হাইলাইটস:
- সোনম ওয়াংচুক হাসপাতালে ভর্তি থাকলেও তাঁর অনশনকে কেন্দ্র করে হাজার হাজার যুবকের সমাবেশে উত্তাল হয় দিল্লি।
- সংসদের দিকে মিছিল ঠেকাতে ব্যাপক ব্যারিকেড, পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষে বহু আহত; ৭০ জনকে আটক করা হয় বলে পুলিশের দাবি।
- আন্দোলনের ইতিহাসে প্রথমবার কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধির সঙ্গে বৈঠকে বসেন সিজেপি নেতারা; জে পি নাড্ডার সঙ্গে আলোচনা হলেও কোনও তাৎক্ষণিক সমাধান মেলেনি।
- সোনম ওয়াংচুক হাসপাতাল থেকেই অনশন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা করেন।
- আন্দোলনকারীদের দাবি, এটি শুধু এক্টিভ পরীক্ষা বা একজন মন্ত্রীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ নয়; দেশের শিক্ষা-ব্যবস্থার জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার লড়াই।
বাংলাস্ফিয়ার: দিল্লির সোমবারটি শুধু একটি রাজনৈতিক বিক্ষোভের দিন ছিল না। রাজধানীর প্রশস্ত সড়ক, কাঁটাতারের ব্যারিকেড, জলকামান, লাঠি, স্লোগান আর হাজার হাজার তরুণের মুখ—সব মিলিয়ে দিনটি যেন ভারতীয় গণতন্ত্রের এক বিরল পরীক্ষার মুহূর্ত হয়ে উঠল।
ভোর থেকেই যন্তর মন্তরের আশপাশে অস্বাভাবিক নিরাপত্তা। সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশন শুরু হওয়ায় গোটা লুটিয়েন্স দিল্লি কার্যত দুর্গে পরিণত হয়েছিল। বহুস্তরীয় ব্যারিকেড, অতিরিক্ত পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়। মেট্রোর কয়েকটি স্টেশনে প্রবেশ ও বেরোনোর উপরও বিধিনিষেধ জারি হয়। প্রশাসনের বার্তা ছিল স্পষ্ট—সংসদের দিকে কোনও মিছিল যেতে দেওয়া হবে না।
কিন্তু সেই প্রস্তুতির মুখোমুখি হয়েছিল অন্য এক দৃশ্য। সকাল গড়াতেই দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা ছাত্রছাত্রী, চাকরিপ্রার্থী এবং তরুণ-তরুণীরা যন্ত মন্তরে জমতে শুরু করেন। তাঁদের হাতে জাতীয় পতাকা, পোস্টার, পরীক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের দাবি এবং শিক্ষা মন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের স্লোগান।
এই আন্দোলনের কেন্দ্রীয় মুখ সোনম ওয়াংচুক অবশ্য সেখানে ছিলেন না। আদালতের নির্দেশ এবং চিকিৎসকদের পরামর্শে তাঁকে সফদরজং হাসপাতালে ভর্তি রাখা হয়েছিল। কিন্তু তাঁর অনশন আন্দোলনই যেন প্রতিবাদের নৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছিল। হাসপাতাল থেকেই তিনি জানিয়ে দেন, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগের প্রতিবাদে তিনি অনশন চালিয়ে যাবেন।
দুপুরের দিকে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। পূর্বঘোষিত “সংসদ চলো” কর্মসূচি অনুযায়ী আন্দোলনকারীরা ব্যারিকেডের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করেন। পুলিশের বক্তব্য, বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা করে এবং নিরাপত্তারক্ষীদের দিকে পাথর ছোড়ে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাঁদের দাবি, তারা শান্তিপূর্ণভাবে এগোচ্ছিল, পুলিশ বিনা প্ররোচনায় লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে।
বাস্তবতা যাই হোক, কয়েক মিনিটের মধ্যেই যন্তর মন্তরের আশপাশের এলাকা সংঘর্ষক্ষেত্রে পরিণত হয়। ব্যারিকেডের সামনে ধাক্কাধাক্কি, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, লাঠিচার্জ—সব মিলিয়ে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ে। দিল্লি পুলিশের দাবি, ১১৮ জন পুলিশকর্মী এবং প্রায় ৬০ জন আন্দোলনকারী আহত হয়েছেন। একই সঙ্গে ৭০ জনকে আটক করা হয়েছে। আন্দোলনকারীরা অবশ্য এই পরিসংখ্যান এবং পুলিশের অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
এই সংঘর্ষের মধ্যেই ঘটে দিনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা।
প্রায় এক মাস ধরে চলা আন্দোলনের পর প্রথমবার কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনার দরজা খোলে। সিজেপির প্রতিনিধিরা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জে পি নাড্ডার সঙ্গে বৈঠকে বসেন। আন্দোলনের তরফে তিনটি মূল দাবি তুলে ধরা হয়—সোনম ওয়াংচুকের মুক্তি, কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ এবং পরীক্ষা-সংক্রান্ত অনিয়ম ও আত্মহত্যার ঘটনাগুলিতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির জন্য আর্থিক ক্ষতিপূরণ।
বৈঠক শেষ হওয়ার পর আন্দোলনের নেতারা বলেন, সরকার তাঁদের কথা শুনেছে ঠিকই, কিন্তু কোনও সুনির্দিষ্ট আশ্বাস দেয়নি। ফলে আন্দোলন প্রত্যাহারের প্রশ্নই ওঠে না। ফলে অবস্থান এবং প্রতিবাদ কর্মসূচি চলবে।
এই আন্দোলনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক সম্ভবত তার সামাজিক চরিত্র। প্রচলিত রাজনৈতিক দলের পতাকার পরিবর্তে এখানে চোখে পড়েছে ছাত্রছাত্রী, পরীক্ষার্থী, সদ্য স্নাতক, বেকার যুবক-যুবতীদের উপস্থিতি। অনেকেই প্রথমবার কোনও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে পরীক্ষা ফাঁস, নিয়োগে অনিয়ম, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রতি আস্থা হারানো এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা।
এই কারণেই আন্দোলনটি কেবল একটি সংগঠনের কর্মসূচি হয়ে থাকেনি। এটি ধীরে ধীরে শিক্ষাব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে জাতীয় বিতর্কে পরিণত হয়েছে। সোনম ওয়াংচুকের অনশন সেই ক্ষোভকে একটি নৈতিক ভাষা দিয়েছে।
সরকারও পরিস্থিতির রাজনৈতিক গুরুত্ব উপলব্ধি করেছে বলেই মনে হচ্ছে। একদিকে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা, অন্যদিকে একই দিনে আলোচনায় বসার সিদ্ধান্ত—দুটি পদক্ষেপ যেন পাশাপাশি চলেছে। এতে স্পষ্ট, সরকার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি আন্দোলনের রাজনৈতিক অভিঘাতও বিবেচনায় রাখতে বাধ্য হয়েছে।
অন্যদিকে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি এই ঘটনাকে গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরেছে। বিভিন্ন বিরোধী নেতা পুলিশের ভূমিকার সমালোচনা করেন এবং সংসদের ভিতরেও বিষয়টি তোলার ইঙ্গিত দেন। পাশাপাশি নাগরিক সমাজের একাংশও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকারের পক্ষে সরব হয়েছে।
দিনের শেষে দিল্লির আকাশে ধোঁয়া মিলিয়ে গিয়েছিল, ব্যারিকেডের সামনে ভিড়ও কমে এসেছিল। কিন্তু প্রশ্নগুলো থেকে গিয়েছিল।
শুধু একজন মন্ত্রীর পদত্যাগ কি এই আন্দোলনের লক্ষ্য? নাকি এটি এমন এক প্রজন্মের ক্ষোভ, যারা মনে করছে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার স্বচ্ছতা, কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং রাষ্ট্রের জবাবদিহি—সবকিছুই নতুন করে পর্যালোচনার প্রয়োজন?
সোমবারের ঘটনাপ্রবাহ হয়তো তার উত্তর দেয়নি। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে—এই আন্দোলনকে আর কেবল প্রান্তিক প্রতিবাদ বলে উড়িয়ে দেওয়া কঠিন। সরকার প্রথমবার আলোচনায় বসেছে, কিন্তু রাস্তাও এখনও ফাঁকা হয়নি। হাসপাতালের শয্যায় সোনম ওয়াংচুক অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন, আর জন্তর মন্তরে তাঁর সমর্থকেরা বলছেন, লড়াই এখনও শেষ হয়নি।