বাংলাস্ফিয়ার: দেশজুড়ে দীর্ঘ আন্দোলন, রাজনৈতিক চাপ এবং শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ—এই নাটকীয় পর্বের পর আপাতত থেমেছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)-র নেতৃত্বে চলা ছাত্র বিক্ষোভ। কিন্তু আন্দোলনের অবসান মানেই সমস্যার সমাধান নয়। ভারতের পরীক্ষা ব্যবস্থাকে দীর্ঘদিন ধরে গ্রাস করে থাকা প্রশ্নফাঁসের মহামারী এখনও কার্যত অমীমাংসিত। কড়া আইন, কঠোর শাস্তির বিধান এবং বারবার সংস্কারের ঘোষণার পরও প্রশ্নফাঁস রোধ করা যায়নি। ফলে সরকারের পরীক্ষা-সংস্কারের দাবি এখন বাস্তবতার কঠিন পরীক্ষার মুখে।

হিন্দুস্তান টাইমসের বিভিন্ন রাজ্যে সংগৃহীত তথ্য বলছে, গত এক দশকে দেশে অন্তত ১৫০টিরও বেশি প্রশ্নফাঁসের ঘটনা ঘটেছে। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৭০ লক্ষেরও বেশি পরীক্ষার্থী। স্কুল, কলেজ, সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষা থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষায় ভর্তির পরীক্ষা—প্রায় সব ক্ষেত্রেই এই দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়েছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, প্রশ্নফাঁস রুখতে একের পর এক রাজ্য কঠোর আইন করলেও তার কার্যকারিতা নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে। উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান, বিহার, মধ্যপ্রদেশ, হরিয়ানা, গুজরাত-সহ হিন্দি বলয়ের অধিকাংশ রাজ্য ২০২১ সালের পর বিশেষ আইন প্রণয়ন করেছে। কোথাও ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, কোথাও ₹১০ কোটি পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। কেন্দ্রও সম্প্রতি একই ধরনের কঠোর আইন কার্যকর করেছে। কিন্তু বাস্তবে প্রশ্নফাঁসের ঘটনা বন্ধ হয়নি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যার মূল কারণ আইন নয়, আইনের প্রয়োগ। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তদন্ত বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল হতে দেরি হয়, বিচার শুরু হয় আরও পরে। বহু মামলায় এখনও পর্যন্ত কোনও চূড়ান্ত সাজা হয়নি। ফলে অপরাধীদের মনে ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয় না। বরং পরীক্ষা মাফিয়ারা জানে, গ্রেফতার হলেও দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার সুযোগ নিয়ে তারা সহজেই বেরিয়ে আসতে পারে।

প্রশ্নফাঁস এখন আর বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এটি একটি সংগঠিত অর্থনৈতিক চক্রে পরিণত হয়েছে। প্রযুক্তির অপব্যবহার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, এনক্রিপ্টেড মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম এবং পরীক্ষা পরিচালনার অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা—সব মিলিয়ে এই চক্র আরও শক্তিশালী হয়েছে। বহু ক্ষেত্রে তদন্তে দেখা গেছে, পরীক্ষা পরিচালনাকারী সংস্থা, মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান, পরিবহণ ব্যবস্থা এবং স্থানীয় দালালচক্রের মধ্যে যোগসাজশ রয়েছে।

দক্ষিণ ভারতের তুলনায় উত্তর ও মধ্য ভারতের রাজ্যগুলিতে প্রশ্নফাঁসের ঘটনা অনেক বেশি। এর একটি কারণ হিসেবে প্রশাসনিক দুর্বলতা, বিপুল সংখ্যক পরীক্ষার্থী এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত অপরাধচক্রকে দায়ী করছেন বিশ্লেষকরা। অন্যদিকে কেরল, তামিলনাড়ু বা কর্নাটকের মতো রাজ্যে তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী ডিজিটাল নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক নজরদারির কারণে এমন ঘটনা কম।

সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনের জেরে কেন্দ্র পরীক্ষা ব্যবস্থার আমূল সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন, প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা, প্রশ্নপত্র পরিবহণে নতুন প্রোটোকল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার এবং দায়বদ্ধতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু প্রযুক্তি দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। দ্রুত তদন্ত, নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে বিচার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না হলে কোনও সংস্কারই দীর্ঘস্থায়ী হবে না।

ছাত্রদের আস্থাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রমের পর পরীক্ষা বাতিল হওয়া, পুনরায় পরীক্ষা দিতে বাধ্য হওয়া কিংবা ফলাফল নিয়ে অনিশ্চয়তা—এসবের প্রভাব শুধু শিক্ষাজীবনে নয়, মানসিক স্বাস্থ্যেও পড়ছে। বহু পরিবার আর্থিক ও সামাজিক ক্ষতির মুখে পড়ছে।

ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ সরকারের উপর রাজনৈতিক চাপ কিছুটা কমিয়ে থাকতে পারে। কিন্তু প্রশ্নফাঁসের বিরুদ্ধে প্রকৃত লড়াই এখনও শুরুই হয়নি। কড়া আইন প্রণয়ন করা তুলনামূলক সহজ; সেই আইন কার্যকর করে দ্রুত অপরাধীদের শাস্তি দেওয়াই আসল চ্যালেঞ্জ। যতদিন না বিচারব্যবস্থা দ্রুত ও কার্যকর হচ্ছে, ততদিন প্রশ্নফাঁসের দুষ্টচক্র ভাঙা কঠিনই থেকে যাবে। আর ততদিন পরীক্ষা-সংস্কারের সরকারি দাবি কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে।