Home দৃষ্টিভঙ্গি মমতা কি শুধুই স্নেহান্ধ, নাকি রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা?

মমতা কি শুধুই স্নেহান্ধ, নাকি রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা?

0 comments 10 views
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পর্ক শুধু পিসি-ভাইপোর পারিবারিক সমীকরণ নয়; এটি গত এক দশকে তৃণমূল কংগ্রেসের ক্ষমতার কাঠামোর কেন্দ্রবিন্দু। ফলে নির্বাচনী ধাক্কার পরে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকা, গ্রহণযোগ্যতা বা দায় নিয়ে দলের ভিতরে প্রশ্ন উঠলেও, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তাঁকে রক্ষা করার প্রবণতাকে শুধু “স্নেহান্ধতা” বলে ব্যাখ্যা করলে বিষয়টি অতিসরলীকরণ হয়ে যায়। এর পিছনে আরও গভীর রাজনৈতিক, সাংগঠনিক এবং ব্যক্তিগত কারণ আছে।

অভিষেকের ব্যর্থতা মানে মমতার বিচারেরও ব্যর্থতা

প্রথমত, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় শুধুমাত্র পরিবারের সদস্য নন; গত কয়েক বছরে তৃণমূলের “দ্বিতীয় ক্ষমতাকেন্দ্র” হয়ে উঠেছিলেন। প্রার্থী নির্বাচন, প্রচার কৌশল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বয়ান, যুব নেতৃত্বের উত্থান, এমনকি প্রশাসনিক তদবিরের উপরেও তাঁর প্রভাব তৈরি হয়েছিল। “ডায়মন্ড হারবার মডেল”-কে দল একসময় ভবিষ্যতের প্রশাসনিক ও সাংগঠনিক মডেল হিসেবে তুলে ধরেছিল। অর্থাৎ অভিষেকের সাফল্যকে দল নিজের সাফল্য হিসেবে প্রচার করেছে।

এখন যদি হঠাৎ দল আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে যে পুরো মডেলটাই ব্যর্থ বা ক্ষতিকর ছিল, তাহলে সেটি কেবল অভিষেকের ব্যর্থতা হবে না, তা হবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক বিচারেরও ব্যর্থতা। কারণ তিনিই অভিষেককে এতটা ক্ষমতা দিয়েছিলেন।

উত্তরসূরি সংকট

দ্বিতীয় বিষয়টি হল রাজনৈতিক উত্তরাধিকার। ভারতের আঞ্চলিক দলগুলির ইতিহাস দেখলে দেখা যায়, প্রায় সব শক্তিশালী ব্যক্তিকেন্দ্রিক দলে উত্তরসূরি নির্মাণ একটি বড় প্রশ্ন। বাল ঠাকরের পরে উদ্ধব, মুলায়ম সিং যাদবের পরে অখিলেশ, লালুপ্রসাদ যাদবের পরে তেজস্বী — এই ধারা ভারতীয় রাজনীতিতে নতুন নয়। তৃণমূলেও দীর্ঘদিন ধরে অভিষেককে ভবিষ্যৎ মুখ হিসেবে তৈরি করা হচ্ছিল।

ফলে আজ যদি মমতা তাঁকে সম্পূর্ণভাবে সরিয়ে দেন, তাহলে শুধু একজন নেতার পতন হবে না; পুরো উত্তরাধিকার পরিকল্পনাটাই ধসে পড়বে। আর তৃণমূলের ভিতরে তখন বহু গোষ্ঠী একযোগে ক্ষমতার লড়াই শুরু করবে।

২০২১-এ যা ছিল আধুনিকীকরণ, ২০২৬-এ তাই বোঝা

তৃতীয়ত, “আই-প্যাক নির্ভরতা” নিয়ে দলের ক্ষোভ বাস্তব হতে পারে, কিন্তু এটিও মনে রাখতে হবে যে ২০২১ সালের বিপুল জয়ের পর সেই একই কৌশলকেই দল অসাধারণ রাজনৈতিক আধুনিকীকরণ বলে তুলে ধরেছিল। নির্বাচনী পরাজয়ের পরে রাজনৈতিক দলগুলিতে সাধারণত বলির পাঁঠা খোঁজা শুরু হয়। তখন সংগঠনের পুরনো নেতারা নতুন প্রজন্ম বা পরামর্শদাতাদের উপর দায় চাপান। তৃণমূলেও হয়তো সেই প্রক্রিয়া চলছে।

কিন্তু বাস্তবতা হল, শুধু আই-প্যাক বা অভিষেক একা কোনো নির্বাচনের ফল নির্ধারণ করে না। স্থানীয় দুর্নীতি, ক্ষমতাসীন দলের বিরুদ্ধে ক্ষোভ, সংগঠনের অবক্ষয়, প্রার্থী নির্বাচন, প্রশাসনিক অহংকার, কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত, সংখ্যালঘু ও গ্রামীণ ভোটের পরিবর্তন — সব মিলিয়েই সংকট তৈরি হয়।

মমতার রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বিশ্বাসঘাতকতাই সবচেয়ে বড় অপরাধ

চতুর্থত, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ব্যক্তিগত আনুগত্যকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেন। তাঁর রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে “বিশ্বাসঘাতকতা” সবচেয়ে বড় অপরাধ। বহু পুরনো নেতা দল ছাড়লেও তিনি তাঁদের দ্রুত ক্ষমা করেননি। অন্যদিকে, অভিষেক তাঁর প্রতি প্রকাশ্যে কখনও বিদ্রোহী অবস্থান নেননি। ফলে রাজনৈতিক ও মানসিক — দুই স্তরেই তিনি মমতার কাছে “নিজের লোক”।

সংকটের সময় অনেক নেতা স্বাভাবিকভাবেই পরিবারের বৃত্তকে আরও আঁকড়ে ধরেন। এটি শুধু বাংলায় নয়, প্রায় সব ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনৈতিক দলে দেখা যায়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও আইনি দায় এক জিনিস নয়

“তিনি কি অভিষেকের সব কাজের শরিক?” — এই প্রশ্নটি রাজনৈতিকভাবে বিস্ফোরক হলেও প্রমাণসাপেক্ষ। ভারতের রাজনীতিতে পরিবারতন্ত্র ও ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ প্রায়ই এমন ধারণা তৈরি করে যে পরিবারের এক সদস্যের উত্থান বা বিতর্ক থেকে অন্য সদস্য সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকতে পারেন না। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও আইনি দায় এক জিনিস নয়। জনমনে সন্দেহ, বিরোধীদের অভিযোগ, দলের অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ — এগুলি রাজনৈতিক বাস্তবতা; কিন্তু সেগুলিকে তথ্যপ্রমাণ ছাড়া চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বলা দায়িত্বশীল বিশ্লেষণ হবে না।

ভাঙনের বার্তা এড়াতেই সময় কিনছেন মমতা

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আছে। যদি সত্যিই দলের বড় অংশ অভিষেকের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ হয়, তাহলেও মমতা হয়তো মনে করছেন যে এখন তাঁকে দুর্বল দেখানো মানে বিরোধীদের হাতে আরও অস্ত্র তুলে দেওয়া। ক্ষমতাসীন দলগুলি প্রায়ই সংকটের সময় অভ্যন্তরীণ শুদ্ধি অভিযান এড়িয়ে চলে, কারণ তাতে ভাঙনের বার্তা যায়। ফলে তিনি হয়তো সময় কিনতে চাইছেন, অন্তত প্রকাশ্যে ভাইপোকে আড়াল করে রেখে।

পরিবার, ক্ষমতা, অস্তিত্ব

সবশেষে বলা যায়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আচরণকে শুধুমাত্র পারিবারিক স্নেহ দিয়ে ব্যাখ্যা করলে রাজনৈতিক বাস্তবতাকে ছোট করা হবে। আবার একে নিছক “অপরাধে শরিক” বললেও তা প্রমাণহীন সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাওয়া হবে। সম্ভবত সত্যিটা মাঝামাঝি কোথাও — যেখানে পরিবার, ক্ষমতা, রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, পারস্পরিক নির্ভরতা এবং দলের অস্তিত্ব রক্ষার হিসাব সব একসঙ্গে মিশে গেছে।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles