বাংলাস্ফিয়ার: আন্দোলনকারী ছাত্র-যুবদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে কেন্দ্র ও রাজ্যগুলির উপর চাপ আরও বাড়াল ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। সংগঠনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, আন্দোলনে অংশ নেওয়া ছাত্রছাত্রী ও সমর্থকদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া ফৌজদারি মামলা প্রত্যাহার না হলে তারা ফের দেশজুড়ে আন্দোলনের পথে নামবে। ইতিমধ্যেই অসম ও বিহার সরকার আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ‘কোনও জবরদস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে না’ বলে জানিয়েছে। এবার একই ধরনের অবস্থান নিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ ও মহারাষ্ট্র সরকারও।

ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ এবং পরীক্ষা-সংক্রান্ত সংস্কারের আশ্বাসকে আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে তুলে ধরলেও সিজেপি নেতৃত্বের বক্তব্য, আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত বহু মানুষ এখনও বিভিন্ন মামলায় অভিযুক্ত। তাদের বিরুদ্ধে পুলিশি তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া চলতে থাকলে সরকারের সঙ্গে হওয়া সমঝোতার কোনও অর্থই থাকবে না।

সিজেপির এক মুখপাত্র বলেন, “সরকার আলোচনার সময় যে পরিবেশ তৈরির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তার সঙ্গে মামলা বহাল রাখার সিদ্ধান্ত সাংঘর্ষিক। আন্দোলনে অংশ নেওয়া ছাত্রছাত্রীদের অপরাধী হিসেবে দেখানো চলবে না। দ্রুত মামলা প্রত্যাহার করতে হবে।”

বিহার সরকার ইতিমধ্যেই জানিয়েছে, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে অংশ নেওয়া এবং যাদের বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের অভিযোগ নেই, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে না। রাজ্য পুলিশের তরফেও তদন্তে সংযম দেখানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আন্দোলনের সময় গ্রেপ্তার হওয়া একাধিক ব্যক্তির মুক্তির প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।

অসম সরকারও অনুরূপ অবস্থান নিয়ে জানিয়েছে, শুধুমাত্র আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে কাউকে হয়রানি করা হবে না। আইনশৃঙ্খলা ভাঙা বা সহিংসতার নির্দিষ্ট অভিযোগ না থাকলে জোরপূর্বক ব্যবস্থা এড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গ সরকারও জানিয়েছে, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে অযথা কড়া ব্যবস্থা নেওয়ার প্রশ্ন নেই। তবে যেসব ঘটনায় ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ বা পুলিশের উপর হামলার অভিযোগ রয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী তদন্ত চলবে। কলকাতায় নীট-সংক্রান্ত বিক্ষোভের পর যাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, তাঁদের মধ্যে কয়েকজন ইতিমধ্যেই জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। অন্যদের ক্ষেত্রেও আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী আইনি প্রক্রিয়া এগোচ্ছে।

মহারাষ্ট্র সরকারও একই সুরে জানিয়েছে, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ গণতান্ত্রিক অধিকার। শুধুমাত্র প্রতিবাদে অংশ নেওয়ার জন্য কাউকে লক্ষ্য করা হবে না। তবে সহিংসতার অভিযোগ থাকলে পৃথকভাবে তদন্ত হবে।

এই অবস্থানকে ইতিবাচক বলে স্বাগত জানালেও সিজেপির দাবি, শুধু ‘কোনও জোরপূর্বক ব্যবস্থা নয়’ বললেই হবে না। ইতিমধ্যে যে এফআইআর দায়ের হয়েছে, সেগুলিও প্রত্যাহার করতে হবে। সংগঠনের মতে, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে মামলা ঝুলে থাকলে ভবিষ্যতে চাকরি, উচ্চশিক্ষা এবং বিদেশে পড়াশোনার ক্ষেত্রে গুরুতর সমস্যা তৈরি হতে পারে।

আন্দোলনের সময় বিভিন্ন রাজ্যে শতাধিক ছাত্রছাত্রী, যুবক এবং কর্মীকে আটক বা গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। দিল্লি, পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, অসম, মহারাষ্ট্র-সহ একাধিক রাজ্যে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। বিরোধী দলগুলি অভিযোগ তোলে, অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করে আন্দোলন দমন করার চেষ্টা হয়েছে। অন্যদিকে প্রশাসনের দাবি ছিল, বহু জায়গায় আন্দোলনের আড়ালে সহিংসতা, সরকারি সম্পত্তি নষ্ট এবং পুলিশকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছিল।

সাম্প্রতিক আলোচনার পর আন্দোলনের প্রথম দফা কর্মসূচি স্থগিত রাখা হলেও সিজেপি জানিয়েছে, তারা পরিস্থিতির উপর নজর রাখছে। সরকারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত না হলে নতুন করে দেশব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। সংগঠনের নেতাদের বক্তব্য, আন্দোলনের মূল লক্ষ্য শুধু একজন মন্ত্রীর পদত্যাগ ছিল না; পরীক্ষা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এবং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলা প্রত্যাহার—এই তিনটি দাবিই সমান গুরুত্বপূর্ণ।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, কেন্দ্র ও বিভিন্ন রাজ্য সরকার এখন একদিকে আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন, অন্যদিকে ছাত্রসমাজের ক্ষোভ—দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে। তাই বেশ কয়েকটি রাজ্য ‘কোনও জবরদস্তিমূলক ব্যবস্থা নয়’ নীতি গ্রহণ করলেও, সহিংসতার অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলাগুলি আপাতত প্রত্যাহার করতে চাইছে না।

ফলে আপাতত সংঘাত কিছুটা প্রশমিত হলেও বিতর্কের ইতি পড়েনি। আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলার ভবিষ্যৎই এখন নির্ধারণ করবে, সরকার ও সিজেপির মধ্যে তৈরি হওয়া অস্থায়ী সমঝোতা দীর্ঘস্থায়ী হবে, নাকি দেশ আবারও নতুন ছাত্র আন্দোলনের সাক্ষী হবে।