বাংলাস্ফিয়ার: দিল্লিতে পরীক্ষা-সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগ এবং শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে চলা আন্দোলন ঘিরে রাজনৈতিক সংঘাত আরও তীব্র হয়েছে। ‘সংসদ চলো’ কর্মসূচিতে পুলিশের লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস ও ব্যাপক ধরপাকড়ের পর মঙ্গলবার বিরোধী শিবির একযোগে আন্দোলনকারীদের পাশে দাঁড়ায়। শরদ পাওয়ার, অরবিন্দ কেজরিওয়াল, শিবসেনা (উদ্ধব) নেতারা, তৃণমূল কংগ্রেস, বাম দল এবং একাধিক বিরোধী সাংসদ যন্তর মন্তরে গিয়ে আহত আন্দোলনকারীদের সঙ্গে দেখা করেন এবং পুলিশি পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেন।
এদিকে লোকসভার বিরোধী দলনেতার নেতৃত্বে কংগ্রেস সাংসদরা প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনের বাইরে আকস্মিক অবস্থান বিক্ষোভে বসেন। পরে পুলিশ তাদের সরিয়ে দেয়। ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংসদের ভেতর ও বাইরে নতুন করে রাজনৈতিক উত্তাপ তৈরি হয়েছে।
সোমবার সংসদের দিকে মিছিল নিয়ে এগোতে গেলে দিল্লি পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ বাধে। পুলিশের দাবি, আন্দোলনকারীরা ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা করেন এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিঘ্নিত হয়। অন্যদিকে আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে অকারণে লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস এবং অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করা হয়েছে। সংঘর্ষে প্রায় ১৮০ জন আহত হওয়ার খবর সামনে এসেছে।
মঙ্গলবার যন্তর মন্তরে পৌঁছে এনসিপি (শরদচন্দ্র পাওয়ার) প্রধান শরদ পাওয়ার বলেন, গণতন্ত্রে প্রতিবাদের অধিকার কেড়ে নেওয়া যায় না। তাঁর সঙ্গে ছিলেন সাংসদ সুপ্রিয়া সুলে। তাঁরা আহতদের সঙ্গে কথা বলেন এবং আন্দোলনের দাবিকে গুরুত্ব দিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের আহ্বান জানান।
আম আদমি পার্টির প্রধান অরবিন্দ কেজরিওয়ালও আন্দোলনস্থলে পৌঁছে বলেন, পরীক্ষা ব্যবস্থায় দুর্নীতি ও প্রশ্নফাঁসের অভিযোগে ক্ষুব্ধ ছাত্র-যুবকদের কণ্ঠরোধ করা গণতান্ত্রিক পদ্ধতি হতে পারে না। তাঁর দলের নেতা গোপাল রায়ও আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেন।
শিবসেনা (উদ্ধব বালাসাহেব ঠাকরে) শিবিরের সাংসদ সঞ্জয় রাউত ও অরবিন্দ সাওয়ান্তও যন্তর মন্তরে যান। তাঁদের বক্তব্য, আন্দোলনের জবাব লাঠি দিয়ে নয়, আলোচনার মাধ্যমে দেওয়া উচিত। একই সঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের মহুয়া মৈত্র, ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চার মহুয়া মাজি, কেরল কংগ্রেস (এম)-এর জোসে কে. মানি এবং বামপন্থী সাংসদদের একটি প্রতিনিধিদলও আন্দোলনকারীদের সঙ্গে দেখা করে।
আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অনিয়ম, প্রশ্নফাঁস এবং শিক্ষা ব্যবস্থার জবাবদিহির দাবি। আন্দোলনকারীরা কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ, পরীক্ষা সংস্কার এবং ক্ষতিগ্রস্ত ছাত্রছাত্রীদের জন্য ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়ে আসছেন। আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন সোনম ওয়াংচুকও।
পুলিশি অভিযানের পরও আন্দোলন থামেনি। যন্তর মন্তরে ফের অবস্থান শুরু হয়েছে এবং আন্দোলনের নেতৃত্ব জানিয়েছে, দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত কর্মসূচি চলবে। সিজেপি প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে জানান, সরকারের সঙ্গে আলোচনা হলেও কোনও নির্দিষ্ট আশ্বাস মেলেনি।
কেন্দ্র অবশ্য বিরোধীদের অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে। সরকারের বক্তব্য, আইন ভেঙে সংসদমুখী মিছিলের চেষ্টা হওয়ায় পুলিশ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছে। সরকারের দাবি, পরীক্ষা-সংক্রান্ত অনিয়মের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই তদন্ত, গ্রেফতার এবং পুনরায় পরীক্ষা নেওয়ার মতো পদক্ষেপ করা হয়েছে। আন্দোলনকে রাজনৈতিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে বলেও সরকারি মহলের অভিযোগ।
পুলিশের তরফে জানানো হয়েছে, সোমবারের সংঘর্ষের ঘটনায় এফআইআর দায়ের হয়েছে। পুলিশের অভিযোগ, কিছু আন্দোলনকারী পাথর ছোড়েন এবং নিরাপত্তা বলয় ভাঙার চেষ্টা করেন। অন্যদিকে আন্দোলনকারীদের দাবি, তাঁদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করা হচ্ছে এবং পুলিশি বর্বরতার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত।
কংগ্রেসও এদিন কেন্দ্রকে ঘিরে আক্রমণ আরও তীব্র করে। বিরোধী দলনেতার নেতৃত্বে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের বাইরে অবস্থান বিক্ষোভকে বিজেপি ‘অরাজকতার রাজনীতি’ বলে কটাক্ষ করলেও কংগ্রেসের বক্তব্য, গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের অধিকার রক্ষার জন্যই এই কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। পরে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের সেখান থেকে সরিয়ে দেয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ছাত্র-যুবদের এই আন্দোলন এখন শুধুমাত্র পরীক্ষা-সংক্রান্ত অসন্তোষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। কর্মসংস্থান, স্বচ্ছতা, সরকারি জবাবদিহি এবং গণতান্ত্রিক অধিকার—এই বৃহত্তর প্রশ্নগুলিও আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে। সেই কারণেই বিভিন্ন মতাদর্শের বিরোধী দলগুলি এক মঞ্চে এসে আন্দোলনের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে।
অন্যদিকে কেন্দ্র এখনও আলোচনার দরজা পুরোপুরি বন্ধ করেনি। সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের প্রাথমিক বৈঠক হয়েছে, তবে মূল দাবিগুলি নিয়ে কোনও ঐকমত্য তৈরি হয়নি। ফলে দিল্লিতে রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও আন্দোলনের আবহ আগামী কয়েক দিন আরও তীব্র হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।