হাইলাইটস
- নির্বাচন কমিশনের কাছে বিশদ জবাব জমা দিয়ে তৃণমূলের সাংগঠনিক কমিটির বৈধতা ২০২৭ পর্যন্ত বলেই দাবি করল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শিবির।
- দলের সংবিধান সংশোধনের ভিত্তিতে ২০২২ সালে নির্বাচিত কমিটির মেয়াদ পাঁচ বছর—এই যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে।
- ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর দাবি ‘তথ্যগতভাবে ভুল’ এবং ‘দলীয় সংবিধানবিরোধী’ বলে অভিযোগ।
- বিদ্রোহী শিবিরের ২২ জুনের ‘বিশেষ অধিবেশন’কে অবৈধ ও প্রতারণামূলক বলে কমিশনের কাছে দাবি করেছে মমতা শিবির।
তৃণমূল কংগ্রেসের প্রকৃত নেতৃত্ব ও দলীয় প্রতীকের অধিকার নিয়ে চলা সংঘাতের মধ্যে নির্বাচন কমিশনের সামনে নিজেদের অবস্থান আরও জোরালোভাবে তুলে ধরল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন শিবির। কমিশনের কাছে জমা দেওয়া একটি বিশদ জবাবে তারা দাবি করেছে, দলের সর্বভারতীয় কমিটি এবং জাতীয় কার্যনির্বাহী কমিটির মেয়াদ ২০২৭ সাল পর্যন্ত বৈধ। ফলে ২০২৫ সালেই কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছে বলে বিদ্রোহী শিবির যে দাবি করছে, তার কোনও সাংগঠনিক বা আইনি ভিত্তি নেই।
নয়াদিল্লিতে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠকের পরে সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় সাংবাদিকদের জানান, বিদ্রোহী গোষ্ঠীর জমা দেওয়া দাবিপত্রের প্রতিটি বক্তব্যের জবাব দিয়ে কমিশনের কাছে একটি বিস্তারিত নথি পেশ করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, দলের সংবিধানে প্রথমে তিন বছর থেকে চার বছর এবং পরে ২০০৬ সালে পাঁচ বছরের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়। সেই সংশোধনের কথা নির্বাচন কমিশনকে যথাসময়ে জানানোও হয়েছিল। ফলে ২০২২ সালের সাংগঠনিক নির্বাচনের ভিত্তিতে বর্তমান কমিটির মেয়াদ ২০২৭ সাল পর্যন্ত বহাল থাকবে।
মমতা শিবিরের অন্যতম বড় যুক্তি, বিদ্রোহী নেতারাই ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন এবং দলনেত্রীর স্বাক্ষরিত মনোনয়নপত্র ব্যবহার করেছেন। এখন যদি তাঁরাই দাবি করেন যে ২০২৫ সালের পর দলীয় সংগঠন আর বৈধ ছিল না, তাহলে তাঁদের নিজের নির্বাচনী লড়াইও প্রশ্নের মুখে পড়ে। এই অবস্থানকে ‘স্ববিরোধী’ বলেই কমিশনের সামনে তুলে ধরা হয়েছে।
জবাবে আরও বলা হয়েছে, বিদ্রোহী শিবির ২২ জুন যে বিশেষ অধিবেশন ডেকে নতুন সংগঠন গঠনের দাবি করেছে, তা দলীয় সংবিধান অনুযায়ী নয়। তৃণমূলের সাংগঠনিক কাঠামো অনুযায়ী প্রথমে ব্লক, তারপর জেলা, তার পরে রাজ্য স্তরের সংগঠন গঠনের মধ্য দিয়ে সর্বভারতীয় কমিটি তৈরি হয়। এই পুরো প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি বলেই অভিযোগ। পাশাপাশি সাংসদ, বিধায়ক এবং অন্যান্য পদাধিকারীদের যথাযথ নোটিসও দেওয়া হয়নি বলে দাবি করেছে মমতা শিবির।
কমিশনের কাছে জমা দেওয়া নথিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, দলের সংবিধান সংশোধন এবং সাংগঠনিক কাঠামোর পরিবর্তন সম্পর্কে নির্বাচন কমিশন অতীতেও অবহিত ছিল এবং কখনও আপত্তি জানায়নি। চলতি বছরও কমিশনের কাছে সংশোধিত সংবিধানের অনুলিপি জমা দেওয়া হয়েছে। তাই বর্তমান কমিটি অবৈধ—এই দাবি তথ্যগত ও আইনগতভাবে টেকে না বলেই মমতা শিবিরের বক্তব্য।
এদিকে বিদ্রোহী শিবিরের অভিযোগ, বর্তমান নেতৃত্বের সাংগঠনিক বৈধতা শেষ হয়ে যাওয়ায় তারাই প্রকৃত তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিনিধিত্ব করছে। সেই দাবির ভিত্তিতেই তারা নির্বাচন কমিশনের কাছে দলীয় নাম, প্রতীক এবং সংগঠনের উপর অধিকার চেয়েছে। উভয় পক্ষের বক্তব্য, নথি এবং সাংবিধানিক ব্যাখ্যা খতিয়ে দেখেই কমিশন পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই বিতর্ক আর শুধু দলীয় নেতৃত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তৃণমূলের নাম, প্রতীক, সাংগঠনিক কাঠামো এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক বৈধতার প্রশ্ন এখন নির্বাচন কমিশনের বিচারাধীন। কমিশনের সিদ্ধান্ত শুধু দলীয় ক্ষমতার ভারসাম্যই নয়, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির ভবিষ্যৎ সমীকরণও অনেকাংশে নির্ধারণ করতে পারে।