ভারত-সহ বিশ্বের ৬০টি দেশের পণ্যের উপর নতুন করে ‘জোরপূর্বক শ্রম’ (Forced Labour) সংক্রান্ত শুল্ক আরোপের ঘোষণা করেছে আমেরিকা। দীর্ঘ কয়েক মাসের তদন্ত শেষে বৃহস্পতিবার আমেরিকার বাণিজ্য প্রতিনিধির দফতর (ইউএসটিআর) জানায়, ভারতের রফতানি পণ্যের উপর ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক বসানো হবে।
যদিও তদন্তের প্রাথমিক খসড়ায় ভারতের জন্য ১২.৫ শতাংশ শুল্কের প্রস্তাব ছিল, শেষ পর্যন্ত তা কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে।
এই নতুন শুল্কের ফলে ভারত একই স্তরে চলে এল পাকিস্তান, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা এবং লাতিন আমেরিকা ও এশিয়ার একাধিক দেশের সঙ্গে। আমেরিকার প্রশাসনের দাবি, এই দেশগুলি জোরপূর্বক শ্রমে তৈরি পণ্যের আমদানি রোধে যথেষ্ট কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে। তাই সেকশন ৩০১-এর আওতায় তাদের বিরুদ্ধে বাণিজ্যিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এই সিদ্ধান্ত কার্যত ফেব্রুয়ারিতে ঘোষিত অস্থায়ী ১০ শতাংশ বৈশ্বিক শুল্কের পরিবর্তে কার্যকর হবে। সেই অস্থায়ী ব্যবস্থা চলতি সপ্তাহেই শেষ হয়েছে। নতুন নীতির আওতায় এখন দেশভিত্তিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে।
আমেরিকার প্রশাসনের বক্তব্য, আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খলে জোরপূর্বক শ্রমের ব্যবহার রুখতে এই পদক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা, শিশু ও বাধ্যতামূলক শ্রমের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান এবং মানবাধিকার সুরক্ষার লক্ষ্যেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ওয়াশিংটনের দাবি, যে দেশগুলি কার্যকর আইন প্রয়োগে ব্যর্থ হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রেই এই শুল্ক প্রযোজ্য।
ভারতের ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ শুল্ক বহাল থাকলেও, প্রাথমিক প্রস্তাবের তুলনায় হার কমে যাওয়াকে কিছুটা স্বস্তির খবর বলেই মনে করছেন বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা। তবে তাঁরা সতর্ক করছেন, এই শুল্ক ভারতীয় রফতানিকারকদের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানকে প্রভাবিত করতে পারে।
বিশেষত বস্ত্র, পোশাক, চামড়াজাত পণ্য, হস্তশিল্প, কৃষিজাত পণ্য এবং কিছু উৎপাদনশিল্পের রফতানির উপর এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আমেরিকার এই পদক্ষেপ এমন এক সময়ে এল, যখন ভারত ও আমেরিকার মধ্যে একটি বিস্তৃত দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে। দুই দেশই বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও গভীর করার কথা বললেও, নতুন শুল্ক সেই আলোচনায় নতুন চাপ তৈরি করতে পারে বলে কূটনৈতিক মহলের ধারণা।
ভারত সরকার এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে এই সিদ্ধান্তের বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে বাণিজ্য মন্ত্রকের সূত্রে ইঙ্গিত মিলেছে, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং আমেরিকার প্রশাসনের সঙ্গে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক স্তরে আলোচনা চালানো হবে। প্রয়োজনে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) বিধি-বিধানও পর্যালোচনা করা হতে পারে।
আমেরিকার প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, নতুন শুল্কের আওতায় থাকা ৬০টি দেশ মিলিয়ে আমেরিকার মোট আমদানির ৯৯ শতাংশেরও বেশি অংশ জুড়ে রয়েছে। অর্থাৎ এটি কোনও নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নয়, বরং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে শ্রমের মান ও মানবাধিকার রক্ষার প্রশ্নে ওয়াশিংটনের নতুন বাণিজ্য নীতির অংশ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী দিনে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকার বজায় রাখতে ভারতকে শ্রম আইন কার্যকর প্রয়োগ, সরবরাহ শৃঙ্খলে স্বচ্ছতা এবং রফতানিমুখী শিল্পে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে চলার বিষয়গুলিতে আরও জোর দিতে হতে পারে।
একই সঙ্গে ভারত-আমেরিকা বাণিজ্য আলোচনার অগ্রগতির উপরও এই শুল্কের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করবে।