Table of Contents
পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ যখন রান্নাঘরে এসে হানা দিচ্ছে
বাংলাস্ফিয়ারঃ দশ সপ্তাহ হল পশ্চিম এশিয়ার আকাশে যুদ্ধের ধোঁয়া। কিন্তু সেই ধোঁয়া এখন ধীরে ধীরে ভারতের প্রতিটি মধ্যবিত্ত ঘরেও ঢুকে পড়ছে, গ্যাস সিলিন্ডারের দামে, বাজারের ব্যাগে, আর রিজার্ভ ব্যাঙ্কের ডলার ভাণ্ডারের ক্রমশ হালকা হয়ে আসা ওজনে। গত ১০ মে হায়দ্রাবাদের একটি জনসভায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী যখন ভারতীয়দের অন্তত এক বছরের জন্য বিদেশ ভ্রমণ স্থগিত রাখতে, সোনা না কিনতে এবং ওয়ার্ক ফ্রম হোমে ফিরে যেতে আহ্বান জানালেন, তখন একটা কথা স্পষ্ট হয়ে গেল — সঙ্কট আর বাইরের খবর নয়, সে এসে দরজায় কড়া নাড়ছে।
এই আবেদন কেবল নৈতিক উপদেশ নয়। এটি একটি অর্থনৈতিক সঙ্কটের স্বীকারোক্তি।
হরমুজ প্রণালীর তালা
হরমুজ প্রণালী, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহনপথ, এই মুহূর্তে কার্যত অবরুদ্ধ। আর সেই অবরোধের সরাসরি শিকার ভারত, কেননা এই দেশের প্রায় ৫০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল, ৯০ শতাংশ রান্নার গ্যাস এবং ৬০ শতাংশ প্রাকৃতিক গ্যাস আসে উপসাগরীয় দেশগুলি থেকে। বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারক রাষ্ট্র হিসেবে ভারত তার মোট চাহিদার ৮৫ শতাংশেরও বেশি বিদেশ থেকে কিনে আনে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭০ ডলার থেকে লাফ দিয়ে ১২০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এই মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা সরাসরি ভোক্তার কঁধে এখনও না পডলেও , তার মানে এই নয় যে দেশ মার খাচ্ছে না।
রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানির রক্তক্ষরণ
ভারত সরকার এযাবৎ পেট্রোল ও ডিজেলের দাম অপরিবর্তিত রেখেছে। পেট্রোল এখনও লিটারে ৯৪.৭৭ টাকা, ডিজেল ৮৭.৬৭ টাকায় বিকোচ্ছে দু’ বছর আগের মূল্যে। কিন্তু এই স্থিরতার পেছনে রয়েছে বিশাল আর্থিক ক্ষতি। ইন্ডিয়ান অয়েল, ভারত পেট্রোলিয়াম এবং হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়াম , দেশের তিনটি বৃহৎ রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি প্রতি মাসে ৩০,০০০ কোটি টাকা লোকসান দিচ্ছে। মোট ক্ষতির অঙ্ক ইতিমধ্যে এক লক্ষ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।
সরকার আবগারি শুল্ক কমিয়ে কিছুটা স্বস্তি দেওয়ার চেষ্টা করেছে। পেট্রোলে বিশেষ আবগারি শুল্ক লিটারে ১৩ টাকা থেকে কমিয়ে ৩ টাকা এবং ডিজেলে ১০ টাকা থেকে শূন্যে নামিয়ে আনা হয়েছে। তাতে সরকারের নিজের ঘরেই প্রতি মাসে ১৪,০০০ কোটি টাকার রাজস্ব কমছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন এই ভর্তুকির দৌড় বেশিদিন চলবে না। অর্থনীতিবিদরা বলছেন পেট্রোল ও ডিজেলে অন্তত ২০ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি না হলে কোম্পানিগুলির ভারসাম্য ফেরানো কঠিন।
টাকার অবমূল্যায়ন, বিদেশি মুদ্রার চাপ
ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক টাকার দাম ধরে রাখতে ইতিমধ্যে ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় করেছে। সংকটের তীব্রতম মুহূর্তে ডলার প্রতি টাকার দাম নেমে এসেছিল ৯৫.২১-এ, যা ঐতিহাসিক সর্বনিম্ন। ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ ভারতের বিদেশি মুদ্রার মজুদ সর্বকালীন সর্বোচ্চ ৭২৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল, কিন্তু পশ্চিম এশিয়ার সংকটের কারণে তা নামতে শুরু করেছে।
এই পটভূমিতে প্রধানমন্ত্রী মোদীর আহ্বান শুনলে তার ওজন বোঝা যায়। তিনি প্রতিটি ভারতীয়কে ‘মুদ্রা রক্ষক’ হিসেবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন। বিদেশ ভ্রমণে যত ডলার বেরিয়ে যায়, সোনা কিনতে যত বিদেশি মুদ্রা খরচ হয় — সব মিলিয়ে দেশের মজুদে যে চাপ পড়ছে, তা সামলাতেই এই আর্জি।
মুদ্রাস্ফীতি ও বৃদ্ধি কমে যাওয়া হুমকি
সংকট দীর্ঘ হলে ক্ষতির মাত্রা আরও বাড়বে। বর্তমানে মূল্যস্ফীতি প্রায় ৩ শতাংশে থাকলেও, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে তা ৪ থেকে ৪.৫ শতাংশে উঠে যেতে পারে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন। একই সঙ্গে দেশের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধি ৭.৪ থেকে ৭.৫ শতাংশের বদলে ৬.৫ থেকে ৬.৮ শতাংশে নেমে আসতে পারে। পরিবহন ব্যয় বাড়লে সমস্ত আমদানি-নির্ভর শিল্পে উৎপাদন খরচ বাড়বে। তার প্রভাব পড়বে কৃষি থেকে কারখানা, সব জায়গায়।
সরকারের কৌশল: বৈচিত্র্যায়ন ও সংযম
ভারত সম্পূর্ণ অসহায় নয়। রাশিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, নাইজেরিয়া এবং অ্যাঙ্গোলা থেকে অপরিশোধিত তেলের আমদানি বাড়িয়ে সরবরাহ বৈচিত্র্যায়নের চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি দেশের শোধনাগারগুলিতে ক্ষমতার চেয়ে বেশি উৎপাদন চালু রাখা হয়েছে এবং সাত লক্ষেরও বেশি ভোক্তাকে পাইপলাইনের গ্যাস সংযোগে নিয়ে আসা হয়েছে।
কিন্তু কাঠামোগত নির্ভরশীলতা রাতারাতি বদলানো যায় না। সাবেক ভারতীয় রাষ্ট্রদূত সঞ্জয় সুধীর এই পরিস্থিতিকে সরাসরি বলেছেন, বৈচিত্র্যায়নের সমস্ত প্রচেষ্টার পরেও উপসাগরীয় দেশগুলির উপর ভারতের নির্ভরশীলতা এখনও গভীর, এবং দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতায় দেশটি অত্যন্ত সংবেদনশীল থাকবে।
একটি সময়ের চিত্র
হায়দ্রাবাদের মঞ্চে দাঁড়িয়ে নরেন্দ্র মোদী বলেছেন, “দেশের সীমান্তে প্রাণ দিতে রাজি থাকাই কেবল দেশপ্রেম নয়। এই সময়ে দায়িত্বশীলভাবে বেঁচে থাকা, দৈনন্দিন জীবনে জাতির প্রতি কর্তব্য পালন করাও দেশপ্রেম।” এই ভাষণ কোনো নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি নয়। এটি বরং একটি চাপে পড়া অর্থনীতির কণ্ঠস্বর।
পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ থামছে না। হরমুজের মুখ খুলছে না। আর সেই অন্ধকার সুড়ঙ্গের ছায়া ভারতের প্রতিটি পেট্রল পাম্প, প্রতিটি রান্নাঘর এবং প্রতিটি বিমানবন্দরের বোর্ডিং কাউন্টারে গিয়ে পড়ছে। মোদীর আহ্বান হয়তো সাময়িক। কিন্তু সঙ্কটটি যে সাময়িক নয়,সেটাই এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগ।