বাংলাস্ফিয়ার: পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতির আরও অবনতির জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আবার দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে। বুধবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপিছু ৯৫ ডলারের গণ্ডি অতিক্রম করে, যা গত ছয় সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ।

আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে নতুন করে সংঘাত তীব্র হওয়ার পাশাপাশি, ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা বাব-এল-মান্দেব প্রণালী দিয়ে সৌদি আরবের তেল বহনকারী জাহাজে হামলার হুমকি দেওয়ায় বিশ্ববাজারে সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

বুধবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম একসময় ব্যারেলপিছু ৯৫.২৪ ডলারে পৌঁছায়। পরে কিছুটা নেমে ৯৪.৪০ ডলারে লেনদেন হয়, যা আগের দিনের তুলনায় ৩ শতাংশেরও বেশি বেশি।

এপ্রিল মাসে সংঘাতের তীব্রতার সময় ব্রেন্টের দাম ১২৬ ডলার পর্যন্ত উঠেছিল। পরে জুলাইয়ের শুরুতে তা নেমে ৭১ ডলারে এসেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক কয়েক দিনের যুদ্ধ পরিস্থিতি ফের উত্তপ্ত হওয়ায় তেলের বাজারেও অস্থিরতা ফিরে এসেছে।

এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে রয়েছে ইরানে টানা ১১ রাত ধরে মার্কিন হামলা। যুদ্ধবিরতির একটি অন্তর্বর্তী চুক্তি করার কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চললেও তা কার্যত ভেস্তে গেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, হামলার তীব্রতা আরও বাড়ানো হবে। তাঁর দাবি, এই যুদ্ধে ইতিমধ্যেই আমেরিকার ব্যয় হয়েছে ৩৭.৫ বিলিয়ন ডলার।

বিশ্লেষকদের মতে, মার্চে হরমুজ প্রণালী দিয়ে উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল রফতানি ব্যাহত হওয়ার পর থেকে এত দ্রুত তেলের দাম আর বাড়েনি।

গোল্ডম্যান স্যাকসের বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, হরমুজ প্রণালী দিয়ে স্বাভাবিক তেল রফতানি দ্রুত পুনরায় শুরু না হলে চলতি বছরের শেষ নাগাদ ব্রেন্টের দাম ব্যারেলপিছু ১২০ ডলারে পৌঁছাতে পারে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) প্রধান ফাতিহ বিরোল বলেছেন, এখন পর্যন্ত কিছু “সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা” বিশ্ব তেলের বাজারকে বড় ধাক্কা থেকে রক্ষা করেছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে আত্মতুষ্টির কোনও সুযোগ নেই।

এই ব্যবস্থাগুলির মধ্যে রয়েছে আইইএ-ভুক্ত দেশগুলির মজুত থেকে প্রায় ৪০ কোটি ব্যারেল জরুরি তেল ও তেলজাত পণ্য বাজারে ছাড়া এবং সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহির বিকল্প রুট ব্যবহার করে রফতানি অব্যাহত রাখার উদ্যোগ।

এছাড়া ইউরোপ ও আমেরিকার তেল উৎপাদনকারী দেশগুলি রফতানি বাড়িয়েছে। অন্যদিকে বিশ্বের বৃহত্তম তেল আমদানিকারক দেশ চীন আন্তর্জাতিক বাজার থেকে তেল কেনা কিছুটা কমিয়েছে।

এই সব কারণেই তেলের দাম যুদ্ধের শুরুতে যে মাত্রায় পৌঁছানোর আশঙ্কা করা হয়েছিল, সেখানে এখনও যায়নি। তবে আইইএ-এর মতে, এই সংঘাত বিশ্ব তেল সরবরাহ ব্যবস্থার ইতিহাসে অন্যতম বড় বিপর্যয় ডেকে এনেছে।

তেল কেনা কমে যাওয়ায় বিশ্বের বহু শোধনাগার উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। ফলে ডিজেল, পেট্রোল ও বিভিন্ন রাসায়নিক পণ্যের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ফাতিহ বিরোলের কথায়, অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ কিছুটা বাড়লেও পরিশোধিত জ্বালানির উৎপাদন সেই হারে বাড়েনি। ফলে ডিজেল ও পেট্রোলের বাজারে চাপ অনেক বেশি।

তিনি আরও জানান, আমেরিকা ও কানাডা থেকে প্রাকৃতিক গ্যাস রফতানি বৃদ্ধি পাওয়ায় হরমুজ প্রণালী দিয়ে উপসাগরীয় অঞ্চলের গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ার প্রায় ৭০ শতাংশ ঘাটতি পূরণ হয়েছে। কিন্তু শীতের আগে ইউরোপীয় দেশগুলি গ্যাসের মজুত বাড়ানোর চেষ্টা করায় বিশ্ববাজারে গ্যাসের জোগান এখনও টানটান থাকবে।

বিরোলের মতে, বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা রক্ষার জন্য হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণ ও নিঃশর্তভাবে পুনরায় খুলে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

এদিকে নরওয়ের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থা ইকুইনর জানিয়েছে, এপ্রিল-জুন ত্রৈমাসিকে তাদের মুনাফা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ১১.৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। যুদ্ধের কারণে তেল ও গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ায় সংস্থার আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

অন্যদিকে ট্রাম্প বুধবার সতর্ক করে বলেছেন, হরমুজ প্রণালীতে ইরান যদি কোনও জাহাজে হামলা চালায়, তাহলে আমেরিকা ইরানের একটি করে সেতু বা বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংস করবে।

আলোচনা কার্যত অচল হয়ে পড়ায় দুই পক্ষই একে অপরের বেসামরিক অবকাঠামোকে চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। আমেরিকার হামলার জবাবে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামো এবং পানীয় জল সরবরাহকারী লবণমুক্তকরণ কেন্দ্রগুলিকে লক্ষ্যবস্তু করেছে।

আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, কোনও বেসামরিক অবকাঠামো সামরিক কাজে ব্যবহৃত না হলে সেখানে হামলা চালানো নিষিদ্ধ। তবে চলমান সংঘাত সেই নীতিকেই নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে।