জাতের উল্লেখ থেকে বাবা-মায়ের পরিচয়: নতুন জনগণনার প্রশ্নমালায় কেন বাড়ছে সংশয়

যা জানা জরুরি
- দেশের নতুন জনগণনায় এমন একগুচ্ছ প্রশ্ন রাখা হচ্ছে, যেগুলির কয়েকটি ছয় বছর আগে জাতীয় জনসংখ্যাপঞ্জি বা এনপিআর ঘিরে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল।
- নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বা সিএএ-বিরোধী আন্দোলনের সময় বিরোধী দল ও নাগরিক সমাজের আশঙ্কা ছিল, এনপিআরের মাধ্যমে সংগৃহীত তথ্যকে ভবিষ্যতে দেশজোড়া জাতীয় নাগরিকপঞ্জি বা এনআরসি…
- নতুন জনগণনার প্রশ্নপত্র প্রকাশের পরে তাই সেই পুরনো বিতর্ক আবার ফিরে আসার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
দেশের নতুন জনগণনায় এমন একগুচ্ছ প্রশ্ন রাখা হচ্ছে, যেগুলির কয়েকটি ছয় বছর আগে জাতীয় জনসংখ্যাপঞ্জি বা এনপিআর ঘিরে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বা সিএএ-বিরোধী আন্দোলনের সময় বিরোধী দল ও নাগরিক সমাজের আশঙ্কা ছিল, এনপিআরের মাধ্যমে সংগৃহীত তথ্যকে ভবিষ্যতে দেশজোড়া জাতীয় নাগরিকপঞ্জি বা এনআরসি তৈরির ভিত্তি হিসাবে ব্যবহার করা হতে পারে। নতুন জনগণনার প্রশ্নপত্র প্রকাশের পরে তাই সেই পুরনো বিতর্ক আবার ফিরে আসার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
ভারতের রেজিস্ট্রার জেনারেল বা আরজিআই জনগণনা পর্বের জন্য ৪০টি প্রশ্নের তালিকা বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক পরিচয়, জাতীয়তা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, ব্যাঙ্ক হিসাব, পরিচয়পত্র এবং করোনার টিকা কোথায় নেওয়া হয়েছিল—এমন নানা তথ্য জানতে চাওয়া হবে। তফসিলি জাতি ও তফসিলি জনজাতি সংক্রান্ত প্রশ্নটিও বদলে সেখানে সরাসরি ‘জাত’ শব্দটি যুক্ত করা হয়েছে।
২০১১ সালের জনগণনার তুলনায় নতুন বা পরিবর্তিত প্রশ্নের সংখ্যা ১৪। এর মধ্যে রয়েছে স্বামী বা স্ত্রীর নাম, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ঘোষিত জাতীয়তা, বাবা ও মায়ের পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য, তফসিলি জাতি-তফসিলি জনজাতি-জাত, সাক্ষরতা ও ডিজিটাল সাক্ষরতা, সর্বোচ্চ শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং পঠিত বিষয় বা শাখা, করোনার টিকা নেওয়ার স্থান এবং মোট ব্যাঙ্ক হিসাবের সংখ্যা। পাশাপাশি মোবাইল নম্বর, আধার নম্বর, ভোটার পরিচয়পত্রের নম্বর, ভারতীয় পাসপোর্টের নম্বর এবং ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকার তথ্যও চাওয়া হবে। অবশ্য মোবাইল, আধার কিংবা অন্য পরিচয়পত্রের ক্ষেত্রে প্রশ্নপত্রে ‘যদি থাকে’ কথাটি রাখা হয়েছে।
এই ১৪টি নতুন বা পরিবর্তিত প্রশ্নের মধ্যে অন্তত আটটি ২০২০ সালে বিজ্ঞাপিত এনপিআর প্রশ্নপত্রেও ছিল। সেগুলি হল ঘোষিত জাতীয়তা, বাবা ও মায়ের পরিচয়, মোবাইল নম্বর, আধার, ভোটার পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট এবং ড্রাইভিং লাইসেন্সের তথ্য। ফলে প্রশ্ন উঠছে, এনপিআর আলাদাভাবে বিজ্ঞাপিত না হলেও জনগণনার মাধ্যমে কি কার্যত একই ধরনের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে?
এনপিআর হল দেশের ‘সাধারণ বাসিন্দাদের’ একটি তালিকা। কোনও ব্যক্তি একটি এলাকায় গত ছয় মাস বা তার বেশি সময় ধরে বসবাস করলে অথবা পরবর্তী ছয় মাস সেখানে থাকার ইচ্ছা থাকলে তাঁকে সাধারণ বাসিন্দা হিসাবে গণ্য করা হয়। এর সঙ্গে সরাসরি নাগরিকত্বের সম্পর্ক নেই—বিদেশি নাগরিকও নির্দিষ্ট শর্তে সাধারণ বাসিন্দা হতে পারেন। কিন্তু এনপিআরের আইনি কাঠামোটিই বিতর্কের মূল কারণ।
এনপিআর পরিচালিত হয় ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইনের অধীনে তৈরি ২০০৩ সালের নাগরিকত্ব বিধি অনুযায়ী। সেই বিধিতে প্রথমে জনসংখ্যাপঞ্জি প্রস্তুত এবং পরে তার তথ্য যাচাই করে ভারতীয় নাগরিকদের স্থানীয় পঞ্জি তৈরির ব্যবস্থা রয়েছে। বিধির ৩(৪) ধারায় কেন্দ্রকে একটি নির্দিষ্ট তারিখ ধরে স্থানীয় নিবন্ধকের এলাকার সমস্ত সাধারণ বাসিন্দার তথ্য সংগ্রহের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। ৩(৫) ধারায় বলা হয়েছে, জনসংখ্যাপঞ্জির তথ্য যাচাইয়ের পরে ভারতীয় নাগরিকদের স্থানীয় পঞ্জিতে নাম অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
আরও বিতর্কিত হল বিধির ৪ নম্বর ধারা। সেখানে যাচাইয়ের সময় কোনও ব্যক্তির নাগরিকত্ব নিয়ে সন্দেহ দেখা দিলে তাঁর তথ্য আলাদাভাবে চিহ্নিত করে আরও তদন্তের ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে এনপিআর এবং নাগরিকপঞ্জির মধ্যে একটি বিধিবদ্ধ যোগসূত্র রয়েছে। সরকার বারবার বলেছে, দেশজোড়া এনআরসি করার কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। কিন্তু আইনের এই সম্ভাব্য পথটিই বিরোধীদের উদ্বেগ দূর করতে পারেনি।
২০২০ সালের এনপিআর প্রশ্নপত্রে বাবা ও মায়ের জন্মতারিখ এবং জন্মস্থান জানতে চাওয়া হয়েছিল। তাঁরা ভারতে জন্মালে জেলা ও রাজ্যের নাম এবং দেশের বাইরে জন্মালে সংশ্লিষ্ট দেশের নাম উল্লেখ করার কথা ছিল। ২০১৯ সালে সিএএ পাস হওয়ার পরে এই প্রশ্নগুলি বিশেষভাবে সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। আশঙ্কা ছড়ায়, বহু মানুষের কাছে নিজেদের তো বটেই, বাবা-মায়ের জন্মসংক্রান্ত নথিও নেই। বিশেষ করে দরিদ্র, ভূমিহীন, উদ্বাস্তু, আদিবাসী, পরিযায়ী শ্রমিক এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পক্ষে কয়েক দশক আগের পারিবারিক নথি দেখানো প্রায় অসম্ভব হতে পারে।
বিরোধী দলগুলির অভিযোগ ছিল, প্রথমে এনপিআরের মাধ্যমে পারিবারিক তথ্য সংগ্রহ করা হবে, তার পরে সন্দেহজনক নাগরিকদের চিহ্নিত করে এনআরসি প্রক্রিয়া চালানো হতে পারে। অসমে এনআরসি তৈরির অভিজ্ঞতা সেই উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছিল। একাধিক বিরোধী-শাসিত রাজ্য এনপিআরের বিরোধিতা করে প্রস্তাবও গ্রহণ করেছিল।
বিতর্কের রাজনৈতিক মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছিল কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের বক্তব্য। তিনি একাধিকবার দেশজোড়া এনআরসির কথা বলেছিলেন এবং সিএএ ও এনআরসি প্রসঙ্গে ‘ক্রোনোলজি’ বা ঘটনাক্রম বোঝার কথা জানিয়েছিলেন। অন্যদিকে, ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী দাবি করেন, দেশব্যাপী এনআরসি নিয়ে তাঁর সরকারে কোনও আলোচনা বা সিদ্ধান্ত হয়নি। পরবর্তী সময়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক এবং অমিত শাহও একাধিকবার জানান, জাতীয় স্তরে এনআরসি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
২০২০ সালে এনপিআর হালনাগাদ করার কাজ ২০২১ সালের জনগণনার গৃহতালিকা তৈরির পর্বের সঙ্গে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু করোনা অতিমারির কারণে জনগণনা এবং এনপিআর—দু’টিই স্থগিত হয়ে যায়। চলতি বছরে জনগণনার কাজ আবার শুরু হলেও এনপিআরের জন্য নতুন কোনও বিজ্ঞপ্তি জারি হয়নি। এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গৃহতালিকা তৈরির পর্বের বিজ্ঞপ্তিতেও এনপিআরের উল্লেখ নেই।
তবে ২০২৬-২৭ সালের কেন্দ্রীয় বাজেটে ‘জনগণনা, সমীক্ষা ও পরিসংখ্যান/রেজিস্ট্রার জেনারেল অব ইন্ডিয়া’ খাতে জনগণনা ২০২৭ এবং এনপিআরের জন্য ছয় হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের এক আধিকারিকের বক্তব্য, ২০২০ সাল থেকে আগের বাজেটগুলিতেও এই ধরনের অর্থসংস্থান রাখা হয়েছিল। ভবিষ্যতে সরকার এনপিআর করার সিদ্ধান্ত নিলে যাতে অর্থের অভাব না হয়, সেই উদ্দেশ্যেই বরাদ্দ। অর্থ বরাদ্দের অর্থ এই নয় যে এনপিআর ইতিমধ্যে অনুমোদিত বা বিজ্ঞাপিত হয়েছে।
নতুন জনগণনার প্রশ্নপত্রে জাতের উল্লেখও তাৎপর্যপূর্ণ। আগে প্রশ্নটি মূলত তফসিলি জাতি অথবা তফসিলি জনজাতিভুক্ত পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এবার ‘জাত’ যুক্ত হওয়ায় পূর্ণাঙ্গ জাতগণনা হবে কি না, সেই প্রশ্ন উঠেছে। তবে শুধু শব্দের পরিবর্তন থেকেই সমস্ত সম্প্রদায়ের জাতভিত্তিক পৃথক তথ্য প্রকাশের সিদ্ধান্ত হয়েছে—এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। সরকারকে স্পষ্ট করতে হবে, কোন স্তরে এবং কী পদ্ধতিতে জাতের তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশ করা হবে।
একইভাবে নাগরিকের আধার, ভোটার পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, মোবাইল নম্বর এবং ব্যাঙ্ক হিসাবের তথ্য কেন প্রয়োজন, তারও স্বচ্ছ ব্যাখ্যা জরুরি। জনগণনার তথ্য আইনত গোপনীয় এবং সাধারণভাবে কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণে তা ব্যবহার করা যায় না। তবু এতগুলি পরিচয়সূচক তথ্য একসঙ্গে সংগ্রহ করা হলে তথ্যের নিরাপত্তা, উদ্দেশ্য এবং ভবিষ্যৎ ব্যবহারের সীমা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।
এখন পর্যন্ত দেশজোড়া এনআরসি করার কোনও সরকারি বিজ্ঞপ্তি নেই এবং নতুন করে এনপিআর আয়োজনের ঘোষণাও হয়নি। অতএব জনগণনার প্রশ্নগুলিকে সরাসরি এনআরসি শুরু হওয়ার প্রমাণ বলা ঠিক হবে না। আবার অতীতের বিতর্ক এবং নাগরিকত্ব বিধিতে এনপিআর-এনআরসির যোগসূত্র উপেক্ষা করাও সম্ভব নয়। সংশয় দূর করতে কেন্দ্রকে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে, সংগৃহীত তথ্য কেবল পরিসংখ্যানগত কাজে ব্যবহৃত হবে কি না এবং ভবিষ্যতে নাগরিকত্ব যাচাইয়ের কোনও প্রক্রিয়ায় তা ব্যবহারের সুযোগ থাকবে কি না। জনগণনার সাফল্য শেষ পর্যন্ত মানুষের সহযোগিতা ও আস্থার উপর নির্ভরশীল। সেই আস্থা রক্ষার প্রধান শর্ত হল স্বচ্ছতা।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



