বাংলাস্ফিয়ার: স্পেন ও ফ্রান্সে ছড়িয়ে পড়া ভয়াবহ দাবানলের জেরে আড়াই লক্ষেরও বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তীব্র তাপপ্রবাহ, প্রবল বাতাস এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় দুই দেশই নজিরবিহীন পরিস্থিতির মুখোমুখি।
স্পেনে প্রায় ৭০ হাজার মানুষকে মধ্যাঞ্চল থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ফ্রান্সে ঘরছাড়া হয়েছেন প্রায় ১ লক্ষ ৯৭ হাজার মানুষ, যার মধ্যে বোর্দো ও তার আশপাশের বিখ্যাত আঙুরখেত অঞ্চলের বাসিন্দারাও রয়েছেন। দাবানলের কারণে স্পেন তার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরঁ নুনিয়েজ বলেছেন, এটি সম্ভবত শান্তিকালীন সময়ে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় গণ-উদ্ধার অভিযান।
শত শত দমকলকর্মী আগুন নেভানোর কাজে নিয়োজিত থাকলেও দাবানল এখনও নিয়ন্ত্রণে আসেনি। স্পেনে প্রবল বাতাসের কারণে তিনটি বড় দাবানলের মধ্যে দুটি একত্রিত হয়ে আরও ভয়ঙ্কর রূপ নিয়েছে।
ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জিরোন্দ অঞ্চলে আগুন নেভাতে ১৮টি বিমান ও হেলিকপ্টারের পাশাপাশি বিশাল সামরিক পরিবহণ বিমান এয়ারবাস এ৪০০এম অ্যাটলাস মোতায়েন করা হয়েছে। আগুন মোকাবিলায় সেনাবাহিনীর দেড় হাজার সদস্যকে নামানো হয়েছে। ধোঁয়া থেকে মানুষকে রক্ষা করতে সরকার ১৫ লক্ষ মুখোশ বিতরণের ব্যবস্থা করেছে। পাশাপাশি আগুনের বিস্তার রুখতে খাল কাটা এবং অগ্নিনিরোধক রাসায়নিক ছড়ানোর কাজও চলছে।
প্রবল বাতাসে আগুন বোর্দোর দিকে এগিয়ে আসায় শহরের পশ্চিম উপকণ্ঠের বাসিন্দাদের অবিলম্বে এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পুলিশ বাড়ি বাড়ি গিয়ে মানুষকে সরিয়ে নিচ্ছে। ধোঁয়ায় অন্ধকার হয়ে যাওয়া আকাশের নিচে আতঙ্কিত মানুষকে দ্রুত বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে দেখা গেছে।
জিরোন্দ অঞ্চলের প্রশাসক সোফি ব্রোকা জানিয়েছেন, আগুন এখন এমন এক অভূতপূর্ব আকার নিয়েছে যা আগে কখনও দেখা যায়নি। কিছু উপকূলীয় এলাকায় আগুনের হাত থেকে বাঁচতে মানুষকে নৌকায় করে পালাতে হয়েছে।
ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকোর্নু বলেছেন, জিরোন্দের আগুন এতটাই তীব্র যে তা নিজেই বাতাসের প্রবাহ সৃষ্টি করছে। তাঁর কথায়, “আমাদের দেশে যে দাবানল চলছে, তা নজিরবিহীন। এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার মানুষের জীবন রক্ষা।” তিনি সকলকে দেরি না করে প্রশাসনের সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ মেনে চলার আহ্বান জানান।
স্পেনে দাবানলের ধোঁয়ায় বায়ুদূষণ মারাত্মক আকার নেওয়ায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী মনিকা গার্সিয়া মাদ্রিদের বাসিন্দাদের অপ্রয়োজনীয়ভাবে বাইরে না যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। বাইরে বেরোতে হলে মুখোশ ব্যবহারেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শনিবার সন্ধ্যায় স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক জানিয়েছে, ভ্যালেন্সিয়ার মানিসেস এলাকায় পৃথক একটি দাবানলে এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। একটি খাদে পড়ে থাকা গাড়ির ভিতর থেকে তাঁর দেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে মাদ্রিদের পশ্চিমে যে বৃহৎ দাবানল চলছে, সেখানে এখনও কোনও মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি।
ইউরোপজুড়ে পরপর দীর্ঘ তাপপ্রবাহে বনভূমি অত্যন্ত শুষ্ক হয়ে পড়েছে, ফলে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ জানিয়েছেন, চলতি বছরে ইতিমধ্যেই প্রায় ১ লক্ষ ৩০ হাজার হেক্টর বনভূমি পুড়ে গেছে, যা দেশের বার্ষিক গড়ের তুলনায় এক-তৃতীয়াংশ বেশি। ফ্রান্সে পুড়ে ছাই হয়েছে ৯৮ হাজার হেক্টরেরও বেশি বনভূমি, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
বিজ্ঞানীদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপপ্রবাহ, খরা ও চরম আবহাওয়ার ঘটনা ক্রমশ বেড়ে চলেছে। এর ফলে মাটি ও বনভূমি দ্রুত শুকিয়ে যাচ্ছে, যা দাবানলের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। ইউরোপে বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হারে উষ্ণায়ন ঘটছে।
তবে শনিবার তাপমাত্রা কিছুটা কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন পেদ্রো সানচেজ। যদিও তিনি সতর্ক করে বলেছেন, আগামী কয়েক ঘণ্টায় বাতাসের গতিপ্রকৃতির উপর অনেক কিছু নির্ভর করবে।
দাবানল মোকাবিলায় ফ্রান্স ও স্পেনকে সাহায্যের হাত বাড়িয়েছে ক্রোয়েশিয়া, চেক প্রজাতন্ত্র, গ্রিস, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, পর্তুগাল ও স্লোভাকিয়া। ইউরোপীয় কমিশনের সভাপতি উরসুলা ফন ডের লায়েন জানিয়েছেন, ইউরোপীয় উদ্ধার বহরের পাঁচটি বিমান ও দুটি হেলিকপ্টার ইতিমধ্যেই ফ্রান্সে কাজ করছে, এবং চারটি বিমান স্পেনে পৌঁছাচ্ছে। তাঁর কথায়, এই ভয়াবহ দুর্যোগের সময় ইউরোপ ফ্রান্স ও স্পেনের পাশে রয়েছে।