International

সন্ন্যাসিনী বনাম সৈকত

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • ইতালির লিগুরিয়া অঞ্চলের ছোট্ট সমুদ্রশহর স্পোতোরনো।
  • সেখানে মাত্র ৫০ মিটার দীর্ঘ একফালি সৈকত ঘিরেই এখন শুরু হয়েছে অদ্ভুত এক লড়াই—এক দিকে স্থানীয় পুরসভা, অন্য দিকে একদল সন্ন্যাসিনী।
  • প্রায় আট দশক ধরে ‘বানিয়ি জিনো গারোনে’ নামে পরিচিত এই সৈকতকেন্দ্রটি পরিচালনা করে আসছেন ‘সুওরে দি কারিতা দি সান্তা মারিয়া’ ধর্মীয় সংঘের সদস্যেরা।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

ইতালির লিগুরিয়া অঞ্চলের ছোট্ট সমুদ্রশহর স্পোতোরনো। সেখানে মাত্র ৫০ মিটার দীর্ঘ একফালি সৈকত ঘিরেই এখন শুরু হয়েছে অদ্ভুত এক লড়াই—এক দিকে স্থানীয় পুরসভা, অন্য দিকে একদল সন্ন্যাসিনী। প্রায় আট দশক ধরে ‘বানিয়ি জিনো গারোনে’ নামে পরিচিত এই সৈকতকেন্দ্রটি পরিচালনা করে আসছেন ‘সুওরে দি কারিতা দি সান্তা মারিয়া’ ধর্মীয় সংঘের সদস্যেরা। কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিযোগিতা-বিধি মেনে এ বার সৈকত পরিচালনার অধিকার প্রকাশ্য দরপত্রে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পুরসভা। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের ভাষায়, শুরু হয়েছে এক ‘পবিত্র যুদ্ধ’

সন্ন্যাসিনীদের দাবি, সৈকত তাঁদের হাতেই থাকা উচিত। কারণ সেখান থেকে পাওয়া অর্থ কোনও ব্যক্তিগত লাভের জন্য ব্যবহার করা হয় না। স্পোতোরনোয় তাঁদের পরিচালিত শিশু বিদ্যালয় এবং গ্রীষ্মকালীন সৈকত শিবিরের খরচের বড় অংশ আসে এই সৈকতকেন্দ্রের আয় থেকে।

আশির কোঠায় থাকা সিস্টার মিরান্ডা এক জনসভায় মেয়র মাত্তিয়া ফিয়োরিনিকে সরাসরি প্রশ্ন করেন, “এই সৈকত আমাদের। পুরসভা কেন তা কেড়ে নিতে চাইছে?” তাঁর আশঙ্কা, সৈকত চলে গেলে তাঁদের স্কুল চালানোই কঠিন হয়ে পড়বে।

আট দশকের সম্পর্ক

১৯৪৬ সাল থেকেই সৈকতকেন্দ্রটি পরিচালনা করছেন সন্ন্যাসিনীরা। সমাজকল্যাণমূলক কাজে আয় ব্যয় করার কারণে এত দিন তাঁদের সাধারণ বাণিজ্যিক নিয়মের কিছুটা ছাড় দেওয়া হয়েছিল।

তবে কাজের ধরন একেবারে অন্য বেসরকারি সৈকতকেন্দ্রগুলির থেকে আলাদা নয়। পর্যটকদের কাছে ছাতা এবং শোওয়ার চেয়ার ভাড়া দেন সন্ন্যাসিনীরাও। পার্থক্য হল, এই আয় ব্যক্তিগত মুনাফা হিসেবে ভাগ না করে সমাজসেবায় ব্যয় করা হয়।

এই বিশেষ ব্যবস্থার আইনি ভিত্তিই এখন আর কার্যকর নেই। ফলে পুরসভা সৈকতটিকে ‘বিনামূল্যের পরিষেবাযুক্ত সৈকত’ হিসেবে পুনর্বিন্যাস করতে চাইছে। অর্থাৎ যে কেউ বিনা খরচে সৈকতে ঢুকতে পারবেন। প্রয়োজন হলে অল্প টাকায় ছাতা বা চেয়ার ভাড়া নেওয়ার সুযোগও থাকবে।

সন্ন্যাসিনীদের ভয়, এই ব্যবস্থায় সৈকত থেকে তাঁদের আয় উল্লেখযোগ্য ভাবে কমে যাবে। তার সরাসরি প্রভাব পড়বে শিশু বিদ্যালয় এবং অন্যান্য সমাজকল্যাণমূলক প্রকল্পে।

মেয়রের পাল্টা যুক্তি

মেয়র ফিয়োরিনি অবশ্য কোনও বিশেষ ছাড় দিতে রাজি নন। তাঁর বক্তব্য, সন্ন্যাসিনীরা যদি সৈকত পরিচালনার দায়িত্ব রাখতে চান, তা হলে অন্য সব আবেদনকারীর মতো তাঁদেরও প্রকাশ্য দরপত্রে অংশ নিতে হবে। আগামী শরতেই সেই দরপত্র আহ্বান করা হতে পারে।

পুরসভার যুক্তি, বিষয়টি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বনাম প্রশাসনের লড়াই নয়। সরকারি সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে সবার জন্য একই নিয়ম কার্যকর করাই মূল কথা।

নেপথ্যে বড় লড়াই

স্পোতোরনোর এই ৫০ মিটার সৈকতের বিবাদ আসলে ইতালির উপকূলজুড়ে চলা দীর্ঘ রাজনৈতিক ও আইনি টানাপড়েনের ছোট্ট প্রতিচ্ছবি।

ইতালির উপকূলের বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে বেসরকারি ব্যবসায়ীদের হাতে। লাভজনক সৈকত ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ হারানোর আশঙ্কায় শক্তিশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলি প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের বিরোধিতা করে এসেছে। তাদের চাপেই একের পর এক ইতালীয় সরকার ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘বলকেস্টাইন নির্দেশিকা’ কার্যকর করার সময় পিছিয়েছে।

শেষ পর্যন্ত ব্রাসেলসের চাপ এবং ইতালীয় আদালতের নির্দেশে জর্জা মেলোনির সরকার ২০২৭ সালের ৩০ জুনের মধ্যে বর্তমান সৈকত-ছাড়পত্রগুলি প্রকাশ্য দরপত্রে দেওয়ার সময়সীমা মেনে নিয়েছে। স্পোতোরনো সেই নিয়ম কার্যকর করার প্রথম শহরগুলির অন্যতম হতে পারে।

ফলে প্রশ্নটা শুধু একটি সৈকত নিয়ে নয়। এক দিকে আইনের চোখে সমান প্রতিযোগিতা, অন্য দিকে দাতব্য প্রতিষ্ঠানের সামাজিক ভূমিকা—কোন যুক্তি বেশি ওজন পাবে?

সন্ন্যাসিনীরা বলছেন, সৈকতের আয় দিয়ে তাঁরা সমাজের জন্য কাজ করেন। পুরসভার পাল্টা প্রশ্ন—সমাজসেবা কি সরকারি সম্পদ ব্যবহারের নিয়মের ঊর্ধ্বে?

৫০ মিটার সৈকত ঘিরে তাই লড়াইটা আপাত ছোট হলেও, তার ঢেউ ইতালির উপকূল পেরিয়ে অনেক দূর পর্যন্ত গড়াতে পারে।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles