ভারতে গল্পের অভাব নেই। ভাষা বদলালেই বদলে যায় গল্পের জগৎ, সংস্কৃতি বদলালেই খুলে যায় নতুন কাহিনির দরজা। কিন্তু সেই বিপুল গল্পের ভাণ্ডার দর্শকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার মতো সিনেমার পর্দা এখনও তুলনায় কম। নেটফ্লিক্সের সহ-সিইও-র মতে, ঠিক এই জায়গাতেই স্ট্রিমিং পরিষেবা বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নেটফ্লিক্সের সহ-সিইও ভারতের বিনোদন বাজারের সম্ভাবনা নিয়ে বলতে গিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট করেছেন—ভারতের গল্পের বাজার বিশাল, কিন্তু সেই গল্প দেখানোর প্রচলিত পরিকাঠামো এখনও সেই তুলনায় ছোট।
আর এই ফাঁকটাই পূরণ করতে পারে ডিজিটাল পর্দা।
গল্পের ভাণ্ডার, পর্দার ঘাটতি
ভারতের চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনের ইতিহাস দীর্ঘ। হিন্দির পাশাপাশি বাংলা, তামিল, তেলুগু, মালয়ালম, কন্নড়, মরাঠি-সহ অসংখ্য ভাষায় প্রতি বছর তৈরি হচ্ছে ছবি, সিরিজ ও নতুন ধরনের কনটেন্ট। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে ওটিটি-র জন্য সরাসরি তৈরি গল্প।
অর্থাৎ, কনটেন্টের অভাব নেই। সমস্যা হল, সেই কনটেন্ট দেখার সুযোগ সবার কাছে সমান নয়।
ভারতের বিপুল জনসংখ্যার তুলনায় সিনেমা হলের পর্দার সংখ্যা এখনও অনেক বড় চলচ্চিত্র বাজারের তুলনায় কম। বড় শহরে একাধিক মাল্টিপ্লেক্স থাকলেও ছোট শহর, মফস্সল বা প্রত্যন্ত অঞ্চলের দর্শকের কাছে নতুন ছবি দেখার সুযোগ অনেকটাই সীমিত।
বিশেষ করে ছোট বাজেটের বা আঞ্চলিক ভাষার ছবির ক্ষেত্রে সমস্যাটি আরও প্রকট। প্রেক্ষাগৃহে জায়গা পাওয়া, পর্যাপ্ত শো পাওয়া এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তে দর্শকের কাছে পৌঁছনো—সবটাই সহজ নয়।
মোবাইলেই নতুন ‘পর্দা’
এই জায়গাতেই ওটিটি-র সুবিধা সবচেয়ে বেশি।
একটি সিনেমা হল তৈরি করতে জায়গা, বিপুল বিনিয়োগ এবং পরিকাঠামো প্রয়োজন। কিন্তু স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের জন্য সেই একই সীমাবদ্ধতা নেই। ইন্টারনেট সংযোগ আর স্মার্টফোন বা স্মার্ট টিভি থাকলেই দর্শক নিজের বাড়িতে বসে ছবি বা সিরিজ দেখতে পারেন।
অর্থাৎ, দর্শকের কাছে পৌঁছতে আর প্রতিটি শহরে নতুন প্রেক্ষাগৃহ বানানোর প্রয়োজন নেই।
মাল্টিপ্লেক্স যেখানে পৌঁছতে পারেনি, সেখানে পৌঁছে যেতে পারে মোবাইলের পর্দা।
নেটফ্লিক্সের ‘আন্ডার-স্ক্রিনড’ ভারতের প্রসঙ্গটির মূল তাৎপর্য এখানেই। দেশের বিপুল দর্শকের জন্য ডিজিটাল মাধ্যম কার্যত একটি বিশাল বিকল্প প্রদর্শন-পরিকাঠামো তৈরি করেছে।
ভারত মানেই বহু ভাষার গল্প
ভারতের প্রতি আন্তর্জাতিক স্ট্রিমিং সংস্থার আগ্রহের আর একটি বড় কারণ হল এর ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য।
একটি দেশের মধ্যেই রয়েছে অসংখ্য ভাষা, আঞ্চলিক সংস্কৃতি, সামাজিক বাস্তবতা, ইতিহাস ও জীবনযাপনের ধরন। ফলে একটি শহর বা একটি রাজ্যের গল্পও অন্য অঞ্চলের দর্শকের কাছে নতুন অভিজ্ঞতা হয়ে উঠতে পারে।
সাবটাইটেল ও ডাবিং সেই দূরত্ব আরও কমিয়ে দিয়েছে।
এক সময় তামিল বা মালয়ালমের কোনও ছবি মূলত সেই ভাষার দর্শকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকত। এখন একই ছবি দেশের অন্য প্রান্তে এবং কখনও দেশের বাইরেও বড় দর্শকগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে যাচ্ছে।
দক্ষিণ ভারতীয় ছবির সর্বভারতীয় জনপ্রিয়তা সেই পরিবর্তনের অন্যতম বড় উদাহরণ।
‘লোকাল’ গল্পই হচ্ছে ‘গ্লোবাল’
ডিজিটাল মাধ্যম শুধু দেশের ভৌগোলিক দূরত্বই কমাচ্ছে না, ভারতীয় গল্পকে আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছেও পৌঁছে দিচ্ছে।
নেটফ্লিক্সের মতো প্ল্যাটফর্মের কাছে এটাই ভারতের বড় আকর্ষণ। কোনও গল্পকে আন্তর্জাতিক করে তুলতে সব সময় তাকে পশ্চিমি বা সর্বজনীন ছাঁচে ঢালার প্রয়োজন নেই। বরং স্থানীয় জীবন, ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি গল্প যত বেশি সৎ থাকে, তার স্বাতন্ত্র্য তত বেশি তৈরি হয়।
একটি ছোট শহরের সম্পর্কের গল্প, কোনও নির্দিষ্ট অঞ্চলের সামাজিক দ্বন্দ্ব কিংবা একটি বিশেষ সংস্কৃতির জীবনযাত্রা—ভারতীয় দর্শকের কাছে যতটা পরিচিত, বিদেশি দর্শকের কাছে ততটাই নতুন।
স্থানীয় গল্পের সেই স্বাতন্ত্র্যই তাকে সীমান্ত পেরিয়ে নিয়ে যেতে পারে।
দর্শকের অভ্যাসও বদলেছে
ভারতে ডিজিটাল স্ট্রিমিংয়ের বিস্তারের পিছনে শুধু কনটেন্ট নয়, প্রযুক্তিগত পরিবর্তনও বড় ভূমিকা নিয়েছে।
সস্তা মোবাইল ডেটা, স্মার্টফোনের ব্যাপক ব্যবহার এবং ডিজিটাল পেমেন্টের প্রসার দর্শকের হাতে বিনোদনের নতুন দরজা খুলেছে। এখন দর্শক শুধু নিজের ভাষার অনুষ্ঠানেই আটকে নেই।
হিন্দি দর্শক বাংলা সিরিজ দেখতে পারেন, বাঙালি তেলুগু ছবি দেখতে পারেন, আবার ভারতের বাইরের দর্শকও সাবটাইটেলের মাধ্যমে ভারতীয় ভাষার গল্পে ঢুকে পড়তে পারেন।
ফলে ভারতের বিনোদন বাজার ধীরে ধীরে একটি বড়, আন্তঃভাষিক দর্শকসমাজে পরিণত হচ্ছে।
তবে লড়াইটা সহজ নয়
ভারতের বাজারে এই সম্ভাবনা যত বড়, প্রতিযোগিতাও ততটাই তীব্র।
দেশীয় ও আন্তর্জাতিক একাধিক স্ট্রিমিং পরিষেবা একই দর্শকের জন্য প্রতিযোগিতা করছে। তার সঙ্গে রয়েছে টেলিভিশন, সিনেমা হল এবং বিনামূল্যের ভিডিও প্ল্যাটফর্ম।
তাই শুধুমাত্র আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের পরিচিতি দিয়ে ভারতে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য পাওয়া সম্ভব নয়। স্থানীয় ভাষায় নিয়মিত ভাল কনটেন্ট, আকর্ষণীয় গল্প, প্রতিযোগিতামূলক দাম এবং ভারতীয় দর্শকের বদলে যাওয়া রুচির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা—সবই গুরুত্বপূর্ণ।
পর্দা বদলাচ্ছে, দর্শক নয়
নেটফ্লিক্সের ‘আন্ডার-স্ক্রিনড’ মন্তব্য তাই শুধুই সিনেমা হলের সংখ্যা নিয়ে একটি পর্যবেক্ষণ নয়। এর মধ্যে ভারতের বিনোদন শিল্পের ভবিষ্যতের একটি বড় ছবি লুকিয়ে আছে।
ভারতের প্রতিটি দর্শকের বাড়ির কাছে হয়তো মাল্টিপ্লেক্স নেই। কিন্তু সেই দর্শকের হাতেই রয়েছে স্মার্টফোন। সিনেমা হলের পর্দা যেখানে সীমিত, সেখানে ডিজিটাল পর্দার সংখ্যা কার্যত সীমাহীন।
আর সেই পর্দার সামনে বসে আছেন কোটি কোটি সম্ভাব্য দর্শক।
ভারতের গল্প বলার ঐতিহ্য যদি সত্যিই এত সমৃদ্ধ হয়, তা হলে পরবর্তী বড় প্রশ্ন আর ‘কী গল্প বলব?’ নয়।
প্রশ্নটা হল—কত দূর পর্যন্ত সেই গল্প পৌঁছে দিতে পারব?
নেটফ্লিক্সের চোখে, সেই উত্তরের একটা বড় অংশ হয়তো ইতিমধ্যেই দর্শকের পকেটে থাকা ছোট্ট পর্দাটির মধ্যে লুকিয়ে আছে।