Table of Contents
বাংলাস্ফিয়ার: পশ্চিম এশিয়ার ভূরাজনীতিতে আবারও এক সম্ভাব্য নাটকীয় মোড়ের ইঙ্গিত মিলল। মার্কিন বিদেশ সচিব মার্কো রুবিও শনিবার এমন এক মন্তব্য করেছেন, যা কূটনৈতিক মহলে প্রবল আলোড়ন তুলেছে। তাঁর কথায়, ইরানকে ঘিরে চলমান আলোচনায় “উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি” হয়েছে এবং খুব শীঘ্রই একটি বড় ঘোষণা আসতে পারে। যদিও তিনি স্পষ্ট করে জানাননি সেই ঘোষণা কী, কিন্তু আন্তর্জাতিক মহলের ধারণা— বিষয়টি সরাসরি জড়িত ইরানের পরমাণু কর্মসূচি, হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা এবং আমেরিকা-ইরান সম্পর্কের ভবিষ্যতের সঙ্গে।
কূটনৈতিক প্রেক্ষাপট
এই মুহূর্তে বিশ্বের সবচেয়ে স্পর্শকাতর কূটনৈতিক অক্ষগুলির একটি হল ইরানকে ঘিরে আন্তর্জাতিক সমীকরণ। একদিকে তেহরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনা— এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে আমেরিকা বহুদিন ধরেই এমন একটি সমঝোতা খুঁজছিল, যাতে যুদ্ধ এড়িয়েও ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। রুবিওর বক্তব্য সেই প্রেক্ষাপটেই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
মার্কিন প্রশাসনের বক্তব্য পরিষ্কার— ইরানকে কখনও পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেওয়া হবে না। কিন্তু একইসঙ্গে ওয়াশিংটন এটাও বুঝতে পারছে যে শুধুমাত্র নিষেধাজ্ঞা, সামরিক চাপ কিংবা কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা দিয়ে তেহরানকে দীর্ঘমেয়াদে আটকে রাখা সম্ভব নয়। তাই নতুন করে আলোচনার পথ খুলেছে। শোনা যাচ্ছে, সম্ভাব্য চুক্তির কেন্দ্রে রয়েছে ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত হ্রাস অথবা আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে হস্তান্তরের প্রশ্ন।
হরমুজ প্রণালীর গুরুত্ব
এখানেই এসে গুরুত্ব পাচ্ছে হরমুজ প্রণালী। পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ এই প্রণালী দিয়েই বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবাহিত হয়। ইরান বহুবার হুমকি দিয়েছে, সংঘাত বাড়লে তারা এই জলপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত করতে পারে। রুবিও সেই প্রসঙ্গেই সরাসরি বলেছেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথে বাধা সৃষ্টি করা “অবৈধ” এবং তা মেনে নেওয়া হবে না।
হরমুজ প্রণালী নিয়ে উদ্বেগ কেবল সামরিক নয়, অর্থনৈতিকও। যদি এই পথ অচল হয়ে পড়ে, তবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম মুহূর্তে লাফিয়ে বাড়তে পারে। ইউরোপ, ভারত, চীন, জাপান— প্রায় সব বড় অর্থনীতিই তার অভিঘাতে কেঁপে উঠবে। ফলে ইরানকে ঘিরে কূটনৈতিক সাফল্য মানে শুধু যুদ্ধ এড়ানো নয়; বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতাও অনেকাংশে নিশ্চিত করা।
উপসাগরীয় দেশগুলির ভূমিকা
এই মুহূর্তে আলোচনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা হল উপসাগরীয় আরব দেশগুলির ভূমিকা। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি এবং অন্যান্য উপসাগরীয় রাষ্ট্র বহুদিন ধরেই ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার নিয়ে উদ্বিগ্ন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে তারা সরাসরি সংঘর্ষের বদলে “নিয়ন্ত্রিত সহাবস্থান”-এর পথে হাঁটতে আগ্রহী। কারণ দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের মূল্য সবচেয়ে বেশি দিতে হবে তাদেরই। মার্কিন প্রশাসন সেই বাস্তবতাকেও কাজে লাগাতে চাইছে।
অতীত চুক্তির ছায়া
রুবিওর বক্তব্যের আরেকটি দিক বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেছেন, কোনও চুক্তি তখনই কার্যকর হবে, যখন ইরান “সম্পূর্ণভাবে মেনে চলবে”। অর্থাৎ ওয়াশিংটন এখনও তেহরানের প্রতি সম্পূর্ণ আস্থা রাখছে না। অতীত অভিজ্ঞতাও সেই অবিশ্বাসকে জোরদার করে। যৌথ ব্যাপক কর্মপরিকল্পনা বা জেসিপিওএ-র সময়ও প্রথমে আশাবাদ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু পরে ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকাকে সেই চুক্তি থেকে বের করে আনেন এবং নতুন নিষেধাজ্ঞা চাপান। তার পর থেকেই সম্পর্ক দ্রুত অবনতির দিকে যায়।
বর্তমান পরিস্থিতি তাই অত্যন্ত সূক্ষ্ম। যদি সত্যিই কোনও নতুন সমঝোতা তৈরি হয়ে থাকে, তবে সেটি কেবল আগের চুক্তির পুনরাবৃত্তি হবে না। বরং তাতে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, সমুদ্রপথের স্বাধীনতা, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং আন্তর্জাতিক পরিদর্শনের মতো নতুন উপাদানও থাকতে পারে।
ভারতের স্বার্থ ও অবস্থান
ভারতের দিক থেকেও এই পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এস. জয়শঙ্করের সঙ্গে রুবিওর সাম্প্রতিক বৈঠক সেই কারণেই তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। ভারত একদিকে ইরানের সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়, অন্যদিকে আমেরিকার কৌশলগত অংশীদার হিসেবেও নিজের অবস্থান শক্তিশালী করছে। তেলের বাজার স্থিতিশীল থাকাও ভারতের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
যুদ্ধ ও শান্তির মাঝখানে
সব মিলিয়ে, রুবিওর এই “বড় অগ্রগতি”-র ইঙ্গিত কেবল একটি কূটনৈতিক বিবৃতি নয়। এর মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে যুদ্ধ ও শান্তির মাঝখানের এক জটিল সমীকরণ। যদি আলোচনা সফল হয়, তবে পশ্চিম এশিয়ায় বহুদিন পরে কিছুটা স্থিতিশীলতার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। আর যদি তা ভেঙে পড়ে, তবে বিশ্ব আবারও এক নতুন সংঘাতের কিনারায় পৌঁছে যাবে।