Table of Contents
ইরানের বিতর্কিত পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ফের কড়া বার্তা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর সাম্প্রতিক মন্তব্যে উঠে এসেছে এমন এক ভূগর্ভস্থ স্থাপনার নাম, যা এখন ওয়াশিংটন, তেল আবিব এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু বিশেষজ্ঞদের নজরের কেন্দ্রে—পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন।
পাহাড়ের গভীরে নির্মীয়মাণ এই রহস্যময় স্থাপনাটি ইরানের নাতাঞ্জ পারমাণবিক কেন্দ্রের পাশেই তৈরি হচ্ছে। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’-এ ফোরদো, ইসফাহান ও নাতাঞ্জে হামলা হলেও পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন অক্ষত ছিল। ফলে প্রশ্ন উঠছে—ইরানের পরমাণু কর্মসূচির ভবিষ্যৎ কি লুকিয়ে আছে এই পাহাড়ের গভীরে?
কী এই পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন?
পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনের সরকারি নাম কুহ-ই কোলাং গাজ লা (Kuh-e Kolang Gaz La)। তেহরান থেকে প্রায় ২২৫ কিলোমিটার দক্ষিণে, নাতাঞ্জ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রের একেবারে পাশে অবস্থিত এই পাহাড়ের গভীরে তৈরি হচ্ছে বিশাল এক ভূগর্ভস্থ স্থাপনা।
উপগ্রহচিত্রে একাধিক সুড়ঙ্গ, প্রবেশপথ এবং বড় বড় ভূগর্ভস্থ চেম্বারের অস্তিত্ব ধরা পড়েছে। পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলির ধারণা, সম্পূর্ণ হলে এটি ইরানের সবচেয়ে সুরক্ষিত পারমাণবিক স্থাপনাগুলির অন্যতম হয়ে উঠতে পারে।
নাতাঞ্জের পর আরও গভীরে কেন?
নাতাঞ্জ বহু বছর ধরেই নাশকতা ও হামলার লক্ষ্য। ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, সাইবার হামলা, বিস্ফোরণ এবং গোপন অভিযানের মাধ্যমে তারা নাতাঞ্জের সেন্ট্রিফিউজ কারখানায় বড় ধরনের ক্ষতি করেছে।
এই হামলার পর ইরান পারমাণবিক অবকাঠামোকে আরও গভীরে এবং আরও সুরক্ষিত স্থানে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করে বলে মনে করা হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনের মূল উদ্দেশ্যই হল বিমান হামলা বা ক্ষেপণাস্ত্র আক্রমণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক অবকাঠামোকে রক্ষা করা।
রহস্যের কেন্দ্রবিন্দু: ভিতরে কী হচ্ছে?
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ, স্থাপনাটির ভিতরে ঠিক কী ধরনের কাজ চলছে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA)-র পরিদর্শকদের এখনও এই স্থাপনার ভিতরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি। ফলে সেখানে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ চলছে কি না, উন্নত সেন্ট্রিফিউজ বসানো হয়েছে কি না, কিংবা ভবিষ্যতে অস্ত্র-মানের ইউরেনিয়াম উৎপাদনের প্রস্তুতি চলছে কি না—এসব নিয়ে জল্পনা বাড়ছে।
তেহরানের দাবি অবশ্য ভিন্ন। ইরান বরাবরই বলে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্যই পরিচালিত হচ্ছে।
ফোরদোর থেকেও শক্ত ঘাঁটি?
বিশ্লেষকদের মতে, পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনের সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা তার অবস্থান—পাহাড়ের গভীর অন্ধকারে।
স্থাপনাটি কতটা গভীরে নির্মিত হচ্ছে, তা নিয়ে নির্দিষ্ট তথ্য না থাকলেও ধারণা করা হচ্ছে, এটি ইরানের আগে থেকেই সুরক্ষিত বলে পরিচিত ফোরদো স্থাপনার চেয়েও বেশি প্রতিরোধী হতে পারে। মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এত গভীরে থাকা স্থাপনা ধ্বংস করতে অত্যন্ত শক্তিশালী বাঙ্কার-বাস্টার বোমার একাধিক আঘাতের প্রয়োজন হতে পারে।
এই কারণেই ২০২৫ সালের মার্কিন হামলায় এটি লক্ষ্যবস্তু করা হয়নি বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ট্রাম্পের মন্তব্যে ফের জল্পনা
সৌদি আরবের সঙ্গে বেসামরিক পারমাণবিক চুক্তি অনুমোদনের পর ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে উদ্বেগ বাড়লে যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনে আবার সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে।
তাঁর সাম্প্রতিক মন্তব্যে পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনের উল্লেখ নতুন করে জল্পনা তৈরি করেছে। প্রশ্ন উঠছে, ভবিষ্যতে কোনও মার্কিন সামরিক অভিযানের পরিকল্পনায় এই ভূগর্ভস্থ স্থাপনাটি কি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হয়ে উঠতে পারে?
ইসরায়েলের উদ্বেগও বাড়ছে
ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছে, শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির আড়ালে ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করছে। তেহরান অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করে।
ইসরায়েলি নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন সম্পূর্ণ চালু হয়ে গেলে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি থামানো বা ক্ষতিগ্রস্ত করা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
পাহাড়ের ভিতরের রহস্য, কূটনীতির বাইরে যুদ্ধের ছায়া
পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন ঘিরে উদ্বেগ এমন এক সময়ে বাড়ছে, যখন ইরান ও পশ্চিমা বিশ্বের সম্পর্ক ফের উত্তপ্ত। একদিকে নতুন নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কা, অন্যদিকে সামরিক সংঘাতের হুমকি—এই দুইয়ের মাঝখানে পাহাড়ের গভীরে নির্মীয়মাণ স্থাপনাটি হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক কূটনীতির নতুন কেন্দ্রবিন্দু।
বিশেষজ্ঞদের মতে, IAEA-কে ভবিষ্যতেও এই স্থাপনা পরিদর্শনের অনুমতি না দেওয়া হলে ইরানকে ঘিরে সন্দেহ আরও বাড়তে পারে। তার ফল হতে পারে নতুন কূটনৈতিক চাপ, আরও নিষেধাজ্ঞা এবং সামরিক উত্তেজনা।
পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন এখনও পুরোপুরি চালু হয়নি। কিন্তু এর রহস্যই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কাছে এটি সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকি; ইরানের কাছে আবার এটি তার সার্বভৌম অধিকারের অংশ।
পাহাড়ের গভীরে নির্মীয়মাণ এই স্থাপনা তাই শুধু একটি পারমাণবিক প্রকল্প নয়—আগামী দিনে পশ্চিম এশিয়ার ভূ-রাজনীতি, পরমাণু কূটনীতি এবং যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সম্পর্কের অন্যতম বড় পরীক্ষাক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।