বাংলাস্ফিয়ার: ভারতের দাবার নতুন প্রজন্মকে নিয়ে গত কয়েক বছর ধরেই বিশ্বদাবার অন্দরে চাপা উত্তেজনা জমছিল। ডি গুকেশ বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছেন, আর প্রজ্ঞানন্দ নিয়মিত বিশ্বের সেরাদের হারাচ্ছেন, অর্জুন ইরিগাইসি দ্রুত উঠে এসেছেন এলিট পর্যায়ে। কিন্তু এই বিস্ফোরণের মধ্যেও মেয়েদের দাবায় ভারতের এমন এক মুখ উঠে আসছিলেন, যাঁকে নিয়ে এখনও পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম পুরোপুরি প্রস্তুত ছিল না। সেই নাম— দিব্যা দেশমুখ।
নরওয়ে চেসের মতো মর্যাদাপূর্ণ মঞ্চে তাঁর অভিষেকই যেন হয়ে উঠল ঘোষণাপত্র। প্রতিপক্ষ আর কেউ নন, বর্তমান মহিলা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জু ওয়েনজুন। অভিজ্ঞতা, স্নায়ুর দৃঢ়তা, ওপেনিং প্রস্তুতি— সব দিক থেকেই এগিয়ে ছিলেন চিনের এই গ্র্যান্ডমাস্টার। কিন্তু দাবা কেবল তত্ত্বের খেলা নয়; এটি সাহস, ধৈর্য এবং মানসিক স্থিতিরও পরীক্ষা। আর সেখানেই মাত্র কুড়ির কোঠায় থাকা দিব্যা দেখিয়ে দিলেন, তিনি কেবল ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি নন, বর্তমানেরও বাস্তব শক্তি।
ক্লাসিক্যাল খেলাটি ড্র হয়। কিন্তু সেই ড্র-ই ছিল আসল নাটকের ভূমিকা। কারণ, বিশ্বচ্যাম্পিয়নের বিরুদ্ধে সমানে সমানে লড়ে ড্র আদায় করাটাই বিশাল সাফল্য। দিব্যার চালচলনে কোথাও অতিরিক্ত ভীতি ছিল না। বরং মাঝখানে কয়েকটি মুহূর্তে তিনি এমন আত্মবিশ্বাস দেখান, যা সাধারণত বহু বছর আন্তর্জাতিক দাবা খেললে আসে। তাঁর পজিশনাল সেন্স, সময় ব্যবস্থাপনা এবং প্রতিরক্ষার সূক্ষ্মতা বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টি কাড়ে।
তারপর আসে আর্মাগেডন টাইব্রেক। দাবার এই ফরম্যাট মূলত মানসিক যুদ্ধ। এখানে সময় কম, ভুলের সুযোগ কম, আর চাপ অসীম। বহু বড় বড় গ্র্যান্ডমাস্টার এই পর্যায়ে এসে ভেঙে পড়েন। কিন্তু দিব্যা উল্টে বিশ্বচ্যাম্পিয়নের ওপর চাপ তৈরি করেন। ধীরে ধীরে বোর্ডের নিয়ন্ত্রণ নিজের দিকে টেনে নিয়ে গিয়ে শেষ পর্যন্ত জয় ছিনিয়ে আনেন।
এই জয় শুধুই একটি ম্যাচ জেতা নয়। এটি ভারতীয় নারী দাবার বিবর্তনের প্রতীক। বহু বছর ধরে ভারতীয় দাবার আলোচনায় পুরুষ খেলোয়াড়রাই কেন্দ্রে ছিলেন। অথচ গত কয়েক বছরে মেয়েদের মধ্যেও অসাধারণ প্রতিভার উত্থান ঘটছে। দিব্যা সেই ধারার সবচেয়ে উজ্জ্বল মুখগুলির অন্যতম।
নাগপুরের এই তরুণীর দাবা-যাত্রা অনেকটাই নতুন ভারতের গল্পের মতো। ছোট শহর থেকে উঠে এসে ডিজিটাল প্রশিক্ষণ, অনলাইন টুর্নামেন্ট, আন্তর্জাতিক এক্সপোজার— সব মিলিয়ে এক নতুন দাবা-পরিকাঠামো তাঁকে তৈরি করেছে। কিন্তু শুধুমাত্র প্রযুক্তি দিয়ে গ্র্যান্ডমাস্টার হওয়া যায় না। তার জন্য প্রয়োজন ভয়ঙ্কর শৃঙ্খলা, দীর্ঘ মনঃসংযোগ এবং একধরনের একাকী অধ্যবসায়। দিব্যার খেলায় সেই কঠোর পরিশ্রমের ছাপ স্পষ্ট।
নরওয়ে চেসে আরেকটি কারণে তিনি আলোচনায় আসেন। তিনিই প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে “কনফেশনাল বুথ” ব্যবহার করেন। এই বিশেষ ব্যবস্থায় খেলোয়াড়রা ম্যাচ চলাকালীন নিজেদের ভাবনা দর্শকদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারেন। দিব্যার সেই উপস্থিতি ছিল স্বতঃস্ফূর্ত, আত্মবিশ্বাসী এবং সতেজ। বিশ্বদাবার দর্শকরা যেন প্রথমবার ভারতের নতুন প্রজন্মের এক নারী দাবাড়ুর ব্যক্তিত্বকে কাছ থেকে দেখলেন।
ভারতীয় দাবার উত্থানের পিছনে অবশ্য এক দীর্ঘ ইতিহাস আছে। বিশ্বনাথন আনন্দ এই বিপ্লবের মূল স্থপতি। আনন্দ শুধু বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হননি, তিনি গোটা দেশের মানসিকতাই বদলে দিয়েছিলেন। একসময় দাবা ছিল শহুরে মধ্যবিত্তের সীমিত পরিসরের খেলা। আজ তা ভারতের সবচেয়ে দ্রুত বিকাশমান প্রতিযোগিতামূলক খেলাগুলির একটি। আনন্দের পরের প্রজন্ম এখন আর বিশ্বসেরাদের দেখে ভয় পায় না। দিব্যা সেই আত্মবিশ্বাসী ধারারই উত্তরসূরি।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, ভারতীয় মেয়েরা এখন আর কেবল “ভালো মহিলা খেলোয়াড়” হিসেবে নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখছেন না। তাঁরা সরাসরি বিশ্বমানের দাবাড়ু হয়ে উঠছেন। দিব্যার খেলার মধ্যে যে নির্ভীকতা দেখা গেল, তা এই পরিবর্তনেরই লক্ষণ। তিনি বোর্ডে প্রতিপক্ষকে “বিশ্বচ্যাম্পিয়ন” হিসেবে নয়, বরং আর-একজন খেলোয়াড় হিসেবেই দেখেছেন।
খেলার পরে আন্তর্জাতিক মহলেও দিব্যার প্রশংসা শোনা যায়। বিশেষজ্ঞরা বলেন, তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি হল স্নায়ুর নিয়ন্ত্রণ। তরুণ খেলোয়াড়দের মধ্যে অনেক সময় অতিরিক্ত অ্যাগ্রেশান (আগ্রাসন) দেখা যায়। দিব্যার মধ্যে বরং এক ধরনের পরিণত স্থিরতা রয়েছে। তিনি বোর্ডে ঝুঁকি নেন, কিন্তু তা হিসেব করে।
এই একটি জয় দিয়েই অবশ্য কাউকে কিংবদন্তি বলা যায় না। দাবা দীর্ঘ পথের খেলা। এখানে ধারাবাহিকতাই শেষ কথা। কিন্তু কিছু মুহূর্ত থাকে, যা ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দেয়। নরওয়ের এই সন্ধ্যা তেমনই একটি মুহূর্ত। বিশ্বচ্যাম্পিয়নকে হারিয়ে দিব্যা দেশকে জানিয়ে দিলেন— ভারতীয় দাবার নতুন অধ্যায় এখনও লেখা শেষ হয়নি। বরং আরও অনেক গল্প বাকি।