Table of Contents
ফ্রান্স ও স্পেনে দাবানলের তাণ্ডব যেন থামতেই চাইছে না। ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বোর্দো শহরের উপকণ্ঠে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে দিন-রাত এক করে লড়াই চালাচ্ছেন দমকলকর্মীরা। এরই মধ্যে আবহাওয়াবিদদের সতর্কবার্তা—মঙ্গলবার থেকেই ফ্রান্সে আছড়ে পড়তে পারে নতুন তাপপ্রবাহ। কয়েকটি অঞ্চলে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
একই সময়ে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজও সতর্ক করেছেন, জলবায়ু সংকটের প্রভাব এখন আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়—গোটা আইবেরীয় উপদ্বীপে তা সরাসরি অনুভূত হচ্ছে।
প্যারিসের চার গুণ এলাকা পুড়ে ছাই
শনিবার রাতভর প্রবল বাতাসের জেরে ফ্রান্সের জিরোন্দ অঞ্চলের দাবানল আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে। ইতিমধ্যেই আগুনে পুড়ে গেছে প্যারিস শহরের আয়তনের প্রায় চার গুণ এলাকা।
দাবানলের জেরে ফ্রান্সে প্রায় ২ লক্ষ ৬০ হাজার এবং স্পেনে আরও ১ লক্ষ ১৬ হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। দুই দেশ মিলিয়ে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩ লক্ষ ৭৫ হাজার।
বোর্দোর মেয়র থমা কাজেনাভ জানিয়েছেন, আগুন শহর থেকে মাত্র ২৫ থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে। তবে আপাতত বোর্দো শহর খালি করার কোনও পরিকল্পনা নেই। স্থানীয় প্রশাসনের দাবি, রাতের মধ্যে আগুনের বড় ধরনের বিস্তার না হলেও পরিস্থিতি এখনও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
জিরোন্দের পাশাপাশি দক্ষিণের লঁদ অঞ্চল থেকেও প্রায় ৩৬ হাজার মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
‘আগুন কোন দিকে ছড়াবে, জানি না’
নুভেল-আকিতেন অঞ্চলের প্রিফেক্ট সোফি ব্রোকা পরিস্থিতির ভয়াবহতা বোঝাতে বলেছেন, দাবানলের আচরণ এতটাই অনিশ্চিত যে ফ্রান্সে এর আগে এমন পরিস্থিতি দেখা যায়নি।
পর্যটকদের আপাতত জিরোন্দে না যাওয়ার অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, আগুন কোন দিকে ছড়াবে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। যারা ইতিমধ্যেই এলাকায় রয়েছেন, তাঁদেরও অন্যত্র চলে যাওয়ার কথা ভাবতে বলেছেন তিনি।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সোমবার জরুরি মন্ত্রিসভার বৈঠক ডাকেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাকরোঁ।
আগুন নিজেই তৈরি করছে ঝড়!
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরঁ নুনিয়েজ জানিয়েছেন, শনিবার রাত ছিল বিশেষভাবে কঠিন। আগুন এতটাই তীব্র হয়ে ওঠে যে তা নিজস্ব বায়ুপ্রবাহ তৈরি করে অনিয়ন্ত্রিতভাবে বোর্দো মহানগরীর দিকে এগোতে শুরু করে। রাতের শেষ দিকে আগুনের তীব্রতা কিছুটা কমলেও বিপদ এখনও কাটেনি।
দমকলকর্মীদের একাংশের মতে, আগুন থেকে তৈরি হয়েছে ‘পাইরোকিউমুলোনিম্বাস’—এক ধরনের আগুন-সৃষ্ট বজ্রঝড়। এই বিরল ঘটনায় আগুন নিজেই শক্তিশালী বাতাস, ঘূর্ণি এবং অস্থির আবহাওয়া তৈরি করতে পারে। ফলে দাবানল নিয়ন্ত্রণ করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
ফ্রান্সের জাতীয় দমকল ফেডারেশনের মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল এরিক ব্রোকার্দির কথায়, “এটি যেন ডেভিড বনাম গোলিয়াথের লড়াই।”
আহত ৮৪ দমকলকর্মী
গত বুধবার থেকে চলা দাবানলে এখনও পর্যন্ত ৮৪ জন দমকলকর্মী আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ১০ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে।
আগুন নেভাতে জিরোন্দে মোতায়েন করা হয়েছে প্রায় ২,৫০০ দমকলকর্মী। তাঁদের মধ্যে সুইজারল্যান্ডের একটি বিশেষ দলও রয়েছে। পাশাপাশি ১,৫০০ সেনাসদস্য, ১,২০০ পুলিশ এবং প্রায় ৪৫০ জন স্বেচ্ছাসেবক উদ্ধার ও আগুন নিয়ন্ত্রণের কাজে যুক্ত রয়েছেন।
তবে দমকলকর্মীদের সংগঠনের এক নেতা অভিযোগ করেছেন, বিষাক্ত ধোঁয়া থেকে সুরক্ষার জন্য পর্যাপ্ত সরঞ্জাম নেই তাঁদের হাতে।
এদিকে বনাঞ্চলে অসাবধানতার অভিযোগে তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাঁদের মধ্যে একজন জঙ্গলে ধূমপান করছিলেন এবং দু’জন বনাঞ্চলে বারবিকিউ করছিলেন বলে অভিযোগ।
স্পেনেও ‘কঠিন সময়ের’ সতর্কতা
অন্যদিকে, মাদ্রিদের পশ্চিমে ছড়িয়ে পড়া বড় দাবানল অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলে জানিয়েছে স্পেনের সামরিক জরুরি পরিষেবা। তবে পরিস্থিতি নিয়ে আত্মতুষ্টির কোনও জায়গা নেই বলে সতর্ক করেছেন প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ।
দমকলের অগ্রবর্তী নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র পরিদর্শনের সময় তিনি বলেন, জলবায়ু সংকটের কারণে স্পেন ও পর্তুগাল কখনও দাবানল, কখনও প্রবল ঝড়, আবার কখনও অস্বাভাবিক তুষারপাতের মতো চরম আবহাওয়ার মুখোমুখি হচ্ছে।
তাঁর কথায়, গোটা আইবেরীয় উপদ্বীপই এখন জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি অভিঘাত অনুভব করছে।
মঙ্গলবার থেকেই নতুন বিপদ?
এরই মধ্যে আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাসে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মঙ্গলবার থেকে ফ্রান্সে ফের তাপপ্রবাহ শুরু হতে পারে। কয়েকটি অঞ্চলে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
তাপমাত্রা বাড়লে শুষ্ক বনাঞ্চলে আগুন আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে ফ্রান্স ও স্পেন—দুই দেশেই আগামী কয়েক দিন পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
দাবানল, প্রবল বাতাস এবং নতুন তাপপ্রবাহের আশঙ্কা—সব মিলিয়ে ইউরোপের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল এখন যেন আগুন ও উত্তাপের একসঙ্গে লড়াইয়ের মুখে।