Table of Contents
বাংলাস্ফিয়ার: ভারতের দৌড়ের ইতিহাসে গতি নিয়ে বহু গল্প আছে। আছে মিলখা সিংয়ের মরুভূমি পেরিয়ে উঠে আসার কাহিনি, আছে পি টি উষার ঝড়ের মতো ছুটে চলা, আছে নীরজ চোপড়ার বর্শা ছুড়ে আকাশে ভারতের নাম লিখে দেওয়ার গল্প। কিন্তু বিশাল টি কে-র গল্প আলাদা। কারণ এই গল্প কেবল দ্রুত দৌড়নোর নয়। এটি এমন এক ছেলের গল্প, যার জন্মের সময়ই যেন ভাগ্য তাকে বলেছিল — “তোমার পক্ষে সম্ভব নয়।” আর সেই ছেলেটিই একদিন ভারতের দ্রুততম চারশো মিটার দৌড়বিদ হয়ে উঠল।
ভাঙলেন মিলখার রেকর্ড
১৯৬০ সালে রোম অলিম্পিকে মিলখা সিং চারশো মিটার দৌড়েছিলেন ৪৫.৭৩ সেকেন্ডে। সেই দৌড় কেবল একটি সময় ছিল না — ছিল ভারতীয় দৌড়ের ইতিহাসে প্রথম বড় গর্বের মুহূর্ত। বিশ্বমঞ্চে ভারত যে লড়তে পারে, সেই বার্তা দিয়েছিলেন মিলখা। তাঁর সেই দৌড় প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ভারতীয় দৌড়ের প্রতীক হয়ে রয়েছে — মনোবলের প্রতীক, শৃঙ্খলার প্রতীক, বিশ্বাসের প্রতীক।
সেই রেকর্ড ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে অটুট ছিল।
২০২৬ সালে রাঁচিতে অ্যাথলেটিক্স ফেডারেশন কাপে বিশাল টিকে সেই ইতিহাস নতুন করে লিখলেন। চারশো মিটার দৌড়ে তাঁর সময় — ৪৪.৯৮ সেকেন্ড। মিলখা সিংয়ের গড়া রেকর্ড ভেঙে তিনি কেবল একটি সংখ্যা বদলাননি; তিনি দেখিয়েছেন ভারতীয় দৌড় এগিয়ে চলেছে, থামেনি।
‘মৃত্যুর দৌড়’ বলা হয় যে ইভেন্টকে
চারশো মিটার দৌড়কে অনেকে “মৃত্যুর দৌড়” বলেন। কারণ এই দৌড়ে শুধু গতি থাকলেই হয় না, দরকার ফুসফুসের জোর, মানসিক শক্তি, শরীরের সহ্যক্ষমতা এবং ভয়ঙ্কর শৃঙ্খলা। একশো মিটারের বিস্ফোরণ নয়, আবার আটশো মিটারের মতো কৌশলও নয় — চারশো মিটার এক অদ্ভুত নিষ্ঠুর পরীক্ষা। শরীরের প্রতিটি পেশি যেন আগুনে পুড়তে থাকে। শেষ একশো মিটারে মনে হয় বুক ফেটে যাবে। পা আর নিজের কথা শুনছে না। অথচ থামা চলবে না।
সেই দৌড়েই আজ ভারতের দ্রুততম মানুষ বিশাল টিকে।
হাঁটতেই সমস্যা হত, দৌড় ছিল স্বপ্নের বাইরে
কেরলের এক সাধারণ পরিবারে জন্ম বিশালের। ছোটবেলায় তাকে দেখে কেউ ভাবেনি, এই ছেলেটি একদিন দেশের ইতিহাসে জায়গা করে নেবে। জন্ম থেকেই তার শরীরে ছিল শারীরিক সমস্যা। পায়ের গঠন পুরোপুরি স্বাভাবিক ছিল না। হাঁটতে সমস্যা হত। দৌড় তো দূরের কথা, অনেকেই ভেবেছিলেন ছেলেটি হয়তো স্বাভাবিক খেলাধুলাও করতে পারবে না।
ভারতের ছোট শহর বা গ্রামের সমাজ খুব নির্মম হতে পারে। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে জন্মানো শিশুদের দিকে মানুষ কৌতূহল নিয়ে তাকায়, কখনও করুণা করে, কখনও ঠাট্টা করে। বিশালও সেইসব দৃষ্টি দেখেছে।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, সে নিজে নিজের দিকে কখনও করুণার চোখে তাকায়নি।
তার মা পরে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ছোটবেলায় বিশাল অন্য বাচ্চাদের মতোই ছুটতে চাইত। পড়ে যেত, আবার উঠত। পায়ে ব্যথা হত, তবু খেলত। যেন শরীরের সীমাবদ্ধতাকে সে মেনে নিতে রাজি ছিল না।
এই জেদটাই সম্ভবত তাকে আলাদা করেছে।
খুব কম বয়স থেকেই বিশাল বুঝেছিল, জীবন তাকে কোনও সহজ পথ দেবে না। অন্যদের তুলনায় তাকে বেশি লড়তে হবে। বেশি কষ্ট করতে হবে। আর তাই সে ছোট ছোট জিনিস দিয়ে শুরু করেছিল — একটু বেশি হাঁটা, একটু বেশি দৌড়, একটু বেশি অনুশীলন।
এক অদ্ভুত স্বাভাবিক ছন্দ
একসময় স্থানীয় প্রশিক্ষকদের নজরে আসে ছেলেটি। তার মধ্যে ছিল এক অদ্ভুত স্বাভাবিক দৌড়ের ছন্দ(natural stride)। সে যখন দৌড়ত, তখন মনে হত শরীর যেন নিজের সীমাবদ্ধতাকে ভুলে গেছে।
কিন্তু প্রতিভা থাকলেই তো হয় না। ভারতের অ্যাথলেটিকসের বাস্তবতা খুব কঠিন। ভালো জুতো নেই, পুষ্টিকর খাবার নেই, প্রশিক্ষণের বৈজ্ঞানিক পরিকাঠামো নেই। অনেক সময় অ্যাথলিটদের নিজেদের টিকে থাকার লড়াই চালাতে হয়।
বিশালও সেই লড়াই করেছে।
ভোরবেলা উঠে অনুশীলন, তারপর পড়াশোনা, তারপর আবার প্রশিক্ষণ। শরীরের ব্যথা, ক্লান্তি, আর্থিক অনিশ্চয়তা — সবকিছুর মাঝেও সে থামেনি। কারণ তার মাথার মধ্যে একটাই ছবি ছিল — একদিন বড় দৌড়ে নামবে।
চারশো মিটার বেছে নেওয়াটাও সহজ সিদ্ধান্ত ছিল না। এই ইভেন্টে শুধু প্রতিভা নয়, ভয়ঙ্কর শৃঙ্খলা দরকার। খাদ্যাভ্যাস থেকে ঘুম — সবকিছু নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়।
বিশালের প্রশিক্ষকরা পরে বলেছিলেন, ছেলেটির সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তার মানসিকতা। সে অভিযোগ করত না। সে অজুহাত বানাত না।
জেলা থেকে জাতীয়
তারপর ধীরে ধীরে সময় কমতে শুরু করল।
প্রথমে জেলা স্তর, তারপর রাজ্য, তারপর জাতীয় প্রতিযোগিতা। একসময় দৌড়ের মহলে মানুষ নামটা লক্ষ্য করতে শুরু করল। “কেরলের একটা ছেলে খুব দ্রুত দৌড়চ্ছে।”
কিন্তু জাতীয় স্তরে পৌঁছনো আর দেশের সেরা হওয়া এক জিনিস নয়। ভারতের দৌড়-প্রতিযোগিতায় লড়াই ভয়ঙ্কর। শত শত ক্রীড়াবিদ বছরের পর বছর নিজেদের উজাড় করে দেয়। অনেক প্রতিভা মাঝপথেই হারিয়ে যায়। কেউ চোটে শেষ হয়ে যায়, কেউ অর্থাভাবে, কেউ হতাশায়।
বিশাল সেখানে টিকে রইল।
ঘড়ি থামার পর কেউ বিশ্বাসই করতে পারেনি
আর তারপর এল সেই দিন, যেদিন সে ইতিহাস লিখল।
চারশো মিটারে ভারতের দ্রুততম সময়।
মাঠের ঘড়ি থামার পরে কয়েক সেকেন্ড যেন সবাই বিশ্বাসই করতে পারেনি। যে ছেলেটিকে একসময় হাঁটা নিয়েই সন্দেহ করা হয়েছিল, সে আজ দেশের দ্রুততম চারশো মিটার রানার!
এই মুহূর্তগুলোই খেলাধুলাকে এত সুন্দর করে তোলে। কারণ খেলাধুলা মাঝে মাঝে সমাজকে ভুল প্রমাণ করে।
পদকের পিছনে যে অন্ধকার দেখা যায় না
বিশালের সাফল্যের মধ্যে তাই শুধু পদক নেই, আছে প্রতীকও। সে যেন হাজার হাজার সাধারণ ভারতীয় পরিবারের ছেলেমেয়েদের বলছে — “তোমার শুরুটাই তোমার শেষ নয়।”
আজকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে আমরা সাফল্যের শেষ দৃশ্যটা দেখি। পুরস্কারমঞ্চ দেখি, পদক দেখি, সাক্ষাৎকার দেখি। কিন্তু তার পিছনে কত ভোরবেলা, কত কান্না, কত ব্যর্থতা, কত একাকিত্ব থাকে, তা দেখা যায় না।
বিশালের জীবনেও সেই অন্ধকার ছিল।
কখনও হয়তো সে নিজেও ভেবেছে, পারবে তো? কখনও হয়তো শরীর সাড়া দেয়নি। কখনও হয়তো মনে হয়েছে, এত লড়াইয়ের কোনও মানে আছে কি?
কিন্তু চ্যাম্পিয়নদের একটা আলাদা গুণ থাকে। তারা সন্দেহের মধ্যেও এগিয়ে যায়।
ঘামে লেখা রূপকথা
বিশাল টি কে-র গল্পে তাই রূপকথার মতো কিছু আছে বটে, কিন্তু এই রূপকথা জাদু দিয়ে তৈরি নয়। এটি তৈরি ঘাম দিয়ে। ব্যথা দিয়ে। পুনরাবৃত্তি দিয়ে।
একজন ক্রীড়াবিদের জীবন বাইরে থেকে জাঁকজমকপূর্ণ মনে হতে পারে, কিন্তু বাস্তবে তা ভীষণ একাকী। অন্যরা যখন উৎসব করছে, তখন তাকে খাদ্যনিয়ম মেনে চলতে হয়। অন্যরা ঘুমোচ্ছে, তখন তাকে মাঠে দৌড়তে হয়।
বিশাল সেই জীবনটাই বেছে নিয়েছে।
আর আজ যখন সে মাঠে নামে, তখন শুধু একজন রানার নামে না। নামে এক লড়াইয়ের ইতিহাস।
শরীরের সীমাবদ্ধতা জীবনের সীমাবদ্ধতা নয়
ভারতের মতো দেশে, যেখানে এখনও বহু শিশু শারীরিক সমস্যার কারণে আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে, সেখানে বিশালের গল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সে প্রমাণ করেছে, শরীরের সীমাবদ্ধতা জীবনের সীমাবদ্ধতা নয়।
তার দৌড় শুধু সময়ের বিরুদ্ধে নয়। তার দৌড় ছিল ভবিষ্যদ্বাণীর বিরুদ্ধে।
মানুষ তাকে বলেছিল, “তুমি পারবে না।”
সে উত্তর দিয়েছে মাঠের উপর দাঁড়িয়ে।
এবং কী আশ্চর্য, সেই উত্তর শব্দে নয়, সেকেন্ডে লেখা হয়েছে।