২৫০ দিন সাগরে, তবু ‘কম’!

যা জানা জরুরি
- অনিয়মিত গরম জল, নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর আকাল, পরিবারের পাঠানো পার্সেল পৌঁছতে মাসের পর মাস—সব মিলিয়ে চরম ক্লান্তি ও হতাশায় দিন কাটছে মার্কিন বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস…
- অথচ তাঁদের এই দুর্দশা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাফ জবাব—এত দিনও যথেষ্ট নয়!
- শুক্রবার সাংবাদিকেরা ট্রাম্পকে জিজ্ঞাসা করেন, আব্রাহাম লিঙ্কনের নাবিকদের পরিবার জাহাজের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন কি না।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
টানা আট মাসেরও বেশি সময় সমুদ্রে। বন্দরে পা রাখার সুযোগ নেই ২০০ দিনেরও বেশি। কোথাও শৌচাগার অচল, কোথাও পানীয় জলের কল বিকল। অনিয়মিত গরম জল, নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর আকাল, পরিবারের পাঠানো পার্সেল পৌঁছতে মাসের পর মাস—সব মিলিয়ে চরম ক্লান্তি ও হতাশায় দিন কাটছে মার্কিন বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন-এর নাবিকদের। অথচ তাঁদের এই দুর্দশা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাফ জবাব—এত দিনও যথেষ্ট নয়!
শুক্রবার সাংবাদিকেরা ট্রাম্পকে জিজ্ঞাসা করেন, আব্রাহাম লিঙ্কনের নাবিকদের পরিবার জাহাজের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন কি না। ট্রাম্প প্রথমেই সেই উদ্বেগ উড়িয়ে দিয়ে বলেন, “না, তাঁরা উদ্বিগ্ন নন।” এরপর তাঁকে প্রশ্ন করা হয়, রণতরিটির অভিযান কি অত্যন্ত দীর্ঘ হয়ে গিয়েছে? ট্রাম্পের উত্তর, “না, না, না। মোটেই যথেষ্ট দীর্ঘ নয়।”
তবে ট্রাম্প জানিয়েছেন, আব্রাহাম লিঙ্কন শীঘ্রই বর্তমান অবস্থান থেকে সরে যাবে এবং তার জায়গা নেবে আর একটি বিমানবাহী রণতরি। মার্কিন নৌবাহিনীর কার্যনির্বাহী সচিব হাং কাও-ও জানিয়েছেন, জাহাজটি শিগগিরই দেশে ফিরবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আব্রাহাম লিঙ্কনের বদলে ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটনকে পশ্চিম এশিয়ায় পাঠানো হবে। যদিও এই বদল সম্পূর্ণ হতে আরও কয়েক সপ্তাহ লাগতে পারে।
২০২৫ সালের ২১ নভেম্বর সান দিয়েগোর ঘাঁটি থেকে যাত্রা শুরু করেছিল আব্রাহাম লিঙ্কন। শুরুতে সেটি ছিল নৌবাহিনীর নিয়মিত অভিযান। পরে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক তৎপরতায় সহায়তার জন্য রণতরিটিকে পশ্চিম এশিয়ার দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। জাহাজটিতে রয়েছেন প্রায় পাঁচ হাজার নাবিক ও মেরিন সেনা। অগস্টের মাঝামাঝি পর্যন্ত তাঁদের সমুদ্রে কাটানো দিনের সংখ্যা প্রায় ২৫০। এর মধ্যে টানা ২০০ দিনেরও বেশি কোনও বন্দরে না থামার ঘটনা আধুনিক মার্কিন বিমানবাহী রণতরির ইতিহাসে বিরল।
সিএনএন-এর প্রতিবেদনে নাবিক ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, দীর্ঘ অভিযানের ধাক্কায় জাহাজে মনোবল তলানিতে ঠেকেছে। এক নাবিক জানিয়েছেন, প্রতিদিনই তাঁরা ক্যাপ্টেনের ঘোষণা শোনেন—হয়তো এ বার জানা যাবে কবে বাড়ি ফেরা যাবে। কিন্তু প্রত্যাবর্তনের নির্দিষ্ট দিন সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য না থাকায় অপেক্ষা ক্রমশ আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
দৈনন্দিন জীবনও সহজ নয়। অভিযোগ, জাহাজের শৌচাগার ও পানীয় জলের কল প্রায়ই বিকল হয়ে পড়ে। অনেক সময় গরম জলও মেলে না। জাহাজের দোকানে সাবান, শ্যাম্পুর মতো প্রয়োজনীয় সামগ্রীর জোগানেও টান পড়েছে। কিছু পণ্য কেনার ক্ষেত্রে সংখ্যার সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। পরিবারের পাঠানো পার্সেল পৌঁছতেও কখনও কখনও কয়েক মাস লেগে যাচ্ছে, এমনকি কিছু পার্সেল হারিয়েও যাচ্ছে বলে অভিযোগ।
এক নাবিকের স্ত্রী জানিয়েছেন, তাঁর স্বামী সাধারণত কাজের চাপ কখনও পরিবারের উপর প্রকাশ করেন না। দায়িত্ব শেষ করে বাড়ি ফিরলেই সব ভুলে যেতে পারেন। কিন্তু এ বারের দীর্ঘ অভিযান যেন তাঁকে বদলে দিয়েছে। তিনি ক্রমশ রাগী ও হতাশ হয়ে উঠছেন—যা তাঁর স্বাভাবিক চরিত্রের সম্পূর্ণ বিপরীত। ওই নাবিক নিজেই এই অভিযানকে জীবনের সবচেয়ে খারাপ সামরিক অভিজ্ঞতা বলে বর্ণনা করেছেন।
উদ্বেগ আরও বেড়েছে সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনার পর। আব্রাহাম লিঙ্কন পরিচালিত নৌবহরের দু’জন নাবিক সমুদ্রে পড়ে গিয়েছিলেন। দু’জনকেই জীবিত উদ্ধার করা হয়। অগস্টের গোড়ায় সমুদ্রে পড়ে যাওয়া এক নাবিককে পরে চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণের জন্য জাহাজ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। যদিও এই ঘটনাগুলির সঙ্গে দীর্ঘ অভিযানের মানসিক চাপের সরাসরি কোনও সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা প্রকাশ্যে নিশ্চিত করা হয়নি।
মার্কিন নৌবাহিনী অবশ্য মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার দাবি মানেনি। তাদের বক্তব্য, জাহাজে আত্মহত্যার চিন্তা বা চেষ্টার ঘটনা বেড়েছে—এমন কোনও লক্ষণ নেই। নাবিকদের সহায়তায় ধর্মীয় পরামর্শদাতা, চিকিৎসক এবং মানসিক স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ রয়েছেন। কোনও সমস্যা দেখা দিলে তা মূল্যায়ন ও মোকাবিলার ব্যবস্থাও করা হয়। তবে নাবিকদের মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত ঘটনার বিস্তারিত পরিসংখ্যান প্রকাশ করেনি নৌবাহিনী।
প্রতিরক্ষাসচিব পিট হেগসেথও জাহাজের পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলির বিরোধিতা করেছেন। তাঁর দাবি, বাস্তব অবস্থাকে সম্পূর্ণ বিকৃত করে তুলে ধরা হচ্ছে। নৌকর্তাদের বক্তব্যও, জর্জ ওয়াশিংটনকে পাঠিয়ে আব্রাহাম লিঙ্কনকে দেশে ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা আগে থেকেই ছিল; সংবাদমাধ্যমে অভিযোগ প্রকাশের পর তড়িঘড়ি করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
সাধারণত মার্কিন নৌবাহিনী একটি বিমানবাহী রণতরির অভিযান প্রায় সাত মাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার চেষ্টা করে। আব্রাহাম লিঙ্কন ইতিমধ্যেই সেই সময়সীমা অনেকটাই পেরিয়ে গিয়েছে। যুদ্ধকালীন প্রয়োজন, সামরিক কৌশল এবং নাবিকদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার মধ্যে ভারসাম্য রাখা এখন নৌবাহিনীর বড় পরীক্ষা।
আর সেই পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের “যথেষ্ট দীর্ঘ নয়” মন্তব্য যেন বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সমুদ্রে টানা ২৫০ দিনের কাছাকাছি কাটানো নাবিকদের কাছে যে অভিযান ইতিমধ্যেই অসহনীয় দীর্ঘ, প্রেসিডেন্টের চোখে সেটিই আবার যথেষ্ট নয়—এই বৈপরীত্যই এখন সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন তুলছে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



