বাংলাস্ফিয়ার: ১৯৫৭ সালে বারাণসীর রাজঘাট প্রত্নস্থলে খননের সময় উদ্ধার হওয়া একটি মানব কঙ্কাল নতুন করে ইতিহাসবিদ ও বিজ্ঞানীদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। প্রায় সাত দশক ধরে সংরক্ষিত এই কঙ্কাল আধুনিক জিনগত (প্রাচীন ডিএনএ) বিশ্লেষণের মাধ্যমে পরীক্ষা করা হলে এক হাজার বছর আগে কাশী অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের পরিচয়, বংশপরিচয়, খাদ্যাভ্যাস, রোগব্যাধি এবং অভিবাসনের ইতিহাস সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলতে পারে বলে আশা করছেন গবেষকেরা।
প্রত্নতত্ত্ববিদদের মতে, বারাণসী বিশ্বের প্রাচীনতম ধারাবাহিকভাবে বসবাসযোগ্য নগরীগুলির অন্যতম। কিন্তু শহরটির মধ্যযুগীয় বাসিন্দারা কারা ছিলেন, তারা কোথা থেকে এসেছিলেন এবং কীভাবে তাঁদের সমাজ গড়ে উঠেছিল, সে সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক তথ্য এখনও সীমিত। ১৯৫৭ সালে উদ্ধার হওয়া কঙ্কালটি সেই শূন্যস্থান পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
বর্তমানে ভারতে প্রাচীন মানবদেহাবশেষ নিয়ে গবেষণায় অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। প্রাচীন ডিএনএ বিশ্লেষণ, আইসোটোপ পরীক্ষা, অস্থিবিদ্যা, রোগতত্ত্ব এবং পরিবেশগত পুনর্গঠনের মতো পদ্ধতির সাহায্যে হাজার হাজার বছর আগের মানুষের জীবনযাত্রা সম্পর্কে অনেক বেশি নির্ভুল ধারণা পাওয়া সম্ভব হচ্ছে। সম্প্রতি রাখিগড়ির হরপ্পা যুগের কঙ্কালগুলিও একই ধরনের বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য পাঠানো হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বারাণসীর কঙ্কালটির ডিএনএ সংরক্ষিত থাকলে গবেষকেরা জানতে পারবেন ওই ব্যক্তি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সদস্য ছিলেন, নাকি অন্য অঞ্চল থেকে এসে এখানে বসতি গড়েছিলেন। একই সঙ্গে তাঁর সঙ্গে বর্তমান উত্তর ভারতের মানুষের জিনগত সম্পর্কও নির্ণয় করা সম্ভব হতে পারে।
ডিএনএ পরীক্ষার পাশাপাশি দাঁত ও হাড়ের রাসায়নিক বিশ্লেষণ থেকে তাঁর খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কেও তথ্য পাওয়া যেতে পারে। তিনি প্রধানত শস্যভিত্তিক খাদ্য গ্রহণ করতেন, নাকি প্রাণিজ খাদ্যের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন, স্থানীয় জল ব্যবহার করতেন নাকি দূরবর্তী অঞ্চল থেকে এসেছিলেন—এসব প্রশ্নের উত্তরও মিলতে পারে। এমনকি শৈশবে তিনি কোথায় বড় হয়েছেন, সেটিও অনেক ক্ষেত্রে আইসোটোপ বিশ্লেষণ থেকে জানা সম্ভব।
গবেষকদের মতে, কঙ্কালের অস্থি পরীক্ষা করে তাঁর বয়স, লিঙ্গ, শারীরিক গঠন, শ্রমের মাত্রা এবং বিভিন্ন রোগের চিহ্নও শনাক্ত করা যায়। দীর্ঘদিন অপুষ্টি, সংক্রমণ বা কঠোর শারীরিক পরিশ্রমের প্রভাব হাড়ে থেকে যায়। ফলে একটি মাত্র কঙ্কালও একটি সময়ের সমাজ ও জীবনযাত্রার মূল্যবান দলিল হয়ে উঠতে পারে।
ভারতে অতীতে মানব কঙ্কাল নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণা খুব সীমিত ছিল। প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা, সংরক্ষণের সমস্যা এবং বিশেষায়িত গবেষণাগারের অভাব তার অন্যতম কারণ। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলিতে সরকার ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলি এই ক্ষেত্রে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রত্নস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া মানবদেহাবশেষের ডিএনএ বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রাচীন ভারতীয় জনগোষ্ঠীর উৎপত্তি, স্থানান্তর এবং পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে বৃহৎ গবেষণা শুরু হয়েছে।
এই গবেষণায় প্রত্নতত্ত্ববিদ, নৃতত্ত্ববিদ, জিনবিজ্ঞানী, জীবাশ্মবিজ্ঞানী এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা যৌথভাবে কাজ করছেন। উন্নত ডিএনএ প্রযুক্তির সাহায্যে অতীতের মানুষের জিনগত ইতিহাস পুনর্গঠনের চেষ্টা চলছে, যা ভারতের ইতিহাসচর্চায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।
বিশেষজ্ঞরা অবশ্য সতর্ক করে দিচ্ছেন, এত পুরনো কঙ্কাল থেকে সবসময় ব্যবহারযোগ্য ডিএনএ পাওয়া যায় না। গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় জিনগত উপাদান দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। তবু আধুনিক পরীক্ষাগারের প্রযুক্তি আগের তুলনায় অনেক বেশি সংবেদনশীল হওয়ায় সফলতার সম্ভাবনাও বেড়েছে।
যদি বারাণসীর ১৯৫৭ সালে উদ্ধার হওয়া এই কঙ্কাল থেকে কার্যকর ডিএনএ উদ্ধার করা সম্ভব হয়, তবে তা শুধু একজন মানুষের পরিচয় নয়, এক হাজার বছর আগের কাশীর সামাজিক ও জনবৈজ্ঞানিক ইতিহাসেরও নতুন জানালা খুলে দিতে পারে। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, জিনগত তথ্য এবং ঐতিহাসিক গবেষণার সমন্বয়ে তখন আরও স্পষ্টভাবে জানা যাবে—সহস্র বছর আগে এই প্রাচীন নগরীতে কারা বাস করতেন, কীভাবে তাঁদের সমাজ গড়ে উঠেছিল এবং আজকের মানুষের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক কতটা গভীর।