Table of Contents
বাংলাস্ফিয়ার: বিশ্ব আবার এক পুরনো আতঙ্কের মুখোমুখি। এমন এক আতঙ্ক, যার নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে আফ্রিকার জঙ্গল, পিপিই কিট পরিহিত চিকিৎসাকর্মী, কোয়ারেন্টাইন হওয়া প্রত্যন্ত গ্রাম, অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণে প্রাণহানি এবং বৈশ্বিক জরুরি অবস্থার সেই চেনা দৃশ্যপট। সেই আতঙ্কের নাম ইবোলা।
আন্তর্জাতিক জরুরি অবস্থা ঘোষণা
সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ঘোষণা করেছে যে কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র এবং উগান্ডায় ছড়িয়ে পড়া বান্ডিবুগিও প্রজাতির ইবোলা ভাইরাস এখন “পাবলিক হেলথ এমার্জেন্সি অব ইন্টারন্যাশনাল কনসার্ন” বা আন্তর্জাতিক উদ্বেগের জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, পৃথিবীকে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে— এই সংক্রমণ স্থানীয় সীমানা ছাপিয়ে বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে।
এই ঘোষণার অভিঘাত শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর মধ্যে রয়েছে ভূরাজনীতি, দারিদ্র্য, সীমান্ত রাজনীতি, আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং মানুষের ভয়।
বান্ডিবুগিও স্ট্রেন কেন বেশি বিপজ্জনক
আফ্রিকার হৃদভূমিতে, বিশেষত কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র এবং উগান্ডায় বহু দশক ধরেই ইবোলা যেন এক অভিশাপের মতো ফিরে ফিরে আসে। জঙ্গলে বাদুড় বা বন্য প্রাণী থেকে মানুষের শরীরে ভাইরাসের প্রবেশ, তারপর গ্রাম থেকে শহরে ছড়িয়ে পড়া— এই গল্প নতুন নয়। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের কারণ আলাদা।
কারণ, বান্ডিবুগিও স্ট্রেন তুলনামূলক বিরল। এর বিরুদ্ধে প্রস্তুত টিকা সীমিত। উপরন্তু, সীমান্তবর্তী অঞ্চলে স্বাস্থ্যব্যবস্থা এতটাই দুর্বল যে দ্রুত রোগ শনাক্ত করা এবং সংক্রমিত ব্যক্তিকে আলাদা করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
রোগের লক্ষণ ও মৃত্যুঝুঁকি
ইবোলা এমন এক রোগ, যেখানে মৃত্যুহার ভয়াবহ হতে পারে। সংক্রমণের শুরুতে জ্বর, মাথাব্যথা, পেশিতে ব্যথা— সাধারণ ভাইরাল জ্বরের মতোই লক্ষণ দেখা যায়। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যে রোগীর শরীরে শুরু হতে পারে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ, অঙ্গ বিকল হওয়া এবং শক। অনেক ক্ষেত্রেই রোগী কয়েক দিনের মধ্যে মারা যান।
এই কারণেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এত দ্রুত সতর্কতা জারি করেছে।
সীমান্ত ও বিমানবন্দরে নজরদারি
এই ঘোষণার পরে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, স্থলবন্দর এবং সীমান্ত চৌকিগুলিতে নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে যেসব দেশে আফ্রিকা থেকে নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে, তারা এখন বাড়তি সতর্ক।
ভারতও তার ব্যতিক্রম নয়। ভারত সরকার ইতিমধ্যেই নাগরিকদের অপ্রয়োজনীয়ভাবে আক্রান্ত অঞ্চলে না যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রক বিমানবন্দরগুলিকে সতর্ক করেছে যাতে অজানা জ্বর বা উপসর্গ নিয়ে আসা যাত্রীদের দ্রুত পরীক্ষা করা যায়।
আন্তঃসংযুক্ত পৃথিবীতে ভাইরাসের ঝুঁকি
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ইবোলা নিয়ে এত ভয় কেন? কারণ, আধুনিক পৃথিবী এখন ভীষণভাবে আন্তঃসংযুক্ত। একসময় আফ্রিকার প্রত্যন্ত গ্রামের রোগ হয়তো সেখানেই সীমাবদ্ধ থাকত। এখন কয়েক ঘণ্টার বিমানের যাত্রাতেই ভাইরাস এক মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশে পৌঁছে যেতে পারে।
করোনা মহামারি পৃথিবীকে এই শিক্ষা দিয়েছে যে সংক্রামক রোগকে “ওদের সমস্যা” বলে দূরে সরিয়ে রাখা যায় না। আফ্রিকার জঙ্গলে শুরু হওয়া ভাইরাস কয়েক মাসের মধ্যে নিউ ইয়র্ক, লন্ডন, দিল্লি বা কলকাতার হাসপাতাল পর্যন্ত পৌঁছে যেতে পারে।
আর সেই কারণেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এই ঘোষণা আসলে একটি আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বার্তাও। এটি বিশ্বের দেশগুলিকে বলছে— নিজেদের প্রস্তুত করুন, তথ্য ভাগ করুন, সীমান্তে নজরদারি বাড়ান এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে সক্রিয় করুন।
সামাজিক অবিশ্বাস ও মোকাবিলার চ্যালেঞ্জ
ইবোলা মোকাবিলায় সবচেয়ে বড় সমস্যা শুধু চিকিৎসা নয়, সামাজিক অবিশ্বাসও। আফ্রিকার বহু অঞ্চলে এখনও মানুষ আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি পুরোপুরি আস্থা রাখেন না। অনেক সময় পরিবার আক্রান্ত সদস্যকে হাসপাতালের বদলে ঘরে লুকিয়ে রাখে। মৃতদেহ সৎকারের ঐতিহ্যগত পদ্ধতিও সংক্রমণ বাড়িয়ে দেয়। ফলে রোগ নিয়ন্ত্রণ আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
২০১৪ সালের পশ্চিম আফ্রিকার ভয়াবহ ইবোলা মহামারির সময় বিশ্ব দেখেছিল কীভাবে হাজার হাজার মানুষ মারা গিয়েছিলেন। তখন লাইবেরিয়া, সিয়েরা লিওন এবং গিনিতে স্বাস্থ্যব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়েছিল। হাসপাতালগুলিতে চিকিৎসকরা পর্যন্ত আক্রান্ত হন। আন্তর্জাতিক আতঙ্ক এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে বহু দেশ আফ্রিকার যাত্রীদের ওপর কড়া নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল।
বর্তমান পরিস্থিতি এখনও সেই পর্যায়ে না পৌঁছালেও উদ্বেগ দ্রুত বাড়ছে।
মহাদেশীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন
বিশেষ করে আফ্রিকা রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র ইতিমধ্যেই এই পরিস্থিতিকে “মহাদেশীয় নিরাপত্তার জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা” বলে চিহ্নিত করেছে। অর্থাৎ এটি শুধু স্বাস্থ্য সমস্যা নয়, আফ্রিকার সামগ্রিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নও।
কারণ, বড় সংক্রমণ মানেই অর্থনৈতিক বিপর্যয়। সীমান্ত বাণিজ্য কমে যায়, পর্যটন থেমে যায়, খাদ্য সরবরাহ ব্যাহত হয়, এবং মানুষের মধ্যে ভয় ছড়িয়ে পড়ে। বহু দরিদ্র পরিবার কাজ হারায়। শিশুদের স্কুল বন্ধ হয়ে যায়। স্বাস্থ্য সংকট খুব দ্রুত সামাজিক সংকটে পরিণত হয়।
বৈশ্বিক বৈষম্যের প্রতীক
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল— ইবোলা শুধুমাত্র চিকিৎসাবিজ্ঞানের চ্যালেঞ্জ নয়, বৈশ্বিক বৈষম্যের প্রতীকও। পশ্চিমা বিশ্বের ধনী দেশগুলিতে অত্যাধুনিক হাসপাতাল, গবেষণাগার এবং দ্রুত প্রতিরোধব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু মধ্য আফ্রিকার বহু অঞ্চলে এখনও পর্যাপ্ত চিকিৎসক নেই, পরীক্ষাগার নেই, এমনকি নিরাপদ পানীয় জলও নেই। ফলে ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই অসম হয়ে দাঁড়ায়।
সমালোচকেরা বলেন, পৃথিবী প্রায়ই আফ্রিকার মহামারিকে গুরুত্ব দেয় তখনই, যখন সেটি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি করে। তার আগে পর্যন্ত আফ্রিকার স্বাস্থ্য সংকট আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে খুব কমই জায়গা পায়। এই বাস্তবতা অনেক আফ্রিকান নাগরিকের মধ্যে ক্ষোভও তৈরি করেছে।
আশার আলো ও বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা
তবু আশার জায়গাও আছে। করোনা-পরবর্তী পৃথিবী এখন আগের তুলনায় সংক্রামক রোগ সম্পর্কে অনেক বেশি সচেতন। আন্তর্জাতিক নজরদারি ব্যবস্থা উন্নত হয়েছে। দ্রুত জিনোম বিশ্লেষণ, সীমান্ত পর্যবেক্ষণ এবং জরুরি চিকিৎসা সমন্বয়ের ক্ষমতা আগের তুলনায় বেশি।
যদিও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিচ্ছেন যে আত্মতুষ্টির কোনও জায়গা নেই। কারণ ভাইরাস কখনও স্থির থাকে না। মানুষের সভ্যতা যত গভীরভাবে প্রকৃতির ভিতরে প্রবেশ করছে, বনভূমি ধ্বংস করছে এবং বন্য প্রাণীর আবাসভূমিতে হস্তক্ষেপ করছে, ততই নতুন সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ছে।
ইবোলা তাই কেবল একটি রোগের নাম নয়। এটি আধুনিক সভ্যতার এক সতর্কবার্তা। একটি ভাইরাস আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে যে পৃথিবী আসলে কতটা ভঙ্গুর। এবং মানুষের স্বাস্থ্য, রাজনীতি, অর্থনীতি ও পরিবেশ, সবকিছু কত গভীরভাবে একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।