ভারতের নিরাপত্তা চিন্তায় ‘বৃহৎ দেশের ফাঁদ’: বিশ্বকে না বুঝেই বিশ্বশক্তি হওয়ার আকাঙ্ক্ষা

যা জানা জরুরি
- বাংলাস্ফিয়ার: গত ৮ আগস্ট মক্কায় যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক।
- চুক্তির মূল কথা—তিন দেশের কোনও একটির উপর আক্রমণ হলে, তা বাকিদের উপরেও আক্রমণ বলে গণ্য হবে।
- এমন একটি চুক্তি স্বাভাবিক ভাবেই ভারতের কৌশলগত মহলে আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
বাংলাস্ফিয়ার: গত ৮ আগস্ট মক্কায় যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক। চুক্তির মূল কথা—তিন দেশের কোনও একটির উপর আক্রমণ হলে, তা বাকিদের উপরেও আক্রমণ বলে গণ্য হবে। এমন একটি চুক্তি স্বাভাবিক ভাবেই ভারতের কৌশলগত মহলে আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। কিন্তু সেই আলোচনার প্রায় পুরোটাই আবর্তিত হয়েছে পাকিস্তানকে ঘিরে।
তুরস্কের কথা এসেছে ঠিকই, তবে স্বাধীন আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে নয়—পাকিস্তানের অস্ত্র ও ড্রোন সরবরাহকারী, ভারতের প্রতি বৈরী একটি দেশ এবং রেচেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের শাসনাধীন রাষ্ট্র হিসেবে। সৌদি আরবের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হয়েছে আরও কম। কারণ, রিয়াধের সঙ্গে নয়াদিল্লির অর্থনৈতিক, জ্বালানি ও প্রবাসী-স্বার্থ এত গভীর যে, তাকে অস্বস্তিতে ফেলতে ভারতীয় ভাষ্যকারেরা সাধারণত আগ্রহী নন।
এই প্রতিক্রিয়ার মধ্যেই ভারতের নিরাপত্তা চিন্তার একটি মৌলিক দুর্বলতা ধরা পড়ে। তুরস্কের নিজস্ব আঞ্চলিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা আছে। তার অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে চাপের মধ্যে। সুন্নি বিশ্বের নেতৃত্ব নিয়ে মিশর ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহির সঙ্গে তার প্রতিযোগিতা রয়েছে। উপসাগরীয় নিরাপত্তা কাঠামোয় স্থায়ী জায়গা করে নেওয়ারও নিজস্ব কারণ রয়েছে আঙ্কারার। সেই কারণগুলির সব ক’টি ভারত বা পাকিস্তানকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়নি।
কিন্তু ভারতের আলোচনায় তুরস্ককে দেখা হয় প্রধানত পাকিস্তানের সহায়ক হিসেবে। একটি প্রায় আট কোটি পঞ্চাশ লক্ষ মানুষের দেশ, যার কয়েক শতাব্দীর আঞ্চলিক কূটনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা রয়েছে, দিল্লির চোখে যেন কেবল পাকিস্তানকে ড্রোন সরবরাহকারী।
অথচ অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নই তোলা হয়না।সৌদি শাসনব্যবস্থার ভিতরে এই চুক্তির সিদ্ধান্ত কী ভাবে নেওয়া হল? কারা তার পক্ষে এবং কারা বিপক্ষে ছিলেন? মক্কায় যুবরাজের পাশে দাঁড়িয়ে এরদোয়ান নিজের দেশের রাজনীতিতে কী লাভ করতে চাইছেন? উপসাগরে বসবাসকারী প্রায় নব্বই লক্ষ ভারতীয় এই পরিবর্তনকে কী ভাবে দেখছেন? মিশর, আমিরশাহি, কাতার কিংবা ইরান এই জোটকে কী ভাবে বিচার করছে?
ভারতে এমন বিশেষজ্ঞের সংখ্যা খুবই কম, যাঁরা প্রত্যক্ষ জ্ঞান ও দীর্ঘ গবেষণার ভিত্তিতে এই প্রশ্নগুলির উত্তর দিতে পারেন। অর্থাৎ, তিন দেশের একটি চুক্তি নিয়ে আমরা বিপুল মন্তব্য করেছি, অথচ সেই তিনটির মধ্যে অন্তত দু’টি দেশকেই গভীর ভাবে অধ্যয়ন করিনি।
সমস্যা শুধু জ্ঞানের ঘাটতিতে সীমাবদ্ধ নয়। আরও বড় সমস্যা হল, ঐকমত্যকে প্রমাণ হিসেবে দেখার অভ্যাস। আলোচনা সভা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সংবাদমাধ্যম এবং সমাজমাধ্যমে একটি প্রভাবশালী মত তৈরি হয়। বারবার উচ্চারিত হতে হতে সেটিই সাধারণ জ্ঞান হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। পরে সেই মতই সরকারের সামনে নীতি-পরামর্শ হিসেবে তুলে ধরা হয়।
সরকারের সিদ্ধান্ত যদি সেই পরামর্শের সঙ্গে মিলে যায়, তা হলে বলা হয়—বিশ্লেষণটি সঠিক ছিল। সরকার অন্য পথে গেলে অভিযোগ ওঠে, সুস্থ নিরাপত্তা বোধ থেকে বিচ্যুতি ঘটেছে। এই ব্যবস্থায় কোনও ধারণার সত্যতা যাচাই হয় না প্রমাণ, ক্ষেত্রসমীক্ষা বা যুক্তির মাধ্যমে; যাচাই হয় ক্ষমতাশালী মহলের সম্মতির ভিত্তিতে।
ভারতের নিরাপত্মতা বিশেষজ্ঞ হল এখনও ছোট, বন্ধ এবং অনেকটা গোষ্ঠীনির্ভর। সেখানে প্রবেশাধিকার প্রায়ই নির্ধারিত হয় কে কোথায় কাজ করেছেন, কার ছাত্র ছিলেন, কোন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত, কোন সামাজিক বৃত্তে চলাফেরা করেন—এই সব পরিচয়ে। ফলে নতুন প্রশ্ন তোলার চেয়ে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া কাঠামোর মধ্যে কথা বলাই নিরাপদ।
এর ফল, ভাষ্যের উপর ভাষ্য, তার উপর আবার দ্বিতীয় বা তৃতীয় স্তরের ভাষ্য তৈরি হয়। একসময় বোঝাই কঠিন হয়ে পড়ে, মূল চিন্তাটি কার এবং কোন তথ্যের ভিত্তিতে তা দাঁড়িয়ে আছে। প্রচলিত শ্রেণিবিভাগকে চ্যালেঞ্জ করার উৎসাহও কম। কারণ, বিশেষজ্ঞের স্বীকৃতি এবং প্রতিষ্ঠানে প্রবেশের অধিকার ওই শ্রেণিবিভাগে দক্ষতার উপরেই নির্ভর করে।
ভারতের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ সমাজ সবচেয়ে বেশি আলোচনা করে পাকিস্তান, চিন ও আমেরিকা নিয়ে। গত দেড় বছরের অভিজ্ঞতার পরে এই তিন দেশ সম্পর্কেও আমাদের বোঝাপড়া কতটা গভীর, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। তার বাইরে উপসাগরীয় দেশগুলির অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, লাতিন আমেরিকা, সাহেল অঞ্চল, মধ্য এশিয়া কিংবা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দলীয় ব্যবস্থা—প্রায় সবই অবহেলিত।
উপসাগরীয় অঞ্চলে এত বিপুল সংখ্যক ভারতীয় বসবাস করলেও সেখানকার রাজপরিবার, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, তরুণ প্রজন্ম এবং ক্ষমতার সামাজিক ভিত্তি নিয়ে ভারতে ধারাবাহিক গবেষণা প্রায় নেই। অথচ সেই সব অঞ্চল সম্পর্কে মন্তব্যের অভাবও নেই। আমরা পৃথিবীর অতি ক্ষুদ্র অংশ অধ্যয়ন করে গোটা বিশ্ব নিয়ে অনায়াসে সিদ্ধান্ত জানাই।
এই আত্মবিশ্বাসের পিছনে রয়েছে ভারতের বৃহৎ আয়তন ও বিপুল অভ্যন্তরীণ পরিসর। এত বড় একটি দেশ প্রতিদিন এত আলোচনা, সভা, বই, প্রবন্ধ, বিতর্ক ও সমাজমাধ্যমের কথোপকথন তৈরি করে যে, সেই জগৎটিকেই সম্পূর্ণ বলে মনে হয়। দেশের বিদেশনীতি-সংক্রান্ত বৌদ্ধিক বলয়ের মধ্যেই একটি গোটা কর্মজীবন কাটিয়ে দেওয়া যায়—বিদেশে না গিয়ে, অন্য ভাষা না শিখে, কোনও কঠিন অঞ্চলে দীর্ঘদিন ক্ষেত্রসমীক্ষা না করেও।
নিজেদের বিশাল কথোপকথনের মধ্যে আমরা নিজেদের প্রতিবিম্বকেই পৃথিবী বলে ভুল করি। আমাদের বিশ্লেষণের অভ্যন্তরীণ বাজার এত বড় যে, উৎপাদিত প্রতিটি মতামত এখানেই পাঠক, দর্শক এবং মর্যাদা পেয়ে যায়। বাইরের বাস্তবতার কাছে তার পরীক্ষা দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। এটাই ভারতের কৌশলচিন্তার ‘বৃহৎ দেশের ফাঁদ’।
এর আরও বিপজ্জনক দিক রয়েছে। প্রতিবেশী দেশ নিয়ে গবেষণা না করাই শুধু নয়, যাঁরা প্রত্যক্ষ ভাবে তা করতে চান, কখনও কখনও তাঁদের সন্দেহের চোখে দেখা হয়। কোনও ভারতীয় গবেষক কয়েক মাস পাকিস্তানে থেকে সমাজ ও রাজনীতি নিয়ে গবেষণা করতে চাইলে তাঁকে সহজে স্বাভাবিক গবেষক হিসেবে গ্রহণ করা হবে কি না, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
ছোট রাষ্ট্রগুলির পক্ষে এমন আত্মতুষ্টি সম্ভব নয়। মাত্র ষাট লক্ষ মানুষের সিঙ্গাপুর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া নিয়ে উন্নত গবেষণা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে, কারণ প্রতিবেশীদের সঠিক ভাবে বোঝার উপর তার নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধি নির্ভরশীল। উপসাগরের ছোট দেশগুলি ভারতীয় রাজনীতি ও সমাজ বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করে, কারণ তাদের শ্রমবাজারে ভারতীয়দের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ছোট হওয়া রাষ্ট্রকে বাইরের দিকে তাকাতে বাধ্য করে; বৃহৎ হওয়া কখনও কখনও অন্তর্মুখিতাকেই গভীরতা বলে চালাতে সাহায্য করে।
ভারতের ক্ষেত্রে বৃহৎ শক্তি হওয়ার আকাঙ্ক্ষা বৌদ্ধিক কৌতূহল বাড়ানোর বদলে আত্মকেন্দ্রিকতা বাড়িয়েছে। বিশ্বের প্রতিটি ঘটনাকে আমরা কয়েকটি প্রশ্নে নামিয়ে আনি—এতে ভারতের কী লাভ, ভারতের উত্থানে কী প্রভাব পড়বে, আন্তর্জাতিক মর্যাদা বাড়বে না কমবে? এগুলি অবশ্যই বৈধ প্রশ্ন। কিন্তু অন্য দেশটি কী চায়, তার সমাজ কী ভাবে, তার শাসকের অভ্যন্তরীণ বাধ্যবাধকতা কী—এসব না বুঝলে আমরা কেবল নিজেদের আকাঙ্ক্ষাই বুঝব, পৃথিবীকে নয়।
এই দুর্বলতা কাটাতে প্রয়োজন ধীর, অনাড়ম্বর এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। অঞ্চলভিত্তিক গবেষণা, বিদেশি ভাষাশিক্ষা এবং দীর্ঘ ক্ষেত্রসমীক্ষার জন্য স্থায়ী অর্থ বরাদ্দ করতে হবে। কৌশলগত মহলের পরিচিত গোষ্ঠীর বাইরে থেকে নৃতত্ত্ববিদ, অর্থনীতিবিদ, ইতিহাসবিদ এবং বিদেশে দীর্ঘদিন থাকা সাংবাদিকদের যুক্ত করা প্রয়োজন। জাকার্তা, লাগোস বা রিয়াধে বসবাসকারী মানুষ অনেক সময় এমন বাস্তবতা জানেন, যা দিল্লির আলোচনাসভায় পাওয়া যায় না।
মধ্যপ্রাচ্যে থাকা নব্বই লক্ষ ভারতীয়কে শুধু প্রবাসী আয় পাঠানো মানুষ হিসেবে না দেখে জ্ঞানের সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। তাঁদের অভিজ্ঞতা, স্থানীয় যোগাযোগ এবং সমাজ পর্যবেক্ষণকে গবেষণার সঙ্গে যুক্ত করা দরকার। এর ফল পেতে হয়তো পনেরো বছর লাগবে। তাই কাজটি এখনই শুরু হওয়া প্রয়োজন।
প্রয়াত কে সুব্রহ্মণ্যম ভারতীয় গবেষকদের বারবার বলেছিলেন, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া বদ্ধ ধারণা ত্যাগ করে পৃথিবীকে তার বাস্তব রূপে দেখতে। দুর্ভাগ্য, ভারতের কৌশলগত সমাজ তাঁর কথার মর্ম গ্রহণ করার চেয়ে তাঁকে উদ্ধৃত করতেই বেশি স্বচ্ছন্দ। বিশ্বশক্তি হওয়ার আগে ভারতকে তাই বিশ্বকে জানার ক্ষমতা অর্জন করতে হবে। বৃহৎ হওয়া যথেষ্ট নয়; নিজের বাইরের পৃথিবী সম্পর্কে কৌতূহলী হওয়াই প্রকৃত কৌশলগত প্রজ্ঞার সূচনা।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



