এক দিনে তিন ফাঁসি!

যা জানা জরুরি
- মন্টগোমারি: প্রায় ১৬ বছর পর ফের একই দিনে তিন বন্দির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে চলেছে আমেরিকা।
- বৃহস্পতিবার টেনেসি, অ্যালাবামা এবং ওকলাহোমায় তিন জনকে প্রাণঘাতী ইনজেকশন দেওয়ার কথা।
- ঘটনাটি নিছক প্রশাসনিক সময়সূচির সমাপতন হলেও, এর মধ্য দিয়ে আমেরিকায় মৃত্যুদণ্ডের ক্রমশ সীমিত হয়ে আসা ব্যবহার এবং প্রাণঘাতী ইনজেকশন নিয়ে পুরনো বিতর্ক আবার সামনে…
বিস্তারিত প্রতিবেদন
মন্টগোমারি: প্রায় ১৬ বছর পর ফের একই দিনে তিন বন্দির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে চলেছে আমেরিকা। বৃহস্পতিবার টেনেসি, অ্যালাবামা এবং ওকলাহোমায় তিন জনকে প্রাণঘাতী ইনজেকশন দেওয়ার কথা। ঘটনাটি নিছক প্রশাসনিক সময়সূচির সমাপতন হলেও, এর মধ্য দিয়ে আমেরিকায় মৃত্যুদণ্ডের ক্রমশ সীমিত হয়ে আসা ব্যবহার এবং প্রাণঘাতী ইনজেকশন নিয়ে পুরনো বিতর্ক আবার সামনে এসেছে।
একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে—মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের ভূমিকা কতটা নিরাপদ, গুরুতর শারীরিক সমস্যায় থাকা বন্দিদের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি কতটা মানবিক এবং দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার পর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের ভূমিকা কোথায় গিয়ে থামা উচিত?
‘ডেথ পেনাল্টি ইনফরমেশন সেন্টার’-এর কার্যনির্বাহী অধিকর্তা রবিন মাহের জানিয়েছেন, একই দিনে তিনটি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া অত্যন্ত বিরল। তাঁর মতে, গোটা আমেরিকার দিকে তাকালে দেখা যায়, বর্তমানে মাত্র পাঁচ-ছ’টি রাজ্য নিয়মিত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করছে। নতুন করে মৃত্যুদণ্ডের সাজাও মূলত অল্প কয়েকটি রাজ্যেই দেওয়া হচ্ছে।
২০২৫ সালে আমেরিকার ১১টি রাজ্যে মোট ৪৭ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছিল—২০০৯ সালের পর এক বছরে সর্বোচ্চ সংখ্যা। এর মধ্যে শুধু ফ্লরিডাতেই ১৯ জনের মৃত্যুদণ্ড হয়। অ্যালাবামা, সাউথ ক্যারোলাইনা ও টেক্সাসে পাঁচ জন করে, টেনেসিতে তিন জন এবং ওকলাহোমা, মিসিসিপি, অ্যারিজোনা ও ইন্ডিয়ানায় দু’জন করে বন্দির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল। লুইজিয়ানা ও মিসৌরিতে হয়েছিল একটি করে।
২০২৬ সালে এখনও পর্যন্ত চারটি রাজ্যে ১৯ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। গত জুলাইয়ে ফ্লরিডায় একই দিনে দু’জন বন্দিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
এর আগে একই দিনে তিনটি মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের নজির ছিল ২০১০ সালের ৭ জানুয়ারি। সে দিন লুইজিয়ানা, ওহায়ো ও টেক্সাসে তিন বন্দির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছিল। ২০১৮ সালেও একই দিনে তিনটি মৃত্যুদণ্ড হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু টেক্সাসের এক বন্দি সাময়িক অব্যাহতি পান এবং অ্যালাবামায় শিরায় নল ঢোকাতে সমস্যা হওয়ায় শেষ পর্যন্ত মাত্র একজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়।
টেনেসিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন
বৃহস্পতিবারের তিনটি মৃত্যুদণ্ডের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নজর টেনেসির দিকে। সেখানে ৬৬ বছরের অ্যান্টনি ড্যারেল হাইনসকে প্রাণঘাতী ইনজেকশন দেওয়ার কথা।
কারণ, মাত্র তিন মাস আগেই একই রাজ্যে এক বন্দির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল। গত মে মাসে টনি কারুথার্সের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার সময় চিকিৎসক দল তাঁর শরীরে প্রথম শিরার নল বসাতে পারলেও প্রয়োজনীয় দ্বিতীয় বা বিকল্প নলটি বসাতে গিয়ে এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। শেষ পর্যন্ত মৃত্যুদণ্ড স্থগিত করতে হয়। কারুথার্সকে এক বছরের সাময়িক অব্যাহতিও দেওয়া হয়েছে।
এই ঘটনার কথা তুলে ধরে হাইনস আদালত এবং টেনেসির গভর্নর বিল লির কাছে হস্তক্ষেপের আবেদন করেছিলেন। তাঁর দাবি, অতীতে তাঁর দু’বার মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়েছে এবং শরীরের একাংশ পক্ষাঘাতগ্রস্ত। পাশাপাশি রয়েছে আরও একাধিক শারীরিক সমস্যা। ফলে তাঁর শিরায় নল ঢোকানোর সময় গুরুতর জটিলতা তৈরি হতে পারে।
হাইনসের আইনজীবীরা আরও দাবি করেন, আগের ব্যর্থ মৃত্যুদণ্ডের সঙ্গে যুক্ত চিকিৎসকের প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ছিল না। সেই একই চিকিৎসক তাঁর মৃত্যুদণ্ডের দায়িত্বে থাকলে আবারও সমস্যা হতে পারে বলে তাঁরা আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
তবে গভর্নর লি আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছেন। টেনেসির সর্বোচ্চ আদালতও গত সপ্তাহে মৃত্যুদণ্ড স্থগিত করার আর্জি খারিজ করে দেয়। রাজ্য প্রশাসন অবশ্য জানায়নি, আগের ঘটনার সঙ্গে যুক্ত চিকিৎসকই বৃহস্পতিবারের প্রক্রিয়ায় থাকবেন কি না।
১৯৮৫ সালে কিংস্টন স্প্রিংসের একটি মোটেলে কর্মরত ৫৪ বছরের ক্যাথরিন জিন জেনকিন্সকে ছুরি মেরে হত্যার দায়ে হাইনস দোষী সাব্যস্ত হন। ১৯৮৬ সালে প্রথম বার তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। পরে আপিলের পর নতুন করে সাজা ঘোষণার নির্দেশ দেওয়া হয়। ১৯৮৯ সালে ফের তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
অ্যালাবামায় ‘স্বেচ্ছায়’ মৃত্যুর পথে বন্দি
অ্যালাবামায় ৪২ বছরের জেরেমি উইলিয়ামসের প্রাণঘাতী ইনজেকশনের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার কথা। পাঁচ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার মামলায় তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
উইলিয়ামস ২০২১ সালে জর্জিয়ার বাসিন্দা কামারি হল্যান্ডকে হত্যার কথা স্বীকার করেছিলেন। এমনকি মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার বদলে দ্রুত সাজা কার্যকর করার আবেদনও করেছেন তিনি।
সরকারি আইনজীবীদের অভিযোগ, শিশুটির মাকে ২,৫০০ ডলার দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন উইলিয়ামস। বিনিময়ে শিশুটির উপর যৌন নির্যাতনের সুযোগ চেয়েছিলেন তিনি। পরে শিশুটিকে ধর্ষণ করে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। পুরো নির্যাতনের ঘটনাটি মোবাইল ফোনে ধারণ করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ। এমনকি শিশুটির মৃত্যুর পরও তার দেহের উপর নির্যাতন চালানো হয়েছিল বলে সরকারি আইনজীবীদের দাবি।
উইলিয়ামসের বিরুদ্ধে ২০২২ সালে আলাস্কায় নিজের শিশুকন্যার ২০০৫ সালের মৃত্যুর ঘটনাতেও অভিযোগ আনা হয়েছিল।
রাসেল কাউন্টির সরকারি আইনজীবী রিচার্ড চান্সির দাবি, উইলিয়ামস একাধিক শিশুর জীবন ধ্বংস করেছেন।
যে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিরা নিজেরাই আপিল প্রত্যাহার করে দ্রুত সাজা কার্যকরের পথ খুলে দেন, তাঁদের সাধারণত ‘স্বেচ্ছাসেবী’ বলা হয়। আমেরিকায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া বন্দিদের প্রায় ১০ শতাংশ এই শ্রেণির। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তাঁরা বহু বছর মৃত্যুকক্ষে কাটানোর পর আপিল প্রত্যাহার করেন।
উইলিয়ামসকে ২০২৪ সালে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল। মাত্র দু’বছরের মধ্যে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দিন নির্ধারিত হওয়া অস্বাভাবিক দ্রুত বলে মনে করছেন মাহের।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলে চলতি বছরে অ্যালাবামার এটি হবে প্রথম ঘটনা। গত জুনে সেখানে নাইট্রোজেন গ্যাস প্রয়োগে এক বন্দির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কথা ছিল। কিন্তু এক যুক্তরাষ্ট্রীয় বিচারক সেই পদ্ধতিকে অসাংবিধানিক বলে রায় দেওয়ায় তা স্থগিত হয়ে যায়।
ওকলাহোমায় তৃতীয় মৃত্যুদণ্ড
ওকলাহোমায় ৭০ বছরের কার্লোস কুয়েস্তা-রড্রিগেজের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার কথা। ২০০৩ সালে বান্ধবী অলিম্পিয়া ফিশারকে হত্যার দায়ে তিনি দোষী সাব্যস্ত হন। প্রাণঘাতী ইনজেকশন দেওয়া হলে চলতি বছরে ওকলাহোমায় এটিই হবে তৃতীয় মৃত্যুদণ্ড।
সরকারি আইনজীবীদের বক্তব্য, ৪৩ বছরের ফিশার কুয়েস্তা-রড্রিগেজের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। সেই সময় তিনি ফিশারের একটি চোখে গুলি করেন। প্রায় আট মিনিট ধরে ফিশার সাহায্যের জন্য চিৎকার করলেও তিনি অপেক্ষা করেন। পরে অন্য চোখে দ্বিতীয় গুলি চালিয়ে তাঁকে হত্যা করা হয়।
গত মাসে ওকলাহোমার ক্ষমা ও সাময়িক মুক্তি পর্ষদ ৩-১ ভোটে তাঁর প্রাণভিক্ষার সুপারিশ না করার সিদ্ধান্ত নেয়। তাঁর আইনজীবীরা মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে প্যারোলবিহীন যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আবেদন করেছিলেন।
তাঁদের যুক্তি ছিল, কুয়েস্তা-রড্রিগেজের শৈশব অত্যন্ত দুর্বিষহ ছিল। তাঁর মস্তিষ্কে ক্ষতি, মানসিক আঘাত-পরবর্তী সমস্যা এবং মনোবিকারের পর্ব-সহ গুরুতর অবসাদের ইতিহাস রয়েছে।
কিন্তু কুয়েস্তা-রড্রিগেজ নিজেই প্রাণভিক্ষা চাননি। স্প্যানিশ ভাষার দোভাষীর মাধ্যমে তিনি পর্ষদকে জানান, ফিশারের দুই মেয়ের কাছে তিনি নিজের অপরাধের জন্য অনুতপ্ত—এই বার্তাটিই পৌঁছতে চান। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, এমন ভয়াবহ অপরাধ করার সময় তিনি স্বাভাবিক মানসিক অবস্থায় ছিলেন না।
মৃত্যুদণ্ডের ভবিষ্যৎ নিয়েই বড় প্রশ্ন
এক দিনে তিনটি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার ঘটনা তাই শুধু বিরল একটি প্রশাসনিক সমাপতন নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আমেরিকায় মৃত্যুদণ্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে দীর্ঘ বিতর্ক।
অধিকাংশ রাজ্য যখন মৃত্যুদণ্ড থেকে ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে, তখন কয়েকটি রাজ্যে এর ব্যবহার এখনও অব্যাহত। ফলে বৃহস্পতিবারের তিনটি মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি আবারও সামনে আসছে কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন—অপরাধ যত ভয়াবহই হোক, রাষ্ট্রের হাতে জীবন কেড়ে নেওয়ার অধিকার কতটা থাকা উচিত? প্রাণঘাতী ইনজেকশন কতটা মানবিক? আর দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার শেষে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি কী ভাবে নিশ্চিত করা যায়?
এই প্রশ্নগুলির উত্তর এখনও মার্কিন সমাজ ও বিচারব্যবস্থার কাছে বিতর্কিতই রয়ে গিয়েছে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



