নিট (NEET) প্রশ্নফাঁস কাণ্ডকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে ক্ষোভের আবহের মধ্যেই রাজধানীর গান্ধী স্মৃতিতে গিয়ে আত্মহত্যা করা পড়ুয়াদের প্রতি শ্রদ্ধা জানালেন বিরোধী জোটের সাংসদরা। তাঁদের দাবি, পরীক্ষা ব্যবস্থায় দুর্নীতি, অনিশ্চয়তা এবং দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক ব্যর্থতার কারণেই বহু ছাত্রছাত্রী চরম হতাশায় আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছে। এই ঘটনাগুলির নৈতিক দায় কেন্দ্র সরকার এবং শিক্ষা মন্ত্রকের এড়ানোর উপায় নেই বলেও মন্তব্য করেন তাঁরা।

শুক্রবার সকালে বিভিন্ন বিরোধী দলের সাংসদরা রাজঘাট সংলগ্ন গান্ধী স্মৃতিতে সমবেত হন। মহাত্মা গান্ধীর স্মৃতিসৌধে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণের পাশাপাশি তাঁরা পরীক্ষা দুর্নীতি এবং পড়ুয়াদের মৃত্যুর ঘটনায় এক মিনিট নীরবতা পালন করেন। কয়েকজন সাংসদ হাতে সাদা ফুল এবং কালো ফিতা ধারণ করেন। তাঁদের বক্তব্য, এই কর্মসূচি কোনও রাজনৈতিক প্রতিবাদ নয়, বরং দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি সংহতি এবং রাষ্ট্রের বিবেককে জাগিয়ে তোলার আবেদন।

বিরোধী সাংসদদের অভিযোগ, প্রশ্নফাঁসের জেরে শুধু পরীক্ষার স্বচ্ছতাই প্রশ্নের মুখে পড়েনি, লক্ষ লক্ষ পরীক্ষার্থীর মানসিক স্বাস্থ্যও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বহু পরিবার বছরের পর বছর প্রস্তুতির পর সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। সেই চাপ থেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে একাধিক পরীক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে বলে তাঁদের দাবি।

সাংসদদের বক্তব্য, মহাত্মা গান্ধী সত্য, নৈতিকতা এবং জবাবদিহির যে আদর্শ রেখে গিয়েছেন, সেই মূল্যবোধের প্রতীক হিসেবেই গান্ধী স্মৃতিকে এই কর্মসূচির জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে। তাঁদের মতে, শিক্ষা ব্যবস্থায় সততা ফিরিয়ে আনতে হলে শুধু অপরাধীদের গ্রেফতার করলেই হবে না, পরীক্ষা পরিচালনার পুরো ব্যবস্থার সংস্কার জরুরি।

সংসদের চলতি অধিবেশনেও বিরোধীরা একই ইস্যুতে সরব। তাঁদের দাবি, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ এবং প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় সর্বোচ্চ পর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত। বিরোধীদের অভিযোগ, সরকার দীর্ঘদিন সমস্যার গুরুত্ব অস্বীকার করেছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে প্রতিবাদ দমনের পথ বেছে নিয়েছে।

অন্যদিকে কেন্দ্র সরকার জানিয়েছে, পরীক্ষায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে তারা ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি অনুসরণ করছে। ইতিমধ্যেই একাধিক তদন্তকারী সংস্থা প্রশ্নফাঁসের মামলায় তদন্ত চালাচ্ছে এবং বহু অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও সম্প্রতি ঘোষণা করেছেন, প্রশ্নফাঁস সংক্রান্ত মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ দ্রুত বিচার আদালত গঠন এবং কঠোর নতুন আইন আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তাঁর বক্তব্য, দেশের যুবসমাজের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনও আপস করা হবে না।

তবে বিরোধীদের মতে, কেবল ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি যথেষ্ট নয়। যেসব পরিবার সন্তান হারিয়েছে, তাদের কাছে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা যাতে আর না ঘটে, সেই নিশ্চয়তা দেওয়াই সরকারের প্রকৃত দায়িত্ব।

গান্ধী স্মৃতির কর্মসূচি শেষে সাংসদরা বলেন, এই আন্দোলন কোনও একটি পরীক্ষা বা একটি ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এবং তাঁদের ভবিষ্যৎ রক্ষার লড়াই। পরীক্ষার্থীদের আত্মহত্যার প্রতিটি ঘটনাকে জাতীয় ট্র্যাজেডি হিসেবে বিবেচনা করে সরকারকে দ্রুত, স্বচ্ছ এবং বিশ্বাসযোগ্য পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান তাঁরা।

বিরোধীদের দাবি, দেশের কোটি কোটি ছাত্রছাত্রী এখন শুধু অপরাধীদের শাস্তিই নয়, এমন একটি পরীক্ষা ব্যবস্থা চায় যেখানে কঠোর পরিশ্রমই সাফল্যের একমাত্র ভিত্তি হবে, প্রশ্নফাঁস বা দুর্নীতি নয়। গান্ধী স্মৃতিতে তাঁদের এই প্রতীকী শ্রদ্ধার্ঘ্য সেই বার্তাকেই আরও জোরালোভাবে সামনে নিয়ে এল।