বিশ্ব ব্যাডমিন্টনের আসরে বাঁদর ঠেকাতে ‘নকল লাঙ্গুর’, সত্যিই কি ভয় পায় রেসাস বাহিনী?

যা জানা জরুরি
- বিশ্ব ব্যাডমিন্টন চ্যাম্পিয়নশিপ শুরুর আগে দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী ইন্ডোর স্টেডিয়ামে চলছে অভিনব প্রস্তুতি।
- খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা কিংবা কোর্টের আলো-বাতাসের পাশাপাশি আয়োজকদের চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছে দিল্লির রেসাস বাঁদর।
- তাদের দূরে রাখতে নিয়োগ করা হয়েছে তিন জন বিশেষজ্ঞকে, যাঁরা অবিকল হনুমান লাঙ্গুরের ডাক নকল করতে পারেন।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
বিশ্ব ব্যাডমিন্টন চ্যাম্পিয়নশিপ শুরুর আগে দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী ইন্ডোর স্টেডিয়ামে চলছে অভিনব প্রস্তুতি। খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা কিংবা কোর্টের আলো-বাতাসের পাশাপাশি আয়োজকদের চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছে দিল্লির রেসাস বাঁদর। তাদের দূরে রাখতে নিয়োগ করা হয়েছে তিন জন বিশেষজ্ঞকে, যাঁরা অবিকল হনুমান লাঙ্গুরের ডাক নকল করতে পারেন। কিন্তু মানুষের গলায় লাঙ্গুরের ডাক শুনে বাঁদর কি সত্যিই পালায়? বিজ্ঞান বলছে, পদ্ধতিটি সাময়িক ভাবে কাজে লাগতে পারে, তবে এর কার্যকারণ প্রচলিত ধারণার তুলনায় অনেক বেশি জটিল।
আগামী ১৭ থেকে ২৩ আগস্ট দিল্লিতে বসবে বিডব্লিউএফ বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপের আসর। ভারতের কাছে এই প্রতিযোগিতা কেবল একটি বড় ক্রীড়া আয়োজন নয়; ২০৩০ সালের কমনওয়েলথ গেমস এবং ভবিষ্যতে অলিম্পিক আয়োজনের দাবির আগে সাংগঠনিক দক্ষতা দেখানোর সুযোগও। তাই স্টেডিয়ামে বাঁদর ঢুকে পড়ার মতো ঘটনা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে হাসির খোরাক হোক, আয়োজকেরা তা চান না।
উদ্বেগটি পুরোপুরি কাল্পনিকও নয়। চলতি বছরের ইন্ডিয়া ওপেন চলাকালীন স্টেডিয়াম চত্বরে বাঁদর দেখা গিয়েছিল। পায়রার বিষ্ঠা পড়েছিল খেলার কোর্টে, এমনকি পথকুকুর নিয়েও সমস্যা তৈরি হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতার পর এ বার স্বয়ংক্রিয় দরজা, পাখি তাড়ানোর যন্ত্র এবং পায়রাকে বসতে না দেওয়ার জন্য বিষহীন আঠালো পদার্থ ব্যবহারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর সঙ্গেই যোগ হয়েছে ‘লাঙ্গুর অনুকরণকারীদের’ পাহারা।
দিল্লিতে এই পেশা নতুন নয়। একসময় রাষ্ট্রপতি ভবন, সংসদ চত্বর, সরকারি দফতর এবং বিভিন্ন দূতাবাসে জীবন্ত লাঙ্গুর নিয়ে পাহারা দেওয়া হত। বড় চেহারার লাঙ্গুর দেখলে অপেক্ষাকৃত ছোট রেসাস বাঁদরের দল সাধারণত এলাকা ছেড়ে যেত। কিন্তু বন্যপ্রাণী সুরক্ষা এবং প্রাণীদের প্রতি নিষ্ঠুরতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় শিকলবন্দি লাঙ্গুর ব্যবহারের রীতি বন্ধ করা হয়। তার পর থেকেই জায়গা করে নেন মানুষের গলায় লাঙ্গুরের ডাক তোলা বিশেষজ্ঞেরা। ২০২৩ সালের জি২০ শীর্ষ সম্মেলনের সময়ও প্রায় ৪০ জন অনুকরণকারী এবং লাঙ্গুরের অবয়ব ব্যবহার করা হয়েছিল।
প্রচলিত ব্যাখ্যা হল, লাঙ্গুর রেসাস বাঁদরের ‘স্বাভাবিক শত্রু’; তাই তার ডাক শুনলেই বাঁদর পালায়। প্রাণীবিজ্ঞানীরা অবশ্য এই ব্যাখ্যাকে সম্পূর্ণ ঠিক বলে মনে করেন না। লাঙ্গুর ও রেসাস ম্যাকাক একে অন্যকে নিয়মিত শিকার করে না। অনেক জায়গায় তারা কাছাকাছি অঞ্চলে বসবাসও করে। তবে খাদ্য, নিরাপদ আশ্রয় কিংবা জায়গার দখল নিয়ে দুই প্রজাতির মধ্যে সংঘাত হতে পারে। লাঙ্গুর আকারে বড় এবং শারীরিক ভাবে শক্তিশালী হওয়ায় তার উপস্থিতি রেসাস বাঁদরের কাছে সম্ভাব্য বিপদের সংকেত হয়ে উঠতে পারে।
লাঙ্গুরের ডাক শুনে বাঁদরের সরে যাওয়ার পিছনে আরও কয়েকটি কারণ থাকতে পারে। প্রথমত, অচেনা ও হঠাৎ শোনা প্রবল আওয়াজ প্রাণীদের সতর্ক করে। দ্বিতীয়ত, অনুকরণকারীরা শুধু ডাকেন না; লাঠি হাতে ঘোরেন, বাঁদরের দিকে এগিয়ে যান এবং তাদের স্বাভাবিক চলাচলে বাধা তৈরি করেন। ফলে লাঙ্গুরের ডাকের পাশাপাশি মানুষের সক্রিয় উপস্থিতিই বাঁদর তাড়ানোর বড় কারণ হতে পারে। প্রাণী-আচরণ বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, পদ্ধতিটি কাজ করলেও তার অর্থ এই নয় যে বাঁদরেরা শব্দটিকে সব সময় সত্যিকারের লাঙ্গুরের ডাক বলে ভুল করছে।
বড় দুর্বলতা হল অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা। বারবার একই আওয়াজ শোনার পরেও যদি কোনও লাঙ্গুর এসে হাজির না হয় বা প্রকৃত বিপদ না ঘটে, তা হলে বুদ্ধিমান রেসাস বাঁদর দ্রুত বুঝে ফেলতে পারে যে হুমকিটি ফাঁকা। তখন ডাকের প্রভাব কমে যায়। খাবারের সহজ উৎস থাকলে ভয় উপেক্ষা করে তাদের ফিরে আসার সম্ভাবনাও বেশি। ফলে কয়েক দিনের প্রতিযোগিতায় এই কৌশল কার্যকর হতে পারে, কিন্তু দিল্লির দীর্ঘমেয়াদি বাঁদর সমস্যার সমাধান নয়।
স্থায়ী সমাধানের জন্য খোলা জায়গায় খাবার ফেলা বন্ধ করা, আবর্জনার পাত্র ঢেকে রাখা, ভবনে প্রবেশের পথ আটকানো এবং মানুষকে বাঁদরকে খাবার না দেওয়ার বিষয়ে সচেতন করা জরুরি। কোনও এলাকার বাঁদর অন্যত্র সরিয়ে দিলেও খাদ্যের উৎস খোলা থাকলে নতুন দল সেখানে চলে আসে।
তারকা খেলোয়াড় পিভি সিন্ধু এই ব্যবস্থাকে ‘স্বতন্ত্র ভারতীয় সমাধান’ বলে সমর্থন করেছেন—তাঁর বক্তব্য, বিষয়টি শুনে হাসি পেলেও প্রচেষ্টাটিকে মর্যাদা দেওয়া উচিত। বাস্তবেও নকল লাঙ্গুরের ডাক নিছক তামাশা নয়; এটি ক্ষতি না করে প্রাণী তাড়ানোর স্বল্পমেয়াদি উপায়। তবে তার সাফল্য নির্ভর করবে শব্দ, মানুষের নজরদারি এবং স্টেডিয়ামে খাবারের নাগাল বন্ধ রাখার সম্মিলিত ব্যবস্থার উপর। অর্থাৎ, বাঁদর ভয় পেতে পারে—কিন্তু দিল্লির ধূর্ত রেসাস বাহিনীকে একই কৌশলে অনির্দিষ্টকাল বোকা বানিয়ে রাখা যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



