হাইলাইটস:

  • নিট-ইউজি ২০২৭ একদিনে নয়, পাঁচ থেকে ছয় দিন ধরে নেওয়ার পরিকল্পনা।
  • দেশজুড়ে প্রায় এক হাজার পরীক্ষাকেন্দ্রে পর্যায়ক্রমে পরীক্ষা আয়োজনের প্রস্তুতি।
  • প্রশ্নপত্র ফাঁস ও পরীক্ষা পরিচালনায় অনিয়ম ঠেকাতে এনটিএ-র কাঠামোয় ‘উপর থেকে নিচ পর্যন্ত’ সংস্কার।
  • পরীক্ষার নিরাপত্তা, প্রযুক্তি, কর্মী নিয়োগ ও জবাবদিহিতে একাধিক নতুন ব্যবস্থা।
  • কেন্দ্রের লক্ষ্য, দেশের বৃহত্তম প্রবেশিকা পরীক্ষাকে আরও স্বচ্ছ, নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য করে তোলা।

বাংলাস্ফিয়ার: ভারতের সবচেয়ে বড় প্রবেশিকা পরীক্ষা নিট-ইউজি-র ধরনেই বড় পরিবর্তনের পথে কেন্দ্র। ২০২৭ সাল থেকে একদিনে পরীক্ষা নেওয়ার বদলে পাঁচ থেকে ছয় দিন ধরে পর্যায়ক্রমে নিট-ইউজি আয়োজনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। দেশজুড়ে প্রায় এক হাজার পরীক্ষাকেন্দ্রে এই পরীক্ষা নেওয়া হতে পারে। একই সঙ্গে জাতীয় পরীক্ষা সংস্থা (এনটিএ)-র প্রশাসনিক ও কারিগরি কাঠামোয় ‘টপ টু বটম’ বা উপর থেকে নিচ পর্যন্ত সংস্কারের রূপরেখাও তৈরি হচ্ছে। লক্ষ্য একটাই— প্রশ্নপত্র ফাঁস, নিরাপত্তার গাফিলতি এবং পরীক্ষা পরিচালনায় অনিয়মের পুনরাবৃত্তি যাতে আর না ঘটে।

২০২৪ সালের নিট-ইউজি বিতর্কের পর থেকেই এনটিএ-র কাজকর্ম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। প্রশ্নপত্র ফাঁস, গ্রেস মার্কস বিতর্ক এবং একাধিক রাজ্যে অনিয়মের অভিযোগের জেরে কেন্দ্র সরকার সংস্থাটির কার্যপ্রণালী পুনর্বিবেচনার সিদ্ধান্ত নেয়। তার পর থেকেই পরীক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং আরও সুরক্ষিত করার জন্য একাধিক বিশেষজ্ঞ কমিটি কাজ শুরু করে। সেই প্রক্রিয়ারই পরবর্তী ধাপ হিসেবে সামনে এসেছে ২০২৭ সালের নতুন পরিকল্পনা।

সরকারি সূত্রের মতে, একদিনে প্রায় ২৫ লক্ষের বেশি পরীক্ষার্থীর পরীক্ষা নেওয়া এখন ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে। এত বিপুল সংখ্যক পরীক্ষার্থী, হাজার হাজার পরীক্ষা কক্ষ, লক্ষাধিক পরীক্ষাকর্মী এবং বিপুল নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে কোনও একটি জায়গায় সামান্য গাফিলতিও গোটা পরীক্ষার বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিতে পারে। সেই কারণেই পরীক্ষার্থীদের কয়েকটি ভাগে ভাগ করে আলাদা দিনে পরীক্ষা নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।

নতুন ব্যবস্থায় প্রতিদিন নির্দিষ্ট সংখ্যক পরীক্ষার্থী পরীক্ষা দেবেন। প্রতিটি দিনে আলাদা প্রশ্নপত্র থাকবে, তবে প্রশ্নগুলির কঠিনতার মাত্রা সমান রাখার জন্য উন্নত পরিসংখ্যানভিত্তিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হবে। পরীক্ষার ফল তৈরির সময়ও সেই অনুযায়ী নম্বরের সামঞ্জস্য রক্ষা করা হবে, যাতে কোনও পরীক্ষার্থী অন্য দিনের তুলনায় সুবিধা বা অসুবিধার মুখে না পড়েন।

পরীক্ষাকেন্দ্রের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে ব্যবহৃত কেন্দ্রগুলির পাশাপাশি নতুন প্রতিষ্ঠানগুলিকেও পরীক্ষাকেন্দ্র হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে। প্রত্যেক কেন্দ্রের পরিকাঠামো, নজরদারি ব্যবস্থা, ইন্টারনেট নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং কর্মীদের প্রশিক্ষণের জন্য নির্দিষ্ট মানদণ্ড তৈরি করা হচ্ছে। যেসব কেন্দ্র সেই মান পূরণ করতে পারবে না, তাদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হবে।

এনটিএ-র প্রশাসনিক কাঠামোতেও বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে। প্রশ্নপত্র তৈরি, সংরক্ষণ, পরিবহণ, পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছে দেওয়া, পরীক্ষা পরিচালনা এবং মূল্যায়ন— প্রতিটি স্তরে পৃথক নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। দায়িত্ব নির্ধারণ, কর্মীদের জবাবদিহি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞ ও প্রযুক্তিবিদদেরও স্থায়ীভাবে সংস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হতে পারে।

নিরাপত্তা ব্যবস্থাও আগের তুলনায় অনেক বেশি কঠোর করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রশ্নপত্রের ডিজিটাল সুরক্ষা, এনক্রিপশন, বহুস্তরীয় অনুমোদন ব্যবস্থা, পরীক্ষাকেন্দ্রে প্রবেশের আগে পরিচয় যাচাই, সর্বক্ষণ নজরদারি এবং সন্দেহজনক কার্যকলাপ চিহ্নিত করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার— সবকিছুই বিবেচনায় রয়েছে। কেন্দ্রের বিশ্বাস, প্রযুক্তির আরও কার্যকর ব্যবহার করলে প্রশ্নপত্র ফাঁস বা অন্য কোনও ধরনের কারচুপির সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে।

পরীক্ষা পরিচালনায় যুক্ত কর্মীদের নির্বাচন ও প্রশিক্ষণেও পরিবর্তন আসবে। পরীক্ষাকেন্দ্রের পর্যবেক্ষক, কেন্দ্র-সুপারিনটেনডেন্ট এবং অন্যান্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীদের জন্য বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ চালুর কথা ভাবা হচ্ছে। দায়িত্ব পালনে গাফিলতি বা অনিয়ম ধরা পড়লে কঠোর শাস্তির বিধানও আরও স্পষ্ট করা হবে।

শুধু প্রশাসনিক সংস্কার নয়, পরীক্ষার্থীদের সুবিধার দিকেও নজর দেওয়া হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে পরীক্ষা হলে একদিনে বিপুল ভিড়ের চাপ কমবে। পরীক্ষাকেন্দ্রে প্রবেশ, নিরাপত্তা পরীক্ষা এবং পরীক্ষা-পরবর্তী ব্যবস্থাপনাও তুলনামূলকভাবে সহজ হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপর চাপও কমবে।

তবে বহু দিনে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্তের সঙ্গে কিছু নতুন চ্যালেঞ্জও থাকবে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, বিভিন্ন দিনের প্রশ্নপত্রের কঠিনতার মাত্রা কীভাবে সমান রাখা হবে। এছাড়া পরীক্ষার দিনগুলির মধ্যে প্রশ্ন ফাঁস বা তথ্য আদানপ্রদানের সম্ভাবনাও সম্পূর্ণ উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাই নিরাপত্তা এবং মূল্যায়নের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিই এই নতুন ব্যবস্থার সাফল্যের মূল চাবিকাঠি হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রক এখনও এই পরিকল্পনার পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকা প্রকাশ করেনি। তবে প্রস্তুতি ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। আগামী কয়েক মাসে পরীক্ষার নতুন কাঠামো, সময়সূচি, মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিস্তারিত নির্দেশিকা প্রকাশ করা হতে পারে।

ভারতের চিকিৎসা শিক্ষায় প্রবেশের একমাত্র বৃহৎ প্রবেশিকা হিসেবে নিট-ইউজি-র গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ ছাত্রছাত্রীর ভবিষ্যৎ এই পরীক্ষার উপর নির্ভর করে। ফলে শুধু পরীক্ষা নেওয়াই নয়, সেই পরীক্ষার উপর সাধারণ মানুষের আস্থা বজায় রাখাও সরকারের কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ। সেই লক্ষ্যেই এনটিএ-কে নতুনভাবে গড়ে তোলার এবং নিট-ইউজি-কে আরও নিরাপদ, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর পরীক্ষায় পরিণত করার উদ্যোগ শুরু হয়েছে। ২০২৭ সাল থেকে সেই পরিবর্তনের বাস্তব রূপ দেখা যেতে পারে।