Table of Contents
হাইলাইটস
- সেমিফাইনালকে শুধু ফুটবল ম্যাচ বলতে চাইলেও ইতিহাসের ভার এড়াতে পারছেন না লিওনেল স্কালোনি।
- ফকল্যান্ডস (মালভিনাস) যুদ্ধের স্মৃতি এখনও আর্জেন্টিনার ফুটবল সংস্কৃতির গভীরে প্রোথিত।
- মারাদোনার উত্তরাধিকার, সমর্থকদের আবেগ এবং মেসির প্রথম ইংল্যান্ড ম্যাচ—সব মিলিয়ে অনন্য এক বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল।
সুইজারল্যান্ডের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত সময়ের নাটকীয় জয়ের পর মাঠ ছাড়তে না ছাড়তেই আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনিকে সামনে অপেক্ষা করা সেমিফাইনাল নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড—যে নামটি ফুটবলের বাইরেও দুই দেশের সম্পর্কের ইতিহাস বহন করে।এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিলেন, এই ম্যাচ কি শুধু ফুটবলের নয়, আবেগেরও লড়াই? স্কালোনি মাঝপথেই তাঁকে থামিয়ে দেন।“এটা একটা ফুটবল ম্যাচ, ঠিক আছে? অন্য কিছু খুঁজবেন না। এটা শুধু ফুটবল ম্যাচ।”
কথাগুলো ছিল সংক্ষিপ্ত, দৃঢ় এবং কিছুটা বিরক্তির সুরে।চার দশক আগে, ১৯৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালের আগে দিয়েগো মারাদোনাও প্রায় একই কথা বলেছিলেন। ফকল্যান্ডস যুদ্ধের মাত্র চার বছর পর ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ম্যাচের আগে সাংবাদিকরা সেটিকে যুদ্ধের প্রতিশোধ হিসেবে তুলে ধরছিলেন। মারাদোনা তখনও বলেছিলেন, “এটা শুধু একটা ম্যাচ।”কিন্তু তাঁর সতীর্থদের স্মৃতিচারণ অন্য গল্প বলে।প্রয়াত ডিফেন্ডার হোসে লুইস ব্রাউন এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, মাঠে নামার আগে টানেলের ভিতরে হঠাৎ মারাদোনা বদলে যান।তিনি সতীর্থদের উদ্দেশে বলেন, “চলো, ওরা আমাদের প্রতিবেশীদের মেরেছে, আমাদের আত্মীয়দের মেরেছে।”জাতীয় সঙ্গীত শেষ হওয়ার পর আর কোনও কথা হয়নি। কিন্তু প্রত্যেকেই বুঝেছিলেন, ম্যাচটি শুধুমাত্র ফুটবল নয়।
ইতিহাস এখনও জীবন্ত
ইংল্যান্ডের কাছে ফকল্যান্ডস যুদ্ধ আজ অনেকটাই অতীত। কিন্তু আর্জেন্টিনায় সেই সংঘাত এখনও জাতীয় স্মৃতির অংশ। সেখানে দ্বীপপুঞ্জের নাম মালভিনাস। ১৯৮২ সালের ৭৪ দিনের যুদ্ধে ৬৪৯ জন আর্জেন্টাইন, ২৫৫ জন ব্রিটিশ সেনা এবং তিনজন দ্বীপবাসীর মৃত্যু হয়েছিল।
সেই ক্ষত আজও রাজনীতি, শিক্ষা, সংবাদমাধ্যম এবং ফুটবলের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে যায়।
মারাদোনা এখনও সর্বত্র
২০২৬ বিশ্বকাপেও গ্যালারিতে সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে দিয়েগো মারাদোনার ছবি। কখনও লিওনেল মেসির পাশে, কখনও একাই।সমর্থকদের হাতে পতাকা, ব্যানার, টি-শার্ট—সবখানেই তাঁর উপস্থিতি।সামাজিক মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি এক জনপ্রিয় ছবিতে দেখা যাচ্ছে, স্বর্গে যিশু খ্রিস্টের পাশে হাঁটছেন মেসি ও মারাদোনা। এই ধরনের ভক্তি ফুটবল ইতিহাসে আর কোনও খেলোয়াড়কে ঘিরে দেখা যায়নি।
মারাদোনার ইংল্যান্ডবিরোধী বক্তব্যও নতুন করে ভাইরাল হচ্ছে। ১৯৮৬ সালের দ্বিতীয় গোল উদ্যাপনের ছবি, “হ্যান্ড অব গড”-এর স্মৃতি, কিংবা তাঁর সেই বিখ্যাত মন্তব্য—“আমি শুধু বুট পরে খেলিনি, রাইফেল নিয়েও নেমেছিলাম”—সবই নতুন প্রজন্মের সামনে আবার ফিরে এসেছে।এমনকি ২০১৮ বিশ্বকাপ কিংবা ১৯৬৬ বিশ্বকাপ নিয়েও ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে তাঁর অভিযোগের ভিডিওগুলোও ঘুরছে সামাজিক মাধ্যমে।
খেলোয়াড়দের গানেও মালভিনাস
শুধু সমর্থক নন, বর্তমান আর্জেন্টিনা দলও ইতিহাসকে সঙ্গে নিয়েই এগোচ্ছে।মিশরকে হারিয়ে শেষ ষোলোয় ওঠার পর ড্রেসিংরুমে ফুটবলাররা ‘লা কুয়ার্তা এস্ত্রেয়া’ (চতুর্থ তারকা) গানটি গেয়েছিলেন।গানের কথায় রয়েছে—“আমি জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত আর্জেন্টাইন। মালভিনাসের জন্য, দিয়েগোর জন্য, লিওর শেষ বিশ্বকাপের জন্য—আর্জেন্টিনা, তোমাকে আবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হতে দেখতে চাই।”মার্চ মাসেই গানটি প্রকাশিত হয়েছিল, যখন কেউ জানত না যে বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা মুখোমুখি হবে। তবুও মালভিনাস ও মারাদোনার উল্লেখ ছিল তার কেন্দ্রে।
ক্লান্ত কিন্তু অনুপ্রাণিত আর্জেন্টিনা
মাত্র এক সপ্তাহে ২৪০ মিনিট ফুটবল খেলেছে আর্জেন্টিনা। শেষ দুটি ম্যাচেই তারা অতিরিক্ত সময়ে জিতেছে। টুর্নামেন্টে এখনও পর্যন্ত নিজেদের সেরা ফুটবল খেলতে পারেনি স্কালোনির দল। অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের উপর নির্ভরতা স্পষ্ট, আর দু’বার প্রায় বিদায়ের মুখেও পড়েছিল তারা।তবু ইতিহাস, আবেগ এবং সমর্থকদের বিশ্বাস হয়তো এই দলের বাড়তি শক্তি।
মেসির প্রথম ইংল্যান্ড ম্যাচ
বুধবারের সেমিফাইনাল আরেকটি কারণেও বিশেষ। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে এই প্রথম ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে খেলবেন লিওনেল মেসি।২০০৫ সালে প্রথম সুযোগ থাকলেও লাল কার্ডজনিত নির্বাসনের কারণে খেলতে পারেননি তিনি।সুইজারল্যান্ড ম্যাচের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নে মেসি বলেন,“এটা বিশেষ ম্যাচ, কারণ প্রথমবার ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে খেলব। প্রায় সব বড় দলের বিরুদ্ধেই খেলেছি, শুধু ইংল্যান্ড বাদে। তারা বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম শক্তিধর দল। বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে তাদের মুখোমুখি হওয়া অবশ্যই রোমাঞ্চকর।”শান্ত, পরিমিত এবং কূটনৈতিক উত্তর।কিন্তু আর্জেন্টিনায় খুব কম মানুষই বিশ্বাস করেন যে এই ম্যাচ শুধুই ফুটবল।যেমন স্কালোনির কথা সবাই বিশ্বাস করেননি, তেমনই ১৯৮৬-তে মারাদোনাকেও করেনি কেউ।আর আজ, মেসিকেও নয়।