মার্চ থেকে জুলাই—এই পাঁচ মাসে দেশের বিভিন্ন সরকারি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম এবং ইউটিউবকে প্রায় দু’লক্ষ ‘ব্লকিং অর্ডার’ বা বিষয়বস্তু আটকে দেওয়ার নির্দেশ পাঠিয়েছে। অর্থাৎ, গড়ে প্রতি মিনিটে একটি করে নির্দেশ। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের ‘সহযোগ’ পোর্টালের মাধ্যমে পাঠানো এই নির্দেশগুলির অর্ধেকেরও বেশি পেয়েছে ইনস্টাগ্রাম। ঘটনাচক্রে, ওই সময়েই পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস ও নিয়োগ-পরীক্ষায় অনিয়মের প্রতিবাদে দিল্লির যন্তর মন্তরে ছাত্র-চাকরিপ্রার্থীদের আন্দোলন তীব্র হয়ে উঠেছিল। সেই আন্দোলনের প্রচার এবং সংগঠনের অন্যতম প্রধান মঞ্চ ছিল ইনস্টাগ্রাম।

সরকারি নির্দেশগুলির মাসভিত্তিক হিসাব এখনও প্রকাশিত হয়নি। তবে এক প্রবীণ সরকারি আধিকারিকের বক্তব্য অনুযায়ী, পাঁচ মাসে পাঠানো নির্দেশের একটি ‘উল্লেখযোগ্য অংশ’ জারি হয়েছিল ছাত্র আন্দোলন ক্রমশ জোরদার হওয়ার সময়ে। বিশেষ করে ইনস্টাগ্রামে আন্দোলন-সমর্থক প্রচার, ভিডিয়ো, সরাসরি সম্প্রচার এবং সরকারের সমালোচনামূলক পোস্ট ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিষয়বস্তু সরানোর নির্দেশও বেড়েছিল।

তিনটি সমাজমাধ্যমের মধ্যে ইনস্টাগ্রামই সবচেয়ে বেশি—প্রায় এক লক্ষ—নির্দেশ পেয়েছে। মোট নির্দেশের অর্ধেকের সামান্য বেশি এটি। ফেসবুককে প্রায় ৮০ হাজার এবং ইউটিউবকে প্রায় ১৫ হাজার নির্দেশ পাঠানো হয়। অর্থাৎ, সব মিলিয়ে প্রতি দশটি নির্দেশের প্রায় ন’টিই পেয়েছে মেটার মালিকানাধীন দুই মঞ্চ ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম।

তবে এখানে ‘একটি ব্লকিং অর্ডার’ মানেই কেবল একটি পোস্ট বা একটি অ্যাকাউন্ট নয়। একটি নির্দেশের আওতায় কয়েকশো পোস্ট, ভিডিয়ো, লিঙ্ক কিংবা ব্যবহারকারীর অ্যাকাউন্ট থাকতে পারে। ফলে পাঁচ মাসে বাস্তবে কতগুলি আলাদা বিষয়বস্তু ভারতীয় ব্যবহারকারীদের নাগালের বাইরে চলে গিয়েছে, তার সংখ্যা দু’লক্ষের তুলনায় বহু গুণ বেশি হতে পারে।

এই পরিসংখ্যানের তাৎপর্য বোঝা যায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের ২০২৪-২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনের সঙ্গে তুলনা করলে। সেই প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত গোটা বছরে তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৭৯(৩)(বি) ধারায়, সহযোগ পোর্টাল-সহ বিভিন্ন ব্যবস্থার মাধ্যমে, ১ লক্ষ ১১ হাজারের কিছু বেশি ‘সন্দেহজনক অনলাইন বিষয়বস্তু’ বন্ধ করা হয়েছিল। অন্য দিকে, পরবর্তী মাত্র পাঁচ মাসেই তিনটি বড় সমাজমাধ্যম সংস্থাকে পাঠানো নির্দেশের সংখ্যা প্রায় দু’লক্ষে পৌঁছে যায়।

ছাত্র আন্দোলনের সময় বাড়ে নজরদারি

এই পাঁচ মাসের মধ্যে জুনের গোড়ায় পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে যন্তর মন্তরে ছাত্রদের আন্দোলন শুরু হয়েছিল। জুলাইয়ের দ্বিতীয়ার্ধে তা বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপে পরিণত হয়। ২৫ জুলাই তৎকালীন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের পরে আন্দোলন প্রত্যাহার করা হয়।

আন্দোলনকারীরা প্রচলিত সংবাদমাধ্যমের পাশাপাশি ইনস্টাগ্রামকে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেছিলেন। মিছিলের আহ্বান, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ছবি, আহতদের বিবরণ, আন্দোলনের দাবি এবং সরকারের বিরুদ্ধে বক্তব্য—সবই এই মঞ্চে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল। সরকারি সূত্রের দাবি অনুযায়ী, আন্দোলন যত গতি পেয়েছিল, ইনস্টাগ্রামে পাঠানো ব্লকিং অর্ডারের সংখ্যাও তত বেড়েছিল।

সমাজমাধ্যম ব্যবহারকারীদের প্রকাশিত তথ্য থেকে অভিযোগ উঠেছে, শুধু ছাত্র আন্দোলন নয়, সরকারের ইথানল-মিশ্রিত জ্বালানি নীতির সমালোচনা এবং পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন-সংক্রান্ত বিভিন্ন পোস্টও এই দমন-প্রক্রিয়ার আওতায় এসেছে। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি ভুয়ো ছবি বা ‘ডিপফেক’-এর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আম আদমি পার্টির প্রধান অরবিন্দ কেজরিওয়ালও অভিযোগ করেছেন, তাঁর কয়েকটি ইনস্টাগ্রাম পোস্ট ভারতে দেখা যাচ্ছে না।

মানুষের পর্যালোচনা ছাড়াই স্বয়ংক্রিয় অপসারণ

পরিসংখ্যানের চেয়েও বড় উদ্বেগ তৈরি করেছে মেটার বিষয়বস্তু সরানোর পদ্ধতি। সরকারি নির্দেশ পাওয়ার পরে মাত্র তিন ঘণ্টার মধ্যে তা কার্যকর করার বাধ্যবাধকতা মেটাতে সংস্থাটি সহযোগ পোর্টালের সঙ্গে নিজেদের এপিআই বা স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা যুক্ত করেছে। এর ফলে সরকারি সংস্থা কোনও বিষয়বস্তু চিহ্নিত করে নির্দেশ আপলোড করলে, তা ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রাম থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে দেওয়া সম্ভব।

অর্থাৎ, নির্দেশটি আইনসম্মত কি না, যথাযথ পদমর্যাদার কোনও আধিকারিক সেটি পাঠিয়েছেন কি না, কিংবা বিষয়বস্তুটি সত্যিই বেআইনি কি না—মেটার কোনও কর্মীর পৃথক পর্যালোচনার আগেই সেটি অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে। নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করা বা তার যুক্তিসংগততা যাচাই করার সুযোগও কার্যত থাকে না।

ডিজিটাল অধিকারকর্মীদের মতে, এই স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা আইনের মৌলিক শর্তকেই দুর্বল করে দিচ্ছে। ইন্টারনেট ফ্রিডম ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা-পরিচালক তথা আইনজীবী অপার গুপ্তের বক্তব্য, কোনও এপিআইয়ের পক্ষে সরকারি নির্দেশের প্রকৃত ‘আইনি জ্ঞান’ থাকা সম্ভব নয়। মেটার কেউ যদি নির্দেশটি না পড়েন, তবে সেটি নির্ধারিত পদমর্যাদার আধিকারিক পাঠিয়েছেন কি না বা সংশোধিত বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কারণ উল্লেখ করা হয়েছে কি না, তা যাচাই হবে কীভাবে? তাঁর মতে, যন্ত্রের সঙ্গে যন্ত্রের সরাসরি যোগাযোগ একটি শর্তসাপেক্ষ আইনি দায়িত্বকে কার্যত নিঃশর্ত আনুগত্যে পরিণত করছে।

কোন আইনে নির্দেশ পাঠানো হচ্ছে

এই নির্দেশগুলির অধিকাংশই তথ্যপ্রযুক্তি আইন, ২০০০-এর ৭৯(৩)(বি) ধারায় সহযোগ পোর্টালের মাধ্যমে পাঠানো হয়েছে। এই ধারায় সরকার বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার কাছ থেকে কোনও বিষয়বস্তুকে বেআইনি বলে চিহ্নিত করার বৈধ নির্দেশ পাওয়ার পরে সমাজমাধ্যম সংস্থাকে তা সরাতে হয়। নির্দেশ না মানলে ব্যবহারকারীর প্রকাশিত বিষয়বস্তুর দায় থেকে সংস্থাগুলি যে আইনি রক্ষাকবচ পায়, তা হারানোর আশঙ্কা থাকে।

এই ব্যবস্থা তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৬৯(এ) ধারায় জারি করা নির্দেশের অতিরিক্ত। ৬৯(এ) ধারা সাধারণত জাতীয় নিরাপত্তা, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব এবং জনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত ক্ষেত্রে ওয়েবসাইট বা অনলাইন বিষয়বস্তু বন্ধ করার জন্য প্রয়োগ করা হয়। কিন্তু ৭৯(৩)(বি) ধারার পরিধি তুলনায় বিস্তৃত। কেন্দ্র ও রাজ্যের বিভিন্ন সংস্থা এর মাধ্যমে নির্দেশ পাঠাতে পারে।

তিনটি সংস্থাই সহযোগ পোর্টালে যুক্ত হয়েছে। শিল্পমহলের বক্তব্য, ফেব্রুয়ারিতে তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রক ২০২১ সালের মধ্যস্থতাকারী নির্দেশিকা ও ডিজিটাল মাধ্যম নীতিমালা সংশোধন করার পরে সংস্থাগুলির উপরে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার চাপ বহুগুণ বেড়েছে। আগে কোনও নির্দেশ পালনের জন্য ২৪ থেকে ৩৬ ঘণ্টা সময় পাওয়া যেত। সংশোধিত নিয়মে তা কমিয়ে দুই থেকে তিন ঘণ্টা করা হয়েছে।

ব্যবহারকারীকে জানানোও হয় না

ভারতে সমাজমাধ্যম ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৬০ কোটির বেশি। প্রতিদিন দেশের ব্যবহারকারীরা এক কোটি থেকে দশ কোটি পর্যন্ত পোস্ট প্রকাশ করেন বলে বিভিন্ন অনুমান রয়েছে। এই বিপুল ব্যবহারকারী-বাজারের কারণে ভারত বিশ্বের বৃহত্তম প্রযুক্তি সংস্থাগুলির কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু মোট পোস্টের সংখ্যা বেশি হলেই সরকারি অপসারণ-নির্দেশও অনিবার্যভাবে বেশি হবে—এমন সরল সম্পর্ক নেই।

মেটার স্বচ্ছতা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে ইন্দোনেশিয়ায় ২ কোটি ৩০ লক্ষের বেশি বিষয়বস্তু সরানো হয়েছিল, যদিও সেখানকার ব্যবহারকারীর সংখ্যা ভারতের এক-তৃতীয়াংশেরও কম। একই সময়ে ভারতে আইনি অনুরোধের ভিত্তিতে ৪১ হাজারের বেশি বিষয়বস্তু বন্ধ করা হয়। তার আগের ছ’মাসে সংখ্যাটি ছিল প্রায় ২৮ হাজার।

মেটা দাবি করে, সরকার বা আদালতের আইনি অনুরোধে কোনও পোস্ট বন্ধ করা হলে অধিকাংশ দেশে ব্যবহারকারীকে জানানো হয় কোন কর্তৃপক্ষের অনুরোধে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু ‘আইনি বাধ্যবাধকতা ও নিয়ন্ত্রণমূলক বিবেচনার’ কারণে ভারত-সহ কয়েকটি দেশে সেই তথ্য প্রকাশ করা হয় না। ফলে ব্যবহারকারীরা অনেক ক্ষেত্রেই জানেন না, তাঁদের পোস্ট কেন সরানো হল, কোন সংস্থা নির্দেশ দিল বা তার বিরুদ্ধে কোথায় আপত্তি জানানো যাবে।

মেটা ও গুগল এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রকের কাছে এ বিষয়ে প্রশ্ন পাঠানো হলেও প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়া পর্যন্ত কোনও উত্তর মেলেনি। ছাত্র আন্দোলনের সময়ে বিপুল সংখ্যায় নির্দেশ জারি, ইনস্টাগ্রামকে বিশেষভাবে লক্ষ্য করা এবং মানুষের পর্যালোচনা ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিষয়বস্তু সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ—সব মিলিয়ে সরকারের অনলাইন নিয়ন্ত্রণ, প্রযুক্তি সংস্থার দায় এবং নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন করে গুরুতর প্রশ্ন উঠে গেল।