শতবর্ষ পর আঁধারে স্পেন: দু’মিনিটের পূর্ণগ্রাসে অকাল সন্ধ্যা ইউরোপে

যা জানা জরুরি
- পশ্চিম আকাশে সূর্য নেমে এসেছে দিগন্তের কাছাকাছি।
- হঠাৎ তার উজ্জ্বল মুখের উপর দিয়ে এগিয়ে এল চাঁদের কালো চাকতি।
- কয়েক মিনিটের মধ্যে আলো ফিকে হল, তাপমাত্রা নামল, পাখিরা নীড়ে ফেরার প্রস্তুতি শুরু করল।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
বাংলাস্ফিয়ার: দিন তখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি। পশ্চিম আকাশে সূর্য নেমে এসেছে দিগন্তের কাছাকাছি। হঠাৎ তার উজ্জ্বল মুখের উপর দিয়ে এগিয়ে এল চাঁদের কালো চাকতি। কয়েক মিনিটের মধ্যে আলো ফিকে হল, তাপমাত্রা নামল, পাখিরা নীড়ে ফেরার প্রস্তুতি শুরু করল। তার পর প্রায় দু’মিনিটের জন্য সূর্য সম্পূর্ণ অদৃশ্য। স্পেনের বিস্তীর্ণ অঞ্চল বুধবার, ১২ আগস্ট, প্রত্যক্ষ করল এক বিরল পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ।
স্পেনে এক শতাব্দীরও বেশি সময় পরে এমন পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখা গেল। চাঁদের ঘন ছায়া উত্তর রাশিয়ার একাংশ থেকে গ্রিনল্যান্ড ও আইসল্যান্ড অতিক্রম করে উত্তর আটলান্টিকের উপর দিয়ে স্পেনে প্রবেশ করেছিল। পর্তুগালের উত্তর-পূর্ব প্রান্তও ছায়াপথের মধ্যে পড়ে। স্পেনের গ্যালিসিয়া থেকে উত্তর ও মধ্যাঞ্চল পেরিয়ে গ্রহণের পথ পৌঁছয় ভূমধ্যসাগরের বালিয়ারিক দ্বীপপুঞ্জে। ইউরোপের অন্য বহু জায়গা থেকে দেখা যায় আংশিক গ্রহণ। নাসার মানচিত্র ও সময়সূচি অনুযায়ী, লেওনে পূর্ণগ্রাস শুরু হয় স্থানীয় সময় রাত ৮টা ২৮ মিনিটে এবং শেষ হয় প্রায় দু’মিনিট পরে। ভ্যালেন্সিয়ায় তা স্থায়ী হয়েছিল প্রায় এক মিনিট।
স্পেনে সূর্য তখন দিগন্তের খুব কাছাকাছি থাকায় দৃশ্যটি ছিল আরও নাটকীয়। গ্রহণের সময় সূর্যের বহিরাবরণ বা করোনা কালো চাঁদের চার পাশে রুপোলি মুকুটের মতো ফুটে ওঠে। কোথাও দেখা যায় ‘বেইলির মালা’—চাঁদের পাহাড় ও উপত্যকার ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে আসা সূর্যালোকের ছোট ছোট উজ্জ্বল বিন্দু। পূর্ণগ্রাস শুরুর ঠিক আগে ও শেষে তৈরি হয় বিখ্যাত ‘হিরের আংটি’। চারদিকের দিগন্তে তখন গোধূলির মতো কমলা আভা, অথচ মাথার উপরে অকাল অন্ধকার।
এই আকস্মিক পরিবর্তনে শুধু মানুষ নয়, প্রকৃতিও সাময়িকভাবে বিভ্রান্ত হয়। আলো দ্রুত কমে গেলে পাখিরা সন্ধ্যা নেমেছে ভেবে বাসায় ফিরতে পারে, পতঙ্গের ডাক বদলে যায় এবং দিনের প্রাণীরা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। বাতাসের তাপমাত্রাও কয়েক ডিগ্রি কমতে পারে। পূর্ণগ্রাস শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সূর্যের প্রথম আলো ফিরে এলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই প্রকৃতি আবার স্বাভাবিক ছন্দে ফেরে।
একটি পূর্ণগ্রাস গ্রহণ তখনই ঘটে, যখন সূর্য, চাঁদ ও পৃথিবী প্রায় নিখুঁত সরলরেখায় আসে। সূর্যের তুলনায় চাঁদ প্রায় ৪০০ গুণ ছোট, কিন্তু সূর্যের তুলনায় পৃথিবীর প্রায় ৪০০ গুণ কাছে। তাই পৃথিবী থেকে দু’টির আপাত আয়তন প্রায় সমান মনে হয়। কক্ষপথের উপযুক্ত অবস্থানে চাঁদ সূর্যের উজ্জ্বল চাকতিকে সম্পূর্ণ ঢেকে দিতে পারে।
কিন্তু চাঁদের ঘনতম ছায়া বা প্রচ্ছায়া পৃথিবীর খুব সরু একটি অংশের উপর দিয়ে যায়। এই সরু করিডরই পূর্ণগ্রাসের পথ। তার বাইরে থাকা মানুষ চাঁদের হালকা ছায়া বা উপচ্ছায়ার মধ্যে পড়লে কেবল আংশিক গ্রহণ দেখতে পান। ভারত এ বার ওই দুই ছায়া অঞ্চলেরই বাইরে ছিল। ভারতীয় সময় রাত ৯টার পরে গ্রহণ শুরু হওয়ার সময় দেশে সূর্য অস্ত গিয়েছে। পৃথিবীর বক্রতার কারণে স্পেনমুখী সূর্যকে তখন ভারত থেকে দেখার কোনও সুযোগই ছিল না।
ভারতীয়দের অবশ্য খুব দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হবে না—কিন্তু পরেরটিও পূর্ণগ্রাস নয়। আগামী ২ আগস্ট ২০২৭ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আংশিক সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে। দেশজুড়ে গ্রহণের সম্ভাব্য সময় ভারতীয় সময় বিকেল ৩টা ৩৪ মিনিট থেকে ৫টা ৫৩ মিনিটের মধ্যে হলেও স্থানভেদে শুরু, শেষ এবং সূর্যের ঢাকা পড়ার পরিমাণ বদলাবে। ওই গ্রহণের পূর্ণগ্রাস পথ যাবে দক্ষিণ ইউরোপ, উত্তর আফ্রিকা ও পশ্চিম এশিয়ার উপর দিয়ে; ভারতে পৌঁছবে কেবল তার আংশিক ছায়া। ভারতের গ্রহণসূচি অনুযায়ী, দেশের কোথাও সূর্য সম্পূর্ণ অদৃশ্য হবে না।
ভারতের উপর দিয়ে পরবর্তী বিশেষ গ্রহণটি ঘটবে ২১ মে ২০৩১। সেটি পূর্ণগ্রাস নয়, বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণ। চাঁদ তখন সূর্যকে পুরোপুরি ঢাকতে পারবে না; তার চার পাশে আগুনের উজ্জ্বল বলয় দেখা যাবে। দক্ষিণ ভারতের কিছু অঞ্চল সেই বলয়গ্রাস পথের মধ্যে পড়বে।
গ্রহণ দেখার ক্ষেত্রে সতর্কতা সবচেয়ে জরুরি। সাধারণ রোদচশমা, রঙিন কাচ, এক্স-রে পাত বা ক্যামেরার পর্দা চোখকে রক্ষা করে না। আংশিক পর্যায়ে কেবল আন্তর্জাতিক মানের গ্রহণ-চশমা ব্যবহার করা নিরাপদ। দূরবীন কিংবা ক্যামেরার সামনে বিশেষ সৌর-ছাঁকনি বসাতে হয়। পূর্ণগ্রাসের অতি সংক্ষিপ্ত মুহূর্তটুকু ছাড়া খালি চোখে সূর্যের দিকে তাকালে চোখের রেটিনা স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে—এবং সেই ক্ষতি প্রথমে ব্যথাহীন বলেই বিপদ আরও বেশি। ইউরোপ একই সতর্কতা জারি করেছে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



