হাইলাইটস:
- রাশিয়ার তেল কেনার অভিযোগে ভারত-সহ পাঁচ দেশের বিরুদ্ধে ১০০% পর্যন্ত শুল্ক আরোপের প্রস্তাব।
- রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট—দুই দলের সেনেটরদের যৌথ উদ্যোগে নতুন বিল।
- ইউক্রেন যুদ্ধ থামাতে মস্কোর জ্বালানি আয়ে আঘাত হানাই মূল লক্ষ্য। আগের ৫০০% শুল্কের প্রস্তাব নরম করে সর্বোচ্চ ১০০% করা হয়েছে।
- আগস্টের আগেই বিলটি পাস করানোর চেষ্টা চলছে।
বাংলাস্ফিয়ার: রাশিয়ার কাছ থেকে অপরিশোধিত তেল কেনা অব্যাহত রাখায় ভারত-সহ পাঁচটি দেশের বিরুদ্ধে কঠোর বাণিজ্যিক ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে আমেরিকার একদল সেনেটর। রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট—দুই দলের সদস্যদের যৌথভাবে আনা নতুন একটি বিলে ভারত, চিন, স্লোভাকিয়া, হাঙ্গেরি এবং আজারবাইজানের রপ্তানির ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
মঙ্গলবার মার্কিন সেনেটে উত্থাপিত এই বিলের লক্ষ্য রাশিয়ার জ্বালানি রপ্তানি থেকে আয় কমিয়ে ইউক্রেন যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার আর্থিক সক্ষমতায় আঘাত হানা। আমেরিকার আইনপ্রণেতাদের মতে, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও রাশিয়া তেল বিক্রি করে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে এবং সেই অর্থ যুদ্ধ পরিচালনায় ব্যবহার করছে। তাই রুশ তেল কেনা দেশগুলোর ওপর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করাই এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য।
নতুন বিলটি আসলে ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে উত্থাপিত ‘স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যাক্ট’-এর সংশোধিত ও তুলনামূলকভাবে নমনীয় সংস্করণ। আগের প্রস্তাবে ভারত-সহ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর ওপর ৫০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু সেই বিল সেনেটে ভোটাভুটির পর্যায়ে পৌঁছতে পারেনি। এবার শুল্কের সর্বোচ্চ সীমা ১০০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে, যাতে আইনটি পাস হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।
প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী, কোন দেশের ওপর কত শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে, তা নির্ধারণ করবে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি দপ্তর (ইউএসটিআর)। অর্থাৎ, সব দেশের ক্ষেত্রে একই হারে শুল্ক আরোপ বাধ্যতামূলক নয়; সংশ্লিষ্ট দেশের পরিস্থিতি, রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যের পরিমাণ এবং মার্কিন কূটনৈতিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে হার নির্ধারণ করা হতে পারে।
বিলটির সমর্থক সেনেটরদের দাবি, আগামী আগস্টের মধ্যেই এটি কংগ্রেসে পাস করানোর চেষ্টা চলছে। ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় রাশিয়ার বিরুদ্ধে আরও কার্যকর অর্থনৈতিক চাপ তৈরির প্রয়োজনীয়তা থেকেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে তাঁদের বক্তব্য।
ভারতের ক্ষেত্রে বিষয়টি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল তুলনামূলকভাবে কম দামে পাওয়া যায়। সেই সুযোগে ভারত রাশিয়া থেকে তেল আমদানি উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করে। বর্তমানে ভারতের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানির একটি বড় অংশই রাশিয়া থেকে আসে। নয়াদিল্লির অবস্থান স্পষ্ট—দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষাই তাদের অগ্রাধিকার এবং আন্তর্জাতিক বাজারে সবচেয়ে লাভজনক উৎস থেকেই তেল কেনা হবে।
ভারত বারবার জানিয়েছে, তারা কোনও একক দেশের নিষেধাজ্ঞা নয়, বরং আন্তর্জাতিক আইন ও নিজেদের জাতীয় স্বার্থকে গুরুত্ব দেয়। একই সঙ্গে ভারত রাশিয়া ও ইউক্রেন—উভয় পক্ষের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় রেখে শান্তিপূর্ণ সমাধানের পক্ষেও অবস্থান নিয়েছে।
এদিকে, মার্কিন প্রশাসনের মধ্যেও এ ধরনের পদক্ষেপ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। একদিকে কংগ্রেসের একাংশ রাশিয়ার বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা চাইলেও, অন্যদিকে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করলে ভারত ও চিনের মতো গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর তার প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিলটি আইনে পরিণত হলেও তাৎক্ষণিকভাবে শুল্ক কার্যকর হবে কি না, কিংবা কোন দেশের ক্ষেত্রে কতটা প্রয়োগ করা হবে, তা নির্ভর করবে হোয়াইট হাউসের নীতি, মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির সিদ্ধান্ত এবং সামগ্রিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর।
তবে এই উদ্যোগ স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, ইউক্রেন যুদ্ধ ঘিরে রাশিয়ার বিরুদ্ধে চাপ বাড়াতে এখন কেবল মস্কো নয়, রুশ তেল ক্রেতা দেশগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করতে চাইছে আমেরিকার একাংশ। ভারতসহ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে ওয়াশিংটনের বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ দিক নির্ধারণে এই বিল গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।