বাংলাস্ফিয়ার: বীরভূমের রামপুরহাটে নিজের বাড়ির পাশের তৃণমূল কংগ্রেসের একটি কার্যালয় থেকে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার প্রাক্তন ডেপুটি স্পিকার আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের দেহ উদ্ধার হল। রবিবার সকালে স্থানীয় বাসিন্দারা কার্যালয়ের ভিতরে তাঁকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান বলে পুলিশ জানিয়েছে। তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর। ঘটনাস্থল থেকে বাংলায় হাতে লেখা একটি দীর্ঘ চিঠি উদ্ধার হয়েছে। তবে সেটি আশিসবাবুরই লেখা কি না, তা পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে।বীরভূম জেলা পুলিশের এক আধিকারিক জানিয়েছেন, স্থানীয় কয়েকজন প্রথমে দেহটি দেখতে পেয়ে থানায় খবর দেন। পুলিশ এসে দেহ উদ্ধার করে। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণের জন্য দেহটি ময়নাতদন্তে পাঠানো হয়েছে। ঘটনাস্থল পরীক্ষা করার পাশাপাশি পরিবারের সদস্য, দলীয় কর্মী এবং আশিসবাবুর ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে কথা বলছেন তদন্তকারীরা।প্রাথমিকভাবে ঘটনাটি আত্মহত্যা বলে মনে হলেও পুলিশ এখনও কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছয়নি। অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা রুজু করে তদন্ত শুরু হয়েছে। উদ্ধার হওয়া চিঠির হাতের লেখা যাচাই করা হবে। কার্যালয়ের আশপাশের নজরদারি ক্যামেরার ফুটেজ থাকলে সেগুলিও খতিয়ে দেখা হতে পারে।

চিঠিতে দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার

পুলিশ সূত্রের দাবি, আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিজস্ব পত্রশীর্ষে লেখা বলে মনে হওয়া ওই চিঠিতে তিনি জানিয়েছেন, কোনও ধরনের দুর্নীতির সঙ্গে তাঁর যোগ ছিল না। পরিকল্পিতভাবে তাঁর ভাবমূর্তি নষ্ট করার চেষ্টা চলছে বলেও চিঠিতে অভিযোগ করা হয়েছে।তারাপীঠ-রামপুরহাট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা টিআরডিএ-র দরপত্র প্রক্রিয়ার সঙ্গে তাঁর কোনও প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল না—চিঠিতে এমন কথাও লেখা রয়েছে বলে তদন্তকারীদের সূত্রে জানা গিয়েছে। তবে চিঠির বিষয়বস্তু এবং সেটির সত্যতা নিয়ে পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানায়নি।তৃণমূলের মুখপাত্র নীলাঞ্জন দাস আশিসবাবুর মৃত্যুতে শোক ও বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। সমাজমাধ্যমে তিনি কথিত চিঠিটির একটি ছবি প্রকাশ করেন। তাঁর বক্তব্য, আশিস বন্দ্যোপাধ্যায় সেখানে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে দুর্নীতির মামলায় তাঁকে মিথ্যাভাবে জড়ানোর চেষ্টা হচ্ছিল।সম্প্রতি বিজেপি অভিযোগ করেছিল, টিআরডিএ-র কাজে আর্থিক অনিয়ম ধরা পড়েছে এবং তার সঙ্গে আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের যোগ রয়েছে। যদিও সেই অভিযোগের কোনও বিচারবিভাগীয় নিষ্পত্তি হয়নি। আশিসবাবুর মৃত্যুর সঙ্গে এই অভিযোগ বা তাঁর কথিত মানসিক চাপের কোনও সম্পর্ক ছিল কি না, সেটিও তদন্তসাপেক্ষ।

আত্মহত্যার তত্ত্ব মানতে নারাজ পরিবার

আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছোট ভাই প্রশান্ত বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, শনিবার রাতে তিনি পরিবারের সকলের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই নৈশভোজ করেছিলেন। তাঁর আচরণে উদ্বেগ বা অস্বাভাবিকতার কোনও লক্ষণ দেখা যায়নি।প্রশান্ত বলেন, “তাঁর ব্যবহারে অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। তিনি আত্মহত্যা করেছেন—এ কথা আমরা বিশ্বাস করতে পারছি না।” পরিবারের এই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে মৃত্যুর সমস্ত সম্ভাব্য দিক খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।রামপুরহাটের বর্তমান বিজেপি বিধায়ক ধ্রুব সাহাও ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তিনিই আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়কে ২৪ হাজারের বেশি ভোটে পরাজিত করেছিলেন। ধ্রুব বলেন, নির্বাচনে জয়লাভের পরে তিনি আশিসবাবুর কাছে গিয়ে আশীর্বাদ নিয়েছিলেন। তখন তাঁর আচরণে এমন কোনও ইঙ্গিত ছিল না, যা থেকে চরম সিদ্ধান্ত নেওয়ার আশঙ্কা হতে পারে।

পাঁচবারের বিধায়ক, মন্ত্রী ও ডেপুটি স্পিকার

আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক জীবন ছিল দীর্ঘ। বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রাবস্থাতেই তিনি রাজনীতিতে যুক্ত হন। পরে রামপুরহাট কলেজে বাংলার শিক্ষক হিসেবে কাজ করেন। বামফ্রন্টের শাসনকালে ২০০১ সালে প্রথমবার রামপুরহাট বিধানসভা কেন্দ্র থেকে নির্বাচিত হন। তার পর ২০০৬, ২০১১, ২০১৬ ও ২০২১—পরপর পাঁচটি নির্বাচনে ওই কেন্দ্র ধরে রেখেছিলেন।মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্ত্রিসভায় তিনি রাজ্যের কৃষিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২১ সালে তাঁকে বিধানসভার ডেপুটি স্পিকার করা হয়। ২০২৬ সালের মে মাসে রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদল হওয়া পর্যন্ত তিনি সেই পদে ছিলেন।সদ্যসমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির কাছে তৃণমূলের বড় পরাজয়ের পরে দলের বীরভূম জেলা সংগঠনেও পরিবর্তন শুরু হয়। জুন মাসে আশিসবাবু তৃণমূলের বীরভূম জেলা কোর কমিটির চেয়ারম্যান পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছিলেন। নির্বাচনী পরাজয়, সাংগঠনিক পরিবর্তন এবং দুর্নীতির অভিযোগ—সব মিলিয়ে তিনি কোনও চাপের মধ্যে ছিলেন কি না, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠছে।তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে মৃত্যুর কারণ কিংবা উদ্ধার হওয়া চিঠির ভিত্তিতে কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক হবে না বলে পুলিশের বক্তব্য। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন, হাতের লেখার পরীক্ষা এবং পারিপার্শ্বিক তথ্য বিশ্লেষণের পরেই আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুর প্রকৃত পরিস্থিতি স্পষ্ট হতে পারে।