Home খবর ট্রাম্পের দাবি উড়িয়ে কড়া বার্তা তেহরানের

ট্রাম্পের দাবি উড়িয়ে কড়া বার্তা তেহরানের

0 comments 2 views
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: পারস্য উপসাগরের জলে ইতিহাস বারবার ফিরে আসে। কখনও যুদ্ধজাহাজের গর্জনে, কখনও নিষেধাজ্ঞার দমবন্ধ অর্থনীতিতে, কখনও আবার কূটনীতির চকচকে বাক্যে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সব হিসেব এসে ঠেকে একটি সরু জলপথে — হরমুজ প্রণালী। পৃথিবীর জ্বালানি অর্থনীতির ধমনী। আর সেই ধমনীর ওপর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আবারও মুখোমুখি ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমেরিকা এবং ইরান।

ট্রাম্পের দাবি, তেহরানের পাল্টা ঘোষণা

সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, একটি সম্ভাব্য চুক্তির মাধ্যমে হরমুজ প্রণালী “আগের অবস্থায়” ফিরে যাবে। তাঁর বক্তব্যে এমন ইঙ্গিত ছিল যেন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই জলপথে ইরানের একচ্ছত্র প্রভাব হ্রাস পাবে। কিন্তু তেহরানের প্রতিক্রিয়া ছিল দ্রুত, কড়া এবং প্রায় অপমানসূচক। ইরানের আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যম ফার্স নিউজ এজেন্সি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে — হরমুজ প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণ ইরান কোনও অবস্থাতেই ছাড়বে না। জাহাজ চলাচলের সংখ্যা বাড়তে পারে, বাণিজ্যিক পরিবেশ স্বাভাবিক হতে পারে, কিন্তু ব্যবস্থাপনা, রুট নিয়ন্ত্রণ, অনুমতিপত্র এবং নিরাপত্তা কাঠামো থাকবে তেহরানের হাতেই।

পৃথিবীর জ্বালানির ধমনী

এই প্রতিক্রিয়ার মধ্যে শুধু কূটনৈতিক প্রতিবাদ নেই; আছে ক্ষমতার বাস্তব ঘোষণা। কারণ হরমুজ প্রণালী কোনও সাধারণ সমুদ্রপথ নয়। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল এবং বিপুল পরিমাণ তরল প্রাকৃতিক গ্যাস এই সরু জলরেখা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছায়। একদিকে ইরান, অন্যদিকে ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত — এই ভৌগোলিক অবস্থান হরমুজকে এমন এক কৌশলগত শক্তিতে পরিণত করেছে যার গুরুত্ব সুয়েজ খাল বা মালাক্কা প্রণালীর সমতুল্য।

নিষেধাজ্ঞার জবাবে উত্তেজনা, ইরানের পুরনো কৌশল

ইরান বহুদিন ধরেই এই প্রণালীকে নিজের নিরাপত্তা-রাজনীতির কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। যখনই পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা তীব্র হয়েছে, অথবা ইজরায়েল ও আমেরিকার সঙ্গে সংঘাত বেড়েছে, তখনই তেহরান হরমুজে উত্তেজনা বাড়িয়েছে। কখনও তেলবাহী জাহাজ আটক, কখনও ড্রোন নজরদারি, কখনও সামরিক মহড়া — সবই একই বার্তা দেয়: “আমাদের কোণঠাসা করলে পৃথিবীর জ্বালানি সরবরাহও বিপন্ন হবে।”

এই কারণেই ট্রাম্পের মন্তব্যকে ইরান শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে নেয়নি। তারা বুঝেছে, এটি আসলে বৃহত্তর আঞ্চলিক পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিত। বিশেষ করে এমন সময়ে, যখন ওয়াশিংটন আবার নতুন করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, উপসাগরীয় নিরাপত্তা এবং আরব রাষ্ট্রগুলির সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে বহুপাক্ষিক আলোচনায় সক্রিয় হয়েছে।

ভূগোল যেখানে সামরিক শক্তিকে হার মানায়

কিন্তু বাস্তবতা হল, আমেরিকার সামরিক শক্তি বিপুল হলেও হরমুজ প্রণালীর ভূগোল বদলানো অসম্ভব। ইরানের উপকূলরেখা এতটাই দীর্ঘ এবং কৌশলগতভাবে সুবিধাজনক যে কোনও আন্তর্জাতিক চুক্তি দিয়েই তাকে পুরোপুরি সরিয়ে দেওয়া যায় না। এই অঞ্চলে মার্কিন নৌবহর আছে, ব্রিটিশ এবং ফরাসি উপস্থিতিও আছে, কিন্তু প্রণালীর দৈনন্দিন বাস্তবতা এখনও অনেকাংশে ইরানের হাতে নির্ধারিত হয়।

‘স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল’ — কথার আড়ালে স্বীকারোক্তি

তেহরানের বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল “স্বাভাবিক অবস্থায় জাহাজ চলাচল ফিরিয়ে আনা”। এই ভাষার মধ্যে লুকিয়ে আছে সাম্প্রতিক উত্তেজনার স্বীকারোক্তি। গত কয়েক বছরে হরমুজ দিয়ে চলাচলকারী বহু জাহাজ নিরাপত্তাজনিত কারণে বিকল্প রুট বিবেচনা করেছে। বিমা খরচ বেড়েছে, জ্বালানির দাম অস্থির হয়েছে, এবং আন্তর্জাতিক বাজারে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। ফলে ইরান এখন এমন একটি অবস্থান নিতে চাইছে যেখানে তারা একইসঙ্গে শক্তিও প্রদর্শন করবে এবং বাজারকেও আশ্বস্ত করবে।

নিয়ন্ত্রিত উত্তেজনার রাজনীতি

আসলে ইরানের বর্তমান কৌশল দ্বিমুখী। একদিকে তারা দেখাতে চায় যে দেশটি এখনও আঞ্চলিক শক্তি, যাকে উপেক্ষা করে পশ্চিম এশিয়ায় কোনও স্থায়ী বন্দোবস্ত সম্ভব নয়। অন্যদিকে দীর্ঘ অর্থনৈতিক অবরোধ, মুদ্রাস্ফীতি এবং অভ্যন্তরীণ অসন্তোষের চাপে তারা সম্পূর্ণ যুদ্ধ পরিস্থিতিও চায় না। তাই তেহরান “নিয়ন্ত্রিত উত্তেজনা”-র রাজনীতি করছে যেখানে ভয় থাকবে, কিন্তু পূর্ণ সংঘর্ষ নয়।

চুক্তির বার্তা, নাকি মিডিয়া কৌশল

ট্রাম্পের অবস্থানও কম জটিল নয়। তিনি একদিকে নিজেকে শক্তিশালী দর-কষাকষিকারী হিসেবে তুলে ধরতে চান, অন্যদিকে আমেরিকার ভোটারদের কাছে নতুন যুদ্ধ নয়, “চুক্তির মাধ্যমে শান্তি”-র বার্তা দিতে চান। তাঁর রাজনৈতিক ভাষা বরাবরই নাটকীয়। ফলে মার্কিন কর্মকর্তাদের একটি অংশ নাকি ব্যক্তিগতভাবে ইরানকে জানিয়েছে যে ট্রাম্পের মন্তব্য অনেকটাই “মিডিয়া ব্যবহারের জন্য”। এই তথ্য প্রকাশ্যে আসা নিজেই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ কারণ এটি দেখায়, ওয়াশিংটনের ভিতরেও নীতি এবং প্রচারের মধ্যে ফারাক রয়েছে।

কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে ভাষারও মূল্য আছে। এখানে প্রতিটি শব্দ সামরিক সংকেত হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। ফলে ট্রাম্পের বক্তব্য হয়তো আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জন্য তৈরি, কিন্তু তেহরান সেটিকে আঞ্চলিক ক্ষমতার প্রশ্ন হিসেবে দেখছে।

বিশ্ব অর্থনীতিতে সরাসরি ধাক্কার আশঙ্কা

এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে। যদি হরমুজ প্রণালী নিয়ে উত্তেজনা বাড়ে, তাহলে তেলের দাম দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী হবে। ভারত, চীন, জাপান এবং ইউরোপীয় দেশগুলি সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিশেষ করে ভারতের মতো তেল আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য এটি বড় ধাক্কা হতে পারে। পেট্রোল-ডিজেলের দাম বাড়বে, পরিবহণ ব্যয় বাড়বে, মুদ্রাস্ফীতি নতুন চাপ তৈরি করবে।

ভারতের জন্য বিষয়টি আরও সূক্ষ্ম। একদিকে দিল্লির সঙ্গে ওয়াশিংটনের কৌশলগত সম্পর্ক গভীর হচ্ছে, অন্যদিকে ইরান ভারতের ঐতিহাসিক অংশীদার — বিশেষত জ্বালানি ও চাবাহার বন্দরের মতো প্রকল্পে। ফলে ভারত প্রকাশ্যে কোনও পক্ষ নিতে চায় না। দিল্লির কূটনীতি বরাবরই চেষ্টা করেছে হরমুজ অঞ্চলে স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে।

ট্যাঙ্কার যুদ্ধ থেকে ড্রোন সংঘাত — ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি

ইতিহাস বলছে, হরমুজ প্রণালী কখনও কেবল জলপথ ছিল না, এটি শক্তির প্রতীক। ১৯৮০-র দশকের “ট্যাঙ্কার যুদ্ধ” থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক ড্রোন সংঘাত — সব ক্ষেত্রেই এই প্রণালী আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। ইরান জানে, তার অর্থনীতি দুর্বল হতে পারে, কিন্তু হরমুজ তাকে এমন এক কৌশলগত গুরুত্ব দেয় যা কোনও নিষেধাজ্ঞা মুছে দিতে পারে না।

আধুনিক ভূরাজনীতির সবচেয়ে স্পর্শকাতর স্নায়ু

ফলে আজকের সংঘাত আসলে একটি বৃহত্তর সত্যকে সামনে আনে। পশ্চিম এশিয়ায় শান্তি নিয়ে যতই আলোচনা হোক, ক্ষমতার বাস্তব ভূগোল এখনও বদলায়নি। আমেরিকা সামরিকভাবে প্রভাবশালী, কিন্তু ইরান ভৌগোলিকভাবে অপরিহার্য। আর সেই কারণেই হরমুজ প্রণালী শুধু সমুদ্র নয়, এটি আধুনিক ভূরাজনীতির সবচেয়ে স্পর্শকাতর স্নায়ু।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles