Home খবর ১৭ থেকে ৭: সামাজিক ন্যায় নাকি রাজনৈতিক বার্তা?

১৭ থেকে ৭: সামাজিক ন্যায় নাকি রাজনৈতিক বার্তা?

by বাংলাস্ফিয়ার
0 comments 15 views 4 minutes read
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে সংরক্ষণ প্রশ্নটি বরাবরই স্পর্শকাতর। কারণ এটি শুধু চাকরি বা শিক্ষার সুযোগের প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সামাজিক ন্যায়, ঐতিহাসিক বঞ্চনা, পরিচয়ের রাজনীতি এবং ভোটব্যাঙ্কের হিসাব। সেই কারণেই শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত— রাজ্যের অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির সংরক্ষণ ১৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনা— বাংলার রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে প্রবল আলোড়ন তুলেছে।

সরকারের যুক্তি স্পষ্ট। তাদের বক্তব্য, ২০১০ সালের আগে পশ্চিমবঙ্গে যে ওবিসি কাঠামো ছিল, রাজ্য আবার সেই অবস্থাতেই ফিরে যাচ্ছে। অর্থাৎ, যেসব সম্প্রদায়কে দীর্ঘদিন ধরে অনগ্রসর হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল, কেবল তাদেরই তালিকাভুক্ত রাখা হবে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলে যেসব নতুন সম্প্রদায়, বিশেষত বহু মুসলিম গোষ্ঠী ওবিসি তালিকায় যুক্ত হয়েছিল, তাদের একটি বড় অংশকে বাদ দেওয়া হচ্ছে। বিজেপির ভাষায়, আগের সরকার “ধর্মভিত্তিক তোষণ” করেছিল। বর্তমান সরকার সেই “বিকৃতি” সংশোধন করছে।

কিন্তু রাজনীতির ভাষা আর সমাজবিজ্ঞানের ভাষা এক নয়। এখানেই বিতর্কের শুরু।

মমতা আমলের নীতি ও বিজেপির আপত্তি

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে সংরক্ষণ নীতিকে এক নতুন মাত্রা দিয়েছিল। বহু মুসলিম সম্প্রদায়কে ওবিসি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর পেছনে যুক্তি ছিল, বাংলার মুসলিম সমাজের একটি বড় অংশ সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে। সরকারি তথ্যও দেখাচ্ছিল, শিক্ষা, চাকরি, আয়— প্রায় সব ক্ষেত্রেই মুসলিমদের অবস্থান রাজ্যের গড় মানের নীচে। সেই বাস্তবতার ভিত্তিতেই বিভিন্ন কমিশনের সুপারিশ মেনে নতুন নতুন সম্প্রদায়কে ওবিসি স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু বিজেপি বরাবরই এই নীতিকে “মুসলিম তোষণ” বলে আক্রমণ করেছে। তাদের অভিযোগ, অনগ্রসরতার বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নের বদলে ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতি করা হয়েছিল। এখন ক্ষমতায় এসে তারা সেই অবস্থানকেই নীতিগত সিদ্ধান্তে রূপ দিল।

নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ওবিসি-এ এবং ওবিসি-বি— এই দুই উপশ্রেণিও তুলে দেওয়া হয়েছে। আগে তুলনামূলক বেশি পিছিয়ে থাকা গোষ্ঠী এবং অপেক্ষাকৃত কম পিছিয়ে থাকা গোষ্ঠীর মধ্যে পার্থক্য করা হত। বিজেপি সরকার বলছে, এই বিভাজন প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি করছিল। তাই পুরো ব্যবস্থাকে “সরল” করা হচ্ছে।

কিন্তু সমালোচকেরা বলছেন, “সরলীকরণ” আসলে সংরক্ষণের পরিধি সংকুচিত করার আরেক নাম।

হাজার হাজার পরিবারের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত

কারণ, ১৭ শতাংশ থেকে ৭ শতাংশে নেমে আসা মানে হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী ও চাকরিপ্রার্থীর সুযোগ কমে যাওয়া। যেসব পরিবার গত এক দশকে প্রথম প্রজন্ম হিসেবে উচ্চশিক্ষা বা সরকারি চাকরির দিকে এগোতে শুরু করেছিল, তাদের ভবিষ্যৎ আচমকা অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। বিশেষ করে গ্রামীণ মুসলিম সমাজে এর অভিঘাত গভীর হতে পারে।

এই প্রশ্নটিই এখন বাংলার রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু।

বিজেপির রাজনৈতিক হিসাব

বিজেপির রাজনৈতিক কৌশল এখানে অত্যন্ত স্পষ্ট। দলটি বহুদিন ধরেই বাংলার রাজনীতিকে “হিন্দু বনাম তোষণ” কাঠামোয় দাঁড় করাতে চাইছে। তাদের বক্তব্য, সংরক্ষণ কখনও ধর্মের ভিত্তিতে হতে পারে না। বিজেপি দাবি করছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার কার্যত মুসলিম পরিচয়কে কেন্দ্র করে সংরক্ষণ দিচ্ছিল। ফলে প্রকৃত অনগ্রসর হিন্দু সম্প্রদায়গুলি বঞ্চিত হচ্ছিল।

অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেস বলছে, এটি সরাসরি সংবিধানের আত্মার বিরুদ্ধে আঘাত। কারণ সংরক্ষণ কোনও দয়া নয়; এটি ঐতিহাসিক বৈষম্য সংশোধনের উপায়। যদি কোনও মুসলিম সম্প্রদায় বাস্তবিক অর্থেই পিছিয়ে থাকে, তবে শুধুমাত্র তাদের ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে সংরক্ষণ কেড়ে নেওয়া বৈষম্যমূলক।

সংবিধান কী বলে?

এই বিতর্কের ভিতরে আরও একটি গভীর প্রশ্ন লুকিয়ে আছে— “অনগ্রসরতা” কাকে বলে? ভারতের সংবিধান ধর্মের ভিত্তিতে সংরক্ষণ অনুমোদন করে না। কিন্তু সামাজিক ও শিক্ষাগত অনগ্রসরতার ভিত্তিতে সংরক্ষণ অনুমোদিত। অর্থাৎ, কোনও মুসলিম গোষ্ঠী যদি বাস্তবিক অর্থে অনগ্রসর হয়, তবে তারা সংরক্ষণের দাবিদার হতে পারে। বহু রাজ্যেই এমন উদাহরণ আছে। দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে মুসলিম সম্প্রদায়ের কিছু অংশ ওবিসি তালিকাভুক্ত।

ফলে মূল প্রশ্ন হল, বাংলায় যাদের বাদ দেওয়া হল, তারা আদৌ অনগ্রসর কি না। যদি হয়, তবে এই সিদ্ধান্ত আদালতে নতুন আইনি লড়াইয়ের জন্ম দিতে পারে।

বিজেপির জন্যও ঝুঁকি কম নয়

বাংলার মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ৩০ শতাংশ। তাদের এক বড় অংশ গত এক দশকে তৃণমূলের সামাজিক জোটের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে উঠেছিল। বিজেপির এই সিদ্ধান্ত সেই ভোটব্যাঙ্ককে আরও দৃঢ়ভাবে তৃণমূলের দিকে ঠেলে দিতে পারে। কিন্তু বিজেপির হিসাব অন্য জায়গায়। তারা মনে করছে, সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু ভোটারদের একাংশের মধ্যে “তোষণ বিরোধী” মনোভাব প্রবল হয়েছে। সেই আবেগকে আরও সুসংহত করাই এই সিদ্ধান্তের আসল উদ্দেশ্য।

অর্থাৎ, এটি শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি এক গভীর রাজনৈতিক বার্তা।

বাংলার সামাজিক চুক্তির পুনর্লিখন

বার্তাটি হল— বাংলার রাজনীতি আর আগের জায়গায় নেই। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলে যে “অন্তর্ভুক্তিমূলক সামাজিক ন্যায়” মডেল তৈরি হয়েছিল, বিজেপি সেটিকে “পরিচয়ভিত্তিক পক্ষপাত” হিসেবে তুলে ধরছে। তারা নতুন এক রাজনৈতিক ভাষা তৈরি করতে চাইছে, যেখানে সংরক্ষণকে “সমতার অধিকার” নয়, বরং “অতিরিক্ত সুবিধা” হিসেবে দেখানো হবে।

কিন্তু এই রাজনীতির সামাজিক মূল্যও আছে। সংরক্ষণ প্রশ্নে সমাজ যখন ধর্মীয় রেখায় বিভক্ত হতে শুরু করে, তখন অনগ্রসরতার আসল আলোচনা আড়ালে চলে যায়। দরিদ্র হিন্দু ও দরিদ্র মুসলিম— উভয়ের বাস্তব সমস্যাই তখন রাজনৈতিক স্লোগানের নীচে চাপা পড়ে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, সামাজিক পরিকাঠামো— এই মৌলিক প্রশ্নগুলি হারিয়ে যায় “তোষণ” বনাম “বৈষম্য”-র আবেগী বিতর্কে।

বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে এই মুহূর্তটি তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি শুধু একটি সংরক্ষণ নীতির পরিবর্তন নয়। এটি বাংলার সামাজিক চুক্তির পুনর্লিখন। একদা যে রাজ্য নিজেকে ধর্মনিরপেক্ষ ও শ্রেণিভিত্তিক রাজনীতির কেন্দ্র বলে মনে করত, সেই বাংলাই এখন দ্রুত পরিচয়-রাজনীতির নতুন পরীক্ষাগারে পরিণত হচ্ছে।

এখন দেখার বিষয়, এই সিদ্ধান্ত আদালতে কতদূর টেকে, প্রশাসনিক স্তরে কীভাবে কার্যকর হয়, এবং সবচেয়ে বড় কথা— বাংলার মানুষ এটিকে সামাজিক ন্যায়বিচার হিসেবে দেখেন, নাকি রাজনৈতিক প্রতিশোধ হিসেবে।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles