Table of Contents
দিল্লি থেকে শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল সাংবাদিক বৈঠক নিয়ে উদ্বেগ ঢাকার, ভারতকে ‘সক্রিয় নজরদারি’র আশ্বাস
দিল্লি থেকে শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল সাংবাদিক বৈঠক ঘিরে ফের টানাপোড়েনের ইঙ্গিত ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী নয়, বর্তমান বিএনপি সরকারের মতে, ভারতীয় ভূখণ্ড ব্যবহার করে শেখ হাসিনা কিংবা নিষিদ্ধ কোনও সংগঠনের সদস্যদের রাজনৈতিক বক্তব্য দুই দেশের সম্পর্কের সাম্প্রতিক ইতিবাচক গতিকে ব্যাহত করতে পারে।
সোমবার ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে বৈঠকে এই উদ্বেগের কথা জানান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বৈঠকে হুমায়ুন কবির স্পষ্ট করে জানান, ঢাকা আশা করে ভারত এমন সহযোগিতা করবে যাতে শেখ হাসিনা বা নিষিদ্ধ ঘোষিত কোনও সংগঠনের সদস্যরা ভারতীয় ভূখণ্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট করার মতো রাজনৈতিক বক্তব্য বা কার্যকলাপ চালাতে না পারেন।
ঢাকার আশঙ্কা, এমন কর্মকাণ্ড দুই দেশের সম্পর্কের ইতিবাচক অগ্রগতিকে ধাক্কা দিতে পারে।
ভারতের আশ্বাস
ঢাকার উদ্বেগের জবাবে ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন বলে জানিয়েছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
বিবৃতি অনুযায়ী, তিনি জানিয়েছেন, বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচনা করা হবে, প্রয়োজনীয় অনুসন্ধান করা হবে এবং পরিস্থিতির দিকে সক্রিয় নজর রাখা হবে।
ভারতের হাইকমিশনও সামাজিক মাধ্যমে জানিয়েছে, বৈঠকে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সঙ্গে ইতিবাচকভাবে কাজ করার ভারতের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। দুই দেশের মানুষের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির আকাঙ্ক্ষা পূরণে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
অর্থাৎ, একদিকে শেখ হাসিনাকে ঘিরে ঢাকার উদ্বেগ, অন্যদিকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দিল্লির বার্তা—দুই সুরই একই বৈঠকে শোনা গেল।
নজর এখন ৫ অগস্টে
এর মধ্যেই নজর পড়েছে আগামী ৫ অগস্টের দিকে।
সেদিন সন্ধ্যায় নয়াদিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবে ভার্চুয়াল সাংবাদিক বৈঠকে অংশ নেওয়ার কথা শেখ হাসিনার। ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এটিই সংবাদমাধ্যমের সামনে তাঁর প্রথম বড় আকারের ভার্চুয়াল উপস্থিতি হতে চলেছে।
আয়োজকদের দাবি, অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ফেরার পরিকল্পনা ঘোষণা করতে পারেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিও তুলে ধরবেন বলে জানা যাচ্ছে।
ফলে অনুষ্ঠানটি শুধু একটি সাংবাদিক বৈঠক হিসেবে নয়, বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি মুহূর্ত হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
দেশে ফিরলেই গ্রেপ্তার?
২০২৪ সালের আগস্টে সরকার পতনের পর থেকে ভারতে অবস্থান করছেন ৭৮ বছর বয়সি শেখ হাসিনা। সাম্প্রতিক কয়েকটি সাক্ষাৎকারে তিনি ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন।
তবে বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাঁদের বক্তব্য, দেশে ফিরলেই শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করা হবে।
ছাত্র আন্দোলন দমনে প্রাণঘাতী অভিযানের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায়ও ঘোষণা করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনার ‘ফেরার পরিকল্পনা’ নিয়ে প্রকাশ্যে বক্তব্য দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের জন্যও নতুন পরীক্ষা তৈরি করতে পারে।
প্রত্যর্পণেও অনিশ্চয়তা
শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর জন্য বিএনপি সরকার ভারতের কাছে প্রত্যর্পণের আবেদন করেছে। দিল্লির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিষয়টি আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী বিবেচনাধীন।
অর্থাৎ, প্রত্যর্পণের প্রশ্নটি এখনও নিষ্পত্তি হয়নি। তার মধ্যেই দিল্লি থেকে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বক্তব্য সামনে আসার সম্ভাবনা ঢাকার উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
সম্পর্ক মেরামতের চেষ্টা
তবে একই বৈঠকে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে ইতিবাচক বার্তাও এসেছে।
দুই পক্ষ পারস্পরিক স্বার্থ ও লাভের ভিত্তিতে জনগণকেন্দ্রিক সহযোগিতা আরও বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা করেছে। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আস্থা এবং অভিন্ন স্বার্থের ভিত্তিতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করার আশাবাদও প্রকাশ করা হয়েছে।
নিয়মিত সংলাপ এবং গঠনমূলক যোগাযোগ বজায় রাখার ওপর জোর দিয়েছে দুই দেশই। আলোচনার মাধ্যমেই দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সমস্যার সমাধান সম্ভব—এই অবস্থানও উঠে এসেছে বৈঠকে।
সামনে বড় পরীক্ষা
একদিকে শেখ হাসিনার দিল্লি থেকে সম্ভাব্য রাজনৈতিক বার্তা, অন্যদিকে তাঁকে ঘিরে ঢাকার কড়া আপত্তি—সব মিলিয়ে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক আবারও সংবেদনশীল এক পর্যায়ে।
ঢাকা চাইছে, ভারতের মাটি থেকে এমন কোনও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড না হোক যা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতায় প্রভাব ফেলতে পারে। দিল্লি আবার একই সঙ্গে সম্পর্ককে স্বাভাবিক পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বার্তা দিচ্ছে।
তাই এখন বড় প্রশ্ন—৫ অগস্টের শেখ হাসিনার সাংবাদিক বৈঠক কি শুধু বাংলাদেশের রাজনীতিতেই নতুন বার্তা দেবে, নাকি দিল্লি-ঢাকার সম্পর্কের সমীকরণেও নতুন চাপ তৈরি করবে?