈধ বাণিজ্যিক অনুমতি এবং দমকলের ছাড়পত্র ছিল কি না, তা পরীক্ষা করা হবে। প্রাথমিকভাবে বৈদ্যুতিক গোলযোগ অথবা বাতানুকূল যন্ত্রে বিস্ফোরণ থেকে আগুন লাগার সম্ভাবনার কথা শোনা গেলেও দমকল কোনও কারণ নিশ্চিত করেনি। ফরেন্সিক পরীক্ষার পরেই আগুনের প্রকৃত উৎস জানা যাবে।
পুলিশ নিউ মার্কেট থানায় মামলা রুজুর প্রক্রিয়া শুরু করেছে। ভবন এবং হোটেলের মালিকের খোঁজে তল্লাশি চলছে। ঘটনার পর থেকে মালিককে পাওয়া যাচ্ছে না বলে পুলিশ সূত্রে দাবি করা হয়েছে। অগ্নিনিরাপত্তা বিধি অমান্য, বেআইনি নির্মাণ অথবা প্রশাসনিক অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনও গাফিলতি ছিল কি না, সব দিকই তদন্ত করে দেখা হবে।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নির্দেশে পাঁচ সদস্যের একটি বিশেষ তদন্তকারী দল গঠন করা হয়েছে। কলকাতা পুরসভা, পুলিশ, দমকল এবং নগরোন্নয়ন দফতরের আধিকারিকদের নিয়ে শহরের হোটেলগুলির অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা পরীক্ষা করার কথাও জানিয়েছে সরকার। রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী প্রাণহানিতে শোকপ্রকাশ করেছেন।
এই ঘটনার মাত্র দু’দিন আগে বীরভূমের তারাপীঠের একটি হোটেলে আগুন লেগে আটজনের মৃত্যু হয়েছিল। তার পরেই কলকাতার কেন্দ্রস্থলে ন’জনের প্রাণহানি প্রশাসনিক নজরদারির কার্যকারিতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। মির্জা গালিব স্ট্রিটের বহু পুরনো বাড়িতে ছোট ছোট হোটেল ও অতিথিশালা চলে। বাংলাদেশ থেকে চিকিৎসার জন্য কলকাতায় আসা বহু মানুষ তুলনামূলক কম খরচের এই হোটেলগুলিতেই থাকেন। ফলে সেখানে পর্যাপ্ত বহির্গমন পথ, ধোঁয়া শনাক্তকারী যন্ত্র, অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা এবং নিয়মিত নিরাপত্তা পরীক্ষা না থাকলে সামান্য আগুনও যে ভয়াবহ মৃত্যুফাঁদ হয়ে উঠতে পারে, বুধবারের ঘটনা তার নির্মম প্রমাণ।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



