Table of Contents
বাংলাস্ফিয়ার: জম্মু ও কাশ্মীরের রাজৌরি জেলার ঘাম্বির মুঘলান অরণ্য আবারও পরিণত হয়েছে এক উচ্চ-ঝুঁকির সামরিক অভিযানের কেন্দ্রে। ঘন জঙ্গল, দুর্গম পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি এবং সীমান্তঘেঁষা অবস্থানের কারণে বহু বছর ধরেই পীর পাঞ্জাল অঞ্চলের এই বিস্তীর্ণ এলাকা জঙ্গি কার্যকলাপের জন্য কুখ্যাত। এবারও গোয়েন্দা সূত্রে খবর পাওয়ার পর ভারতীয় সেনা, সিআরপিএফ এবং জম্মু ও কাশ্মীর পুলিশ যৌথভাবে যে অভিযান শুরু করেছে, তা শুধু একটি সামরিক অপারেশন নয় বরং কাশ্মীরের নিরাপত্তা-রাজনীতির গভীরে লুকিয়ে থাকা এক দীর্ঘস্থায়ী বাস্তবতার পুনরাবৃত্তি।
অভিযানের শুরু ও প্রাথমিক সংঘর্ষ
অভিযান শুরু হয় শুক্রবার রাতে। নিরাপত্তা বাহিনী প্রথমে ওই বনাঞ্চল ঘিরে ফেলে এবং পরে ধাপে ধাপে তল্লাশি অভিযান শুরু করে। শনিবার সকালে জঙ্গিদের সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষের খবর আসে। প্রাথমিক অনুমান, অন্তত দুই থেকে তিনজন সশস্ত্র জঙ্গি ওই এলাকায় লুকিয়ে রয়েছে। যদিও সরকারিভাবে কোনও সংগঠনের নাম ঘোষণা করা হয়নি, নিরাপত্তা মহলের ধারণা, তারা সীমান্ত পেরিয়ে আসা প্রশিক্ষিত জঙ্গি গোষ্ঠীর সদস্য হতে পারে।
ভূগোলই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ
ঘাম্বির মুঘলান অরণ্যের ভূগোল এই ধরনের অভিযানের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। পাহাড়ি খাদ, অগণিত প্রাকৃতিক গুহা, অস্বাভাবিক ঘন গাছপালা এবং মোবাইল নেটওয়ার্কবিহীন বিস্তীর্ণ এলাকা—সব মিলিয়ে এই অঞ্চল কার্যত জঙ্গিদের জন্য প্রাকৃতিক আশ্রয়স্থল। সেনাবাহিনীর এক অবসরপ্রাপ্ত আধিকারিকের ভাষায়, “এখানে যুদ্ধ মানে শুধু শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই নয়, প্রকৃতির বিরুদ্ধেও লড়াই।”
এই অঞ্চলটি কৌশলগত দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পীর পাঞ্জাল পর্বতমালা দীর্ঘদিন ধরেই কাশ্মীর উপত্যকা ও জম্মু অঞ্চলের মধ্যে এক সংযোগকারী করিডর হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। অতীতে বহু জঙ্গি সংগঠন এই অরণ্যপথ ব্যবহার করে গোপনে যাতায়াত করেছে। ফলে যখনই কোনও গোয়েন্দা তথ্য আসে, নিরাপত্তা বাহিনী দ্রুত এবং আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে অভিযান শুরু করতে বাধ্য হয়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক
স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও আতঙ্ক স্পষ্ট। আশপাশের গ্রামগুলিতে অতিরিক্ত চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। সাধারণ মানুষের যাতায়াত সীমিত করা হয়েছে। অনেক জায়গায় রাতের পর বাইরে বেরোতে বারণ করা হয়েছে। গ্রামবাসীদের একাংশ বলছেন, গত কয়েক বছরে পরিস্থিতি তুলনামূলক শান্ত হলেও সাম্প্রতিক সময়ে আবার জঙ্গি তৎপরতা বাড়ছে বলে তাঁদের আশঙ্কা।
রাজনৈতিক বার্তাও বহন করে এই অভিযান
তবে এই ধরনের অভিযান কেবল নিরাপত্তা ইস্যু নয়, রাজনৈতিক বার্তাও বহন করে। কেন্দ্রীয় সরকার বহুদিন ধরেই দাবি করে আসছে যে জম্মু ও কাশ্মীরে সন্ত্রাসবাদ “শেষ পর্যায়ে” পৌঁছে গেছে। কিন্তু বাস্তবে বারবার এমন সংঘর্ষ দেখিয়ে দিচ্ছে, জঙ্গি নেটওয়ার্ক পুরোপুরি নির্মূল হয়নি। বরং তারা নতুন কৌশল নিচ্ছে—ছোট ছোট মডিউলে বিভক্ত হয়ে সীমিত আকারে হামলা চালানো, গভীর জঙ্গলে লুকিয়ে থাকা এবং স্থানীয় সমর্থন সংগ্রহের চেষ্টা করা।
রাজৌরি-পুঞ্চ বেল্টে ক্রমবর্ধমান সক্রিয়তা
বিশেষজ্ঞদের মতে, গত কয়েক বছরে কাশ্মীর উপত্যকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা কঠোর হওয়ায় জঙ্গিরা এখন ধীরে ধীরে রাজৌরি-পুঞ্চ বেল্টে সক্রিয়তা বাড়িয়েছে। এই অঞ্চল তুলনামূলক কম নজরদারির মধ্যে থাকায় এবং ভৌগোলিকভাবে কঠিন হওয়ায় তারা এখানে ঘাঁটি গড়ার চেষ্টা করছে। ২০২৩ এবং ২০২৪ সালেও এই অঞ্চলে একাধিক ভয়াবহ হামলায় সেনা জওয়ানদের মৃত্যু হয়েছিল। ফলে নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে এই এলাকা এখন উচ্চ অগ্রাধিকারের অঞ্চল।
স্থানীয় সহযোগিতার জটিল বাস্তবতা
এই অভিযানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল স্থানীয় সহযোগিতা। নিরাপত্তা বাহিনী বারবার বলছে, সাধারণ মানুষের তথ্য ও সহযোগিতা ছাড়া এ ধরনের অভিযান সফল করা সম্ভব নয়। কিন্তু বাস্তবতা অনেক জটিল। সীমান্তবর্তী অঞ্চলের বহু মানুষ দীর্ঘদিন ধরে ভয়, অনিশ্চয়তা এবং দ্বৈত চাপে বাস করছেন। একদিকে জঙ্গিদের হুমকি, অন্যদিকে নিরাপত্তা বাহিনীর নজরদারি—দুইয়ের মাঝখানে পড়ে সাধারণ মানুষের জীবন প্রায়শই অসহনীয় হয়ে ওঠে।
জিরো টলারেন্স নীতি ও প্রযুক্তির ব্যবহার
ভারতের নিরাপত্তা নীতির দৃষ্টিকোণ থেকেও এই অভিযান তাৎপর্যপূর্ণ। কেন্দ্র বর্তমানে “শূন্য আপোস” নীতির কথা বলছে। অর্থাৎ, ছোট বা বড় যে কোনও জঙ্গি উপস্থিতিকেই দ্রুত চিহ্নিত করে নির্মূল করার চেষ্টা করা হচ্ছে। গোয়েন্দা নজরদারি, ড্রোন প্রযুক্তি, উপগ্রহ ট্র্যাকিং এবং বিশেষ প্রশিক্ষিত ইউনিট ব্যবহারের ফলে সেনাবাহিনীর সক্ষমতা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। কিন্তু পাহাড়ি জঙ্গলাঞ্চলে যুদ্ধের বাস্তবতা এখনও অত্যন্ত কঠিন।
সামরিক সমাধান কি যথেষ্ট?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হল, এই ধরনের অভিযান কি দীর্ঘমেয়াদে সমস্যার সমাধান করতে পারছে? নিরাপত্তা বাহিনী জঙ্গিদের হত্যা বা গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হলেও, সন্ত্রাসবাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক শিকড় পুরোপুরি উপড়ে ফেলা সম্ভব হচ্ছে কি? কাশ্মীর সমস্যার ইতিহাস দেখলে বোঝা যায়, শুধুমাত্র সামরিক সমাধান কখনও স্থায়ী শান্তি আনতে পারেনি। প্রতিটি সংঘর্ষের পর আবার নতুন করে উত্তেজনা জন্ম নিয়েছে।
ঘাম্বির মুঘলানের বর্তমান অভিযান সেই দীর্ঘ ইতিহাসেরই আরেকটি অধ্যায়। হয়তো কয়েক দিনের মধ্যে নিরাপত্তা বাহিনী ঘোষণা করবে যে অপারেশন সফল হয়েছে, কয়েকজন জঙ্গি নিহত বা গ্রেপ্তার হয়েছে। কিন্তু তার পরেও পাহাড়ের ওপারে, জঙ্গলের অন্ধকারে, সীমান্তের গোপন পথগুলিতে সংঘাতের ছায়া থেকেই যাবে। কারণ কাশ্মীরের নিরাপত্তা সংকট শুধু বন্দুকের নয়—এটি ভূরাজনীতি, সীমান্ত রাজনীতি, স্থানীয় ক্ষোভ এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির জটিল সমীকরণের অংশ।
আর সেই কারণেই রাজৌরির ঘন অরণ্যে গুলির শব্দ থেমে গেলেও, উপত্যকার অস্থিরতা এত সহজে থামার নয়।