Home International ১২২ বছরের রেকর্ড ভেঙে আগুন দক্ষিণ কোরিয়ায়

১২২ বছরের রেকর্ড ভেঙে আগুন দক্ষিণ কোরিয়ায়

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
20 views 4 minutes read
A+A-
Reset

৪২.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। দক্ষিণ কোরিয়ার ১২২ বছরের আবহাওয়া পর্যবেক্ষণের ইতিহাসে এমন তাপমাত্রা আগে দেখা যায়নি। এবার সেই রেকর্ড ভাঙা গরমের আঁচ পৌঁছে গিয়েছে রাজধানী সিউলেও। পরিস্থিতি সামাল দিতে শহরের জন্য প্রথমবার জারি হয়েছে ‘চরম তাপপ্রবাহ সতর্কতা’

তীব্র গরমে ইতিমধ্যেই প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১৬ জন। তাপজনিত অসুস্থতায় চিকিৎসা নিয়েছেন ২ হাজারেরও বেশি মানুষ। আবহাওয়ার পূর্বাভাস বলছে, আপাতত স্বস্তির সম্ভাবনাও খুব কম।

৪২.৫ ডিগ্রিতে রেকর্ড ভাঙল

দক্ষিণ কোরিয়ার আবহাওয়া দফতরের তথ্য অনুযায়ী, গত রবিবার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ইয়াংসান শহরে তাপমাত্রা পৌঁছয় ৪২.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। ১২২ বছর ধরে আবহাওয়া পর্যবেক্ষণের পর এটিই দেশের সর্বোচ্চ রেকর্ড করা তাপমাত্রা।

এরপর তাপপ্রবাহ পশ্চিম দিকে এগিয়ে রাজধানীর দিকে ছড়িয়ে পড়েছে। মঙ্গলবার সিউলে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছতে পারে বলে পূর্বাভাস ছিল। পরবর্তী তিন দিনও তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রির আশপাশে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

দেশের একাধিক শহরে ইতিমধ্যেই পারদ ৪১ ডিগ্রি ছাড়িয়েছে। সোমবার গোরিয়ং এলাকায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৪১.২ ডিগ্রি। সিউলের গুরো জেলাতেও ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড হয়েছে।

১৬ মৃত্যু, হাসপাতালে হাজার হাজার

দক্ষিণ কোরিয়ার রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, মে মাস থেকে তাপপ্রবাহ-সম্পর্কিত কারণে অন্তত ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে ২ হাজারেরও বেশি মানুষ হিট স্ট্রোকসহ বিভিন্ন তাপজনিত সমস্যায় চিকিৎসা নিয়েছেন।

ঝুঁকিতে সবচেয়ে বেশি প্রবীণ, প্রতিবন্ধী এবং দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতায় ভোগা মানুষ। তাঁদের কথা মাথায় রেখে সিউল প্রশাসন প্রায় ৬৩ হাজার ঝুঁকিপূর্ণ বাসিন্দার বাড়িতে গিয়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষা শুরু করেছে।

নার্সরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাঁদের শারীরিক পরিস্থিতির খোঁজ নিচ্ছেন। পাশাপাশি শহরের বিভিন্ন জায়গায় তৈরি করা হয়েছে ঠান্ডা থাকার বিশেষ কেন্দ্র।

সিউলে প্রথম ‘চরম’ সতর্কতা

সোমবার জরুরি বৈঠকের পর সিউল প্রশাসন একাধিক বিশেষ ব্যবস্থা চালু করেছে। চলতি বছর চালু হওয়া নতুন সতর্কতা ব্যবস্থার আওতায় এই প্রথম রাজধানীর জন্য ‘চরম তাপপ্রবাহ সতর্কতা’ জারি করা হল।

রাস্তায় তাপমাত্রা কমানোর জন্য নামানো হয়েছে প্রায় ২০০টি জলবাহী ট্রাক। প্রতিটি ট্রাক দিনে সর্বোচ্চ ছয়বার করে প্রায় ২ হাজার কিলোমিটার রাস্তার উপর পানি ছিটাচ্ছে। যে এলাকাগুলিতে তাপমাত্রা বেশি, সেগুলিকে দেওয়া হচ্ছে অগ্রাধিকার।

পথচারীরাও রোদের তীব্রতা এড়াতে ছায়া ধরে হাঁটছেন। শহরের বিভিন্ন জায়গায় তৈরি করা কুয়াশা-জল ছিটানো শীতলীকরণ কেন্দ্রেও ভিড় বাড়ছে।

উত্তর গিয়ংসাং প্রদেশে আবার লাউডস্পিকার ও তাপ-সংবেদনশীল ক্যামেরা লাগানো ড্রোন উড়িয়ে জনবহুল এলাকায় সতর্কবার্তা প্রচার করা হচ্ছে।

‘সাউনারের মতো’ কর্মক্ষেত্র

তাপপ্রবাহের সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসে পড়েছে খোলা আকাশের নিচে কাজ করা শ্রমিকদের উপর।

সিউলের এক নির্মাণশ্রমিকের কথায়, প্রতি ঘণ্টায় ১০ মিনিট বিরতি মিললেও সেখানে পাখার ব্যবস্থা নেই। ফলে ছায়ায় বসে থাকা ছাড়া উপায় থাকে না। অতিরিক্ত ঘামে পোশাক শরীরের সঙ্গে ঘষা লেগে ত্বকে ক্ষত তৈরি হচ্ছে।

এক সুপারমার্কেটের পার্কিং এলাকায় ট্রলি সংগ্রহের কাজ করা ৫৫ বছরের এক শ্রমিকের অভিজ্ঞতা আরও ভয়াবহ। তাঁর কথায়, বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা না থাকায় কাজের জায়গাটা যেন “সাউনারের ভিতর”।

তাপপ্রবাহের মধ্যে খাবার সরবরাহকারী কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়েও বাড়ছে উদ্বেগ।

‘চরম আবহাওয়া এখন আর ব্যতিক্রম নয়’

মঙ্গলবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে রাষ্ট্রপতি লি জে মিয়ং প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মানুষের দৈনন্দিন জীবন রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার উপর বাড়তি চাপ সামলানোর প্রস্তুতি নিতেও বলেছেন।

রাষ্ট্রপতির বক্তব্য, “চরম আবহাওয়া এখন আর ব্যতিক্রম নয়, বরং স্বাভাবিক বাস্তবতায় পরিণত হচ্ছে।”

তাঁর মতে, পরিস্থিতির মোকাবিলায় দেশের জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার প্রয়োজন।

কেন এমন ভয়াবহ গরম?

দক্ষিণ কোরিয়ার আবহাওয়া প্রশাসনের মতে, কোরীয় উপদ্বীপের উপর শক্তিশালী উচ্চচাপ বলয়, পরিষ্কার আকাশে তীব্র সূর্যালোক এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ‘ফ্যোন’ প্রভাব—এই তিনটি কারণ তাপপ্রবাহকে আরও তীব্র করেছে।

‘ফ্যোন’ হল এমন এক ধরনের উষ্ণ ও শুষ্ক বাতাস, যা পাহাড় অতিক্রম করার সময় আরও গরম ও শুষ্ক হয়ে ওঠে। দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে এই প্রভাবই তাপমাত্রাকে অস্বাভাবিক মাত্রায় ঠেলে দিয়েছে বলে মনে করছেন আবহাওয়াবিদরা।

তবে নজর রয়েছে ‘ডলফিন’ নামের একটি ঘূর্ণিঝড়ের দিকেও।

ঘূর্ণিঝড় আনবে স্বস্তি, না আরও অস্বস্তি?

আবহাওয়াবিদদের মতে, ঘূর্ণিঝড়টি পূর্ব চীনের দিকে এগোলে দক্ষিণ কোরিয়ায় আর্দ্রতা বেড়ে যেতে পারে। তাতে তাপমাত্রা সামান্য কমলেও গরম আরও অস্বস্তিকর হয়ে উঠতে পারে।

অন্যদিকে, ঘূর্ণিঝড়টি কোরীয় উপদ্বীপের দক্ষিণ দিক দিয়ে এগোলে প্রবল বাতাস, মেঘ ও বৃষ্টির কারণে তাপপ্রবাহ সাময়িকভাবে কিছুটা দুর্বল হতে পারে।

বর্তমানে ডলফিন জাপানের ওকিনাওয়ার দিকে পশ্চিমমুখী এবং ধীরে ধীরে দুর্বল হচ্ছে। স্থলভাগে পৌঁছনোর সময় এটি প্রথম বা দ্বিতীয় শ্রেণির ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হতে পারে বলে পূর্বাভাস রয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের আরও এক সতর্কবার্তা

একটি রেকর্ড ভাঙা গরমের ঘটনা হয়তো একা কোনও সিদ্ধান্তের প্রমাণ নয়। কিন্তু জলবায়ু বিজ্ঞানীদের সতর্কতা স্পষ্ট—মানুষের কর্মকাণ্ডে সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিশ্বজুড়ে তাপপ্রবাহের মতো চরম আবহাওয়ার ঘটনা আরও ঘন ঘন এবং আরও তীব্র হয়ে উঠছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার ৪২.৫ ডিগ্রির রেকর্ড তাই শুধু একটি সংখ্যার গল্প নয়। এটি ক্রমশ বদলে যাওয়া আবহাওয়ার আরেকটি কঠিন সংকেত।

আর সিউলের রাস্তায় ছায়া খুঁজে বেড়ানো মানুষ, ঘণ্টার পর ঘণ্টা গরমে কাজ করা শ্রমিক কিংবা বাড়িতে গিয়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা নার্সদের ব্যস্ততা যেন সেই সংকেতেরই সবচেয়ে বাস্তব ছবি।

বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles