Home খবর নিঃসঙ্গ পৃথিবী, অন্তহীন স্ক্রল

নিঃসঙ্গ পৃথিবী, অন্তহীন স্ক্রল

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
27 views 4 minutes read
A+A-
Reset

নিঃসঙ্গ পৃথিবী, অন্তহীন স্ক্রল

পৃথিবীজুড়ে নিঃসঙ্গতা নিয়ে এখন এত বেশি আলোচনা হচ্ছে যে অনেকেই একে ‘মহামারি’ বলে অভিহিত করছেন। শুনতে হয়তো অতিরঞ্জিত মনে হতে পারে, কিন্তু চারপাশে তাকালে শব্দটির যথার্থতা নিয়ে সন্দেহ থাকে না।

ফুটপাতে বসে থাকা সেই মানুষটির চোখে যেমন নিঃসঙ্গতা দেখা যায়—যিনি পথচারীদের দিকে তাকিয়ে হয়তো একটু চোখের যোগাযোগ, সামান্য সহানুভূতি খুঁজছেন—তেমনই সেই পথচারীর মুখেও তার ছাপ রয়েছে, যিনি তাঁকে পাশ কাটিয়ে দ্রুত চলে যাচ্ছেন। কানে ইয়ারফোন, চোখ মোবাইলের পর্দায়। চারপাশের পৃথিবী যেন ক্রমশ তাঁর নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।

বাসে পাশাপাশি বসে থাকা মানুষগুলির দিকে তাকালেও একই ছবি। প্রত্যেকেই নিজের ফোনে ডুবে। গাড়ির ভিতরেও প্রত্যেকে যেন নিজের ছোট্ট ডিজিটাল বুদবুদের মধ্যে বন্দি। চারপাশে মানুষ আছে, কিন্তু সংযোগ কোথায়?

সবচেয়ে একা কারা?

নিঃসঙ্গতা নিয়ে বিশ্বজুড়ে হওয়া গবেষণাগুলির একটি অস্বস্তিকর দিক রয়েছে—তরুণদের মধ্যেই এর প্রবণতা ক্রমশ বেশি দেখা যাচ্ছে। অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশের গবেষণায় উঠে এসেছে, তরুণদের একাকীত্ব শুধু মানসিক স্বাস্থ্যের উপর নয়, শারীরিক স্বাস্থ্যের উপরও গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে।

বিষয়টি বিস্ময়কর। কারণ এতদিন একাকীত্বকে আমরা মূলত বয়স্ক মানুষের সমস্যা বলেই ভেবে এসেছি।

কিন্তু ডিজিটাল যুগের বাস্তবতা যেন উল্টো ছবি দেখাচ্ছে। হাজার হাজার ‘ফ্রেন্ড’, শত শত ‘ফলোয়ার’, অসংখ্য অনলাইন গ্রুপ—তারপরও বহু তরুণ নিজেদের গভীরভাবে একা বলে মনে করছেন।

এখানেই তৈরি হচ্ছে আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য।

যে মাধ্যম মানুষকে কাছাকাছি আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সেটিই কি শেষ পর্যন্ত আমাদের আরও দূরে সরিয়ে দিচ্ছে?

জানি ক্ষতি হচ্ছে, তবু স্ক্রল থামে না

সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটানো যে খুব একটা ভালো অভ্যাস নয়, তা আমরা প্রায় সবাই জানি। অতিরিক্ত স্ক্রলিং সময় নষ্ট করে, মনোযোগের ক্ষমতা কমাতে পারে এবং কিছু মানুষের ক্ষেত্রে উদ্বেগ ও বিষণ্ণতার অনুভূতিও বাড়াতে পারে।

তারপরও আমরা থামি না।

একটি ভিডিও শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আর একটি। একটি পোস্টের পর আর একটি। নোটিফিকেশন এলেই ফোন হাতে নেওয়া। কখনও কোনও নির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই শুধু স্ক্রল করে যাওয়া।

কারণ, এই প্ল্যাটফর্মগুলির নকশাই এমন যে ব্যবহারকারী যত বেশি সময় সেখানে কাটান, তত বেশি মূল্য তৈরি হয়। নতুন পোস্ট, ভিডিও, ‘লাইক’ বা নোটিফিকেশন আমাদের মস্তিষ্কে সাময়িক উত্তেজনা বা আনন্দের অনুভূতি তৈরি করে। সেই অনুভূতিই আবার পরের কনটেন্টটির দিকে হাত বাড়াতে উৎসাহ দেয়।

ফলে স্ক্রলিং অনেক সময় আর সচেতন সিদ্ধান্ত থাকে না। হয়ে ওঠে প্রায় স্বয়ংক্রিয় একটি আচরণ।

সংযোগ বাড়ল, নাকি একাকীত্ব?

সমস্যাটি শুধু আমরা কতটা সময় ফোনে কাটাচ্ছি, তা নয়। আরও বড় প্রশ্ন—ফোনে কাটানো সেই সময়টি আমরা কীসের বদলে দিচ্ছি?

বন্ধুর সঙ্গে দেখা করার বদলে মেসেজ। পরিবারের সঙ্গে বসে গল্প করার বদলে একই ঘরে থেকেও আলাদা আলাদা স্ক্রিন। কোনও অনুষ্ঠানে গিয়ে চারপাশের মানুষকে দেখার বদলে ক্যামেরার মাধ্যমে মুহূর্তটি ধরে রাখা।

অর্থাৎ, সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের যোগাযোগের সুযোগ বাড়িয়েছে ঠিকই, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে সেই যোগাযোগ বাস্তব সম্পর্কের জায়গাও দখল করে নিয়েছে।

তার সঙ্গে যোগ হয়েছে তুলনার ফাঁদ।

সোশ্যাল মিডিয়ায় আমরা সাধারণত অন্যের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর, সফল এবং আনন্দের মুহূর্তগুলিই দেখি। কারও নতুন চাকরি, কারও বিদেশ ভ্রমণ, কারও প্রেম, কারও বিয়ে, কারও নিখুঁত শরীর, কারও সাজানো বাড়ি।

তার পাশে নিজের ক্লান্ত, অসম্পূর্ণ, বাস্তব জীবনটাকে রাখলে মনে হতেই পারে—সবাই এগিয়ে যাচ্ছে, শুধু আমি পিছিয়ে।

এই তুলনা আত্মবিশ্বাসে আঘাত করতে পারে। আর আত্মবিশ্বাস কমলে নিঃসঙ্গতার অনুভূতিও আরও গভীর হতে পারে।

সবচেয়ে অদ্ভুত আসক্তি

এই গল্পের সবচেয়ে অস্বস্তিকর জায়গাটা সম্ভবত এখানেই—আমরা অনেকেই জানি, অভ্যাসটি আমাদের ভালো লাগছে না।

জানি, আরও আধ ঘণ্টা স্ক্রল করলে বিশেষ কিছু বদলাবে না। জানি, ঘুমানোর আগে ফোনটা নামিয়ে রাখা উচিত। জানি, বন্ধুর সঙ্গে দেখা করা কিংবা একটু হাঁটতে বেরোনো হয়তো অনেক বেশি ভালো লাগবে।

তবু ফোনটা হাতে নিই।

আর আঙুল নিজের অজান্তেই স্ক্রিনের উপর দিয়ে নীচে নামে।

একটি পোস্ট। তারপর আর একটি। তারপর আর একটি।

কখনও কখনও মনে হয়, আমরা কনটেন্ট দেখছি না; কনটেন্টই যেন আমাদের ধরে রেখেছে।

ফিরে যেতে হবে বাস্তবের কাছে

নিঃসঙ্গতার এই সংকটের সমাধান হয়তো প্রযুক্তিকে পুরোপুরি ছুড়ে ফেলে দেওয়া নয়। সোশ্যাল মিডিয়া নিজে খারাপ নয়। দূরে থাকা মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ, তথ্যের আদানপ্রদান, নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচয় কিংবা নিজের মত প্রকাশ—সব ক্ষেত্রেই এর প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

কিন্তু সমস্যা তখনই শুরু হয়, যখন অনলাইন সংযোগ বাস্তব সম্পর্কের বিকল্প হয়ে দাঁড়ায়।

নিঃসঙ্গতা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য তাই হয়তো আমাদের খুব আধুনিক কোনও সমাধান দরকার নেই। দরকার পুরনো কিছু অভ্যাস—একসঙ্গে বসে কথা বলা, বন্ধুর সঙ্গে দেখা করা, পরিবারের সঙ্গে ফোন ছাড়া কিছুটা সময় কাটানো, অপরিচিত মানুষের দিকে তাকিয়ে হাসা, কিংবা কোনও মানুষের কথা মন দিয়ে শোনা।

কারণ হাজার ‘ফলোয়ার’ থাকলেও একজন মানুষের প্রয়োজন হতে পারে একজন সত্যিকারের শ্রোতার।

সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের সংযুক্ত রাখতে পারে। কিন্তু মানুষের প্রকৃত সঙ্গের জায়গা কোনও অ্যালগরিদম এখনও নিতে পারেনি।

হয়তো তাই নিঃসঙ্গতার এই যুগে সবচেয়ে বড় বিপ্লব হবে নতুন কোনও অ্যাপ নয়—ফোনটা নামিয়ে পাশের মানুষটির সঙ্গে কথা বলা।

বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles