বাংলাস্ফিয়ার: ভারতের সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনের প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন জানালেন সুইডেনের পরিবেশ আন্দোলনের মুখ গ্রেটা থুনবার্গ। লন্ডনের ট্রাফালগার স্কোয়ারে এক সংহতি সমাবেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন, ভারতের ছাত্রদের আন্দোলন শুধু দেশটির তরুণদের নয়, বিশ্বের যুবসমাজকেও নতুন আশা দেখিয়েছে। তাঁর কথায়, এই আন্দোলন প্রমাণ করেছে যে মানুষ একসঙ্গে দাঁড়ালে পরিবর্তন সম্ভব এবং সেটাই প্রকৃত ‘জনশক্তি’র পরিচয়।

গ্রেটা বলেন, “ভারতের ছাত্র আন্দোলন আমাদের সকলকে গর্বিত করেছে। তারা আমাদের আশা দিয়েছে। মানুষ যখন ঐক্যবদ্ধ হয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে, তখন কী অর্জন করা সম্ভব, তারা সেটাই দেখিয়েছে। এটাই মানুষের শক্তির প্রকৃত অর্থ।”

তিনি আরও বলেন, “ভারতের ছাত্রদের ন্যায়বিচারের লড়াই এবং গণতন্ত্র ও মুক্তির বৃহত্তর সংগ্রাম আমাদেরও সংগ্রাম। তাই এখন আমাদের সবাইকে একসঙ্গে দাঁড়াতে হবে এবং ভারতের মানুষের পাশে সংহতি জানাতে হবে।”

সম্প্রতি পরীক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার, প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং শিক্ষাব্যবস্থায় জবাবদিহির দাবিতে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)-র নেতৃত্বে দেশজুড়ে যে ছাত্র আন্দোলন গড়ে ওঠে, তা আন্তর্জাতিক মহলেও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। দিল্লির যন্তর মন্তরে অনশন, দেশজুড়ে ছাত্রদের বিক্ষোভ এবং সরকারের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপের পর কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন। এরপর থেকেই আন্দোলনের প্রতি দেশ-বিদেশের বিভিন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের সমর্থন প্রকাশ অব্যাহত রয়েছে।

এর আগে অভিনেতা প্রকাশ রাজ, শাবানা আজমি, দিলজিৎ দোসাঞ্জ, কৌতুকশিল্পী বীর দাস-সহ একাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তি আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন। বিভিন্ন বিরোধী রাজনৈতিক দলও ছাত্রদের দাবিকে সমর্থন করে সরকারের ভূমিকার সমালোচনা করেছে। সেই তালিকায় এবার যোগ হল আন্তর্জাতিক জলবায়ু আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ গ্রেটা থুনবার্গের নাম।

মাত্র কিশোরী বয়সে সুইডেনের পার্লামেন্টের সামনে একক প্রতিবাদ কর্মসূচি শুরু করে বিশ্বজুড়ে জলবায়ু আন্দোলনের প্রতীক হয়ে ওঠেন গ্রেটা। পরবর্তীকালে ‘ফ্রাইডেজ ফর ফিউচার’ আন্দোলনের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ তরুণ-তরুণীকে পরিবেশ রক্ষার দাবিতে পথে নামতে উদ্বুদ্ধ করেন তিনি। জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন থেকে শুরু করে বিশ্বের নানা আন্তর্জাতিক মঞ্চে তিনি জলবায়ু ন্যায়বিচার, মানবাধিকার এবং গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রশ্নে ধারাবাহিকভাবে সরব থেকেছেন।

লন্ডনের সমাবেশে বক্তব্য রাখতে গিয়েও তিনি একই সুরে বলেন, কোনও দেশের মানুষের ন্যায়বিচারের লড়াইকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখা যায় না। এক দেশের তরুণদের সংগ্রাম অন্য দেশের মানুষের কাছেও অনুপ্রেরণা হতে পারে। তাঁর মতে, ভারতের ছাত্রদের আন্দোলন সেই ধরনেরই একটি উদাহরণ, যা আন্তর্জাতিক সংহতির প্রয়োজনীয়তাকে আরও স্পষ্ট করেছে।

গ্রেটার এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এল, যখন ভারতের ছাত্র আন্দোলনকে ঘিরে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও বিস্তর আলোচনা চলছে। বিশেষ করে তরুণদের নেতৃত্বে দীর্ঘদিন ধরে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন, তার প্রতি সাধারণ মানুষের সমর্থন এবং শেষ পর্যন্ত সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি—এই গোটা ঘটনাপ্রবাহকে বিশ্বের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, গ্রেটা থুনবার্গের মতো আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত একজন আন্দোলনকারীর সমর্থন এই আন্দোলনের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতাকে আরও জোরদার করতে পারে। যদিও সরকার এখনও এ বিষয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি, ছাত্র সংগঠনগুলির দাবি, এই সমর্থন প্রমাণ করে যে তাদের আন্দোলনের বার্তা দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বমঞ্চেও পৌঁছে গিয়েছে।

সিজেপি-র পক্ষ থেকেও গ্রেটার বক্তব্যকে স্বাগত জানানো হয়েছে। সংগঠনের নেতারা বলেছেন, এটি শুধু তাঁদের আন্দোলনের প্রতি সমর্থন নয়, বরং শিক্ষার অধিকার, স্বচ্ছ পরীক্ষা ব্যবস্থা এবং গণতান্ত্রিক অধিকারের দাবিতে লড়াই করা ভারতের কোটি তরুণ-তরুণীর প্রতি আন্তর্জাতিক সংহতির বার্তা। তাঁদের দাবি, আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল শিক্ষাব্যবস্থায় বিশ্বাস পুনর্গঠন এবং সেই দাবির প্রতি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সমর্থন মিলতে শুরু করেছে।