হাইলাইটস:
- কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার তদন্তাধীন মামলায় হাত দিতে পারবে না কমিশন।
- অন্য কোনও আইনসিদ্ধ কমিশনের বিবেচনাধীন অভিযোগও তদন্তের বাইরে।
- এসএসসি, প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ, গরু পাচার, কয়লা পাচার-সহ একাধিক বহুল আলোচিত মামলা কমিশনের আওতায় নয়।
- কমিশনের লক্ষ্য নতুন করে ফৌজদারি তদন্ত নয়, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির অনুসন্ধান।
- এখনও কেন্দ্রীয় সংস্থার হাতে না-যাওয়া অভিযোগই কমিশনের প্রধান কর্মক্ষেত্র হতে পারে।
বাংলাস্ফিয়ার: পশ্চিমবঙ্গ সরকার গঠিত নতুন প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি অনুসন্ধান কমিশন নিয়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ, গেজেট বিজ্ঞপ্তিতে কমিশনের তদন্তের পরিধি অত্যন্ত বিস্তৃত বলে মনে হলেও, একই বিজ্ঞপ্তিতে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত রাখা হয়েছে, যার ফলে বহু আলোচিত দুর্নীতির মামলা কার্যত কমিশনের আওতার বাইরে চলে যাচ্ছে।
গেজেটের ৪(ঝ) ধারায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, যে সব অভিযোগ বা মামলা ইতিমধ্যেই অন্য কোনও আইনসিদ্ধ কমিশনের বিবেচনাধীন অথবা কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার তদন্তাধীন, সেগুলি এই কমিশন বিবেচনা করবে না। অর্থাৎ কমিশনের ক্ষমতা যতই বিস্তৃত হোক, সিবিআই, এনআইএ বা অন্য কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার হাতে থাকা মামলায় তারা সমান্তরাল তদন্ত চালাতে পারবে না।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে মামলাগুলি কমিশনের আওতায় আসছে না, তার মধ্যে প্রথমেই রয়েছে স্কুল সার্ভিস কমিশন (এসএসসি) নিয়োগ দুর্নীতি মামলা। গত কয়েক বছরে পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে আলোচিত এই মামলায় সিবিআই তদন্ত করছে। বেআইনি নিয়োগ, ওএমআর শিটে কারচুপি, মেধাতালিকা বদল, প্রভাব খাটিয়ে চাকরি দেওয়ার অভিযোগে একাধিক চার্জশিট দাখিল হয়েছে এবং বিচারও চলছে। ফলে এই মামলায় নতুন কমিশন কোনও তদন্ত করতে পারবে না।
একইভাবে প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ (টেট) দুর্নীতি-সংক্রান্ত মামলাও কমিশনের বাইরে থাকবে। এই মামলাতেও আদালতের নির্দেশে সিবিআই তদন্ত করছে। ফলে কমিশনের এখতিয়ার সেখানে প্রযোজ্য হবে না।
দার্জিলিং ও কালিম্পং অঞ্চলের গোরখাল্যান্ড টেরিটোরিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (জিটিএ) শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি-ও সিবিআইয়ের তদন্তাধীন। ফলে সেটিও কমিশনের আওতার বাইরে।
শুধু নিয়োগ নয়, বহুল আলোচিত গরু পাচার মামলা-ও কমিশন তদন্ত করতে পারবে না। সীমান্ত পেরিয়ে সংঘবদ্ধ গরু পাচারের অভিযোগে সিবিআই বহু বছর ধরে তদন্ত করছে। এই মামলায় একাধিক রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী এবং সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে তদন্ত হয়েছে। গেজেটের শর্ত অনুযায়ী এই মামলা কমিশনের তদন্তযোগ্য নয়।
একইভাবে কয়লা পাচার মামলা-ও কমিশনের আওতার বাইরে থাকবে। পূর্বাঞ্চলের কয়লা পাচার চক্র নিয়ে সিবিআই দীর্ঘদিন ধরে তদন্ত করছে। এই মামলায় বহু চার্জশিট দাখিল হয়েছে এবং তদন্ত এখনও চলমান। ফলে কমিশনের এখতিয়ার সেখানে নেই।
শারদা চিটফান্ড এবং রোজ ভ্যালি চিটফান্ড-সংক্রান্ত তদন্তও কমিশন হাতে নিতে পারবে না। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে বহু বছর আগে এই তদন্ত সিবিআইয়ের হাতে গিয়েছিল। যদিও অনেক ক্ষেত্রে বিচারপর্ব চলছে, তবুও সেগুলি কেন্দ্রীয় তদন্তাধীন মামলা হিসেবেই বিবেচিত হবে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, গেজেটে ব্যবহৃত “Central Investigation Agencies” শব্দবন্ধটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর অর্থ কেবল সিবিআই নয়; অন্য কোনও কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাও যদি কোনও মামলার তদন্ত করে, তবে সেই বিষয়েও কমিশন হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। ফলে একই বিষয়ে দ্বৈত তদন্তের সম্ভাবনা কার্যত বন্ধ করা হয়েছে।
তবে এখানেই একটি সূক্ষ্ম আইনি প্রশ্নও রয়েছে। গেজেটে বলা হয়েছে কমিশন “cases or complaints” অর্থাৎ নির্দিষ্ট মামলা বা অভিযোগ গ্রহণ করবে না। কিন্তু কমিশনের মূল দায়িত্ব হল প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির চরিত্র ও প্রশাসনিক ব্যর্থতা অনুসন্ধান করা। ফলে কোনও নির্দিষ্ট ফৌজদারি মামলার তদন্ত না করেও, সেই ঘটনার পেছনে প্রশাসনিক দুর্বলতা, নীতিগত ব্যর্থতা বা কাঠামোগত ত্রুটি নিয়ে কমিশন পর্যবেক্ষণ করতে পারে কি না, তা ভবিষ্যতে আদালতে ব্যাখ্যার বিষয় হতে পারে।
গেজেটে আরও একটি নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। যদি কোনও অভিযোগ ইতিমধ্যেই অন্য কোনও আইনসিদ্ধ কমিশনের বিবেচনাধীন থাকে, তাহলেও নতুন কমিশন সেটি নেবে না। অর্থাৎ জাতীয় বা রাজ্য স্তরের কোনও বৈধ তদন্ত কমিশন, মানবাধিকার কমিশন, মহিলা কমিশন, তফসিলি জাতি কমিশন বা অন্য কোনও আইনসিদ্ধ সংস্থা যদি কোনও অভিযোগের তদন্ত করে, তবে সেই একই অভিযোগ নিয়ে নতুন কমিশন আলাদা অনুসন্ধান করবে না।
তাহলে কমিশনের কাজ কী?
গেজেটের ভাষা অনুযায়ী, কমিশনের মূল লক্ষ্য হবে এমন সব অভিযোগের তদন্ত, যেগুলি এখনও কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার হাতে যায়নি। যেমন—অ্যাম্ফান পুনর্বাসনে অনিয়ম, প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার অর্থ বণ্টন, ১০০ দিনের কাজে দুর্নীতি, মিড-ডে মিল, সরকারি হাসপাতালে অনিয়ম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক দুর্নীতি, সরকারি দপ্তরে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে স্বজনপোষণ, বেআইনি নির্মাণে প্রশাসনিক মদত, মিথ্যা মামলা, গ্রেফতারের ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সরকারি অর্থের অপচয় বা তছরুপের অভিযোগ।
অর্থাৎ এই কমিশন সিবিআইয়ের সমান্তরাল তদন্তকারী সংস্থা নয়। বরং যে ক্ষেত্রগুলিতে এখনও কোনও কেন্দ্রীয় তদন্ত শুরু হয়নি, সেই প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির অভিযোগ খতিয়ে দেখা, প্রয়োজনে এফআইআর দায়েরের সুপারিশ করা এবং প্রশাসনিক সংস্কারের প্রস্তাব দেওয়াই কমিশনের প্রধান উদ্দেশ্য।
রাজনৈতিকভাবেও এই সীমারেখা তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, রাজ্যের সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত দুর্নীতির মামলাগুলির অনেকগুলিই ইতিমধ্যেই সিবিআইয়ের হাতে রয়েছে। ফলে কমিশনের তদন্তের কেন্দ্রবিন্দু হবে অন্য ক্ষেত্রগুলি। এর ফলে একদিকে যেমন দ্বৈত তদন্তের সম্ভাবনা কমবে, অন্যদিকে কমিশনের কার্যকারিতা অনেকটাই নির্ভর করবে তারা নতুন অভিযোগ কতটা কার্যকরভাবে চিহ্নিত ও অনুসন্ধান করতে পারে তার উপর।
আইনজ্ঞদের একাংশের মতে, গেজেটে এই বিধান অন্তর্ভুক্ত করার উদ্দেশ্য হল তদন্তকারী সংস্থাগুলির মধ্যে এখতিয়ার-সংক্রান্ত সংঘাত এড়ানো। তবে ভবিষ্যতে কোনও নির্দিষ্ট বিষয় “তদন্তাধীন মামলা” নাকি “প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার অনুসন্ধান”—এই প্রশ্নে আইনি বিতর্ক তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। ফলে কমিশনের প্রকৃত ক্ষমতার পরিধি শেষ পর্যন্ত অনেকটাই নির্ভর করবে তাদের কার্যপদ্ধতি এবং আদালতের ব্যাখ্যার উপর।