বাংলাস্ফিয়ার: যে পুলিশ অফিসার একসময় অন্যদের নিরাপত্তা দিতেন, তিনি এখন নিজের নিরাপত্তার জন্য আদালতের দ্বারস্থ।
যে ব্যবস্থার অংশ হয়ে তিনি বছরের পর বছর কাজ করেছেন, আজ সেই ব্যবস্থার ওপরই তাঁর আস্থা নেই।
বাংলার রাজনৈতিক-প্রশাসনিক নাট্যমঞ্চে নতুন সংযোজন— “আমি পুলিশ, আমাকে বাঁচান!”

নিরাপত্তার চূড়ান্ত বিজ্ঞাপন

বাংলার জনজীবনে বিজ্ঞাপনের অভাব নেই।
কেউ বলে, “দিদির দূত”।
কেউ বলে, “দুয়ারে সরকার”।
কেউ বলে, “বাংলা নিজের মেয়েকেই চায়”।
কিন্তু সম্প্রতি এক নতুন স্লোগান বাজারে এসেছে।
“আমি পুলিশ অফিসার। আমাকে জেলের ভেতরে বিশেষ সুরক্ষা দিন।”
এই স্লোগানের উদ্ভাবক শান্তনু সিনহা বিশ্বাস।
খবর অনুযায়ী, তিনি আদালতে আবেদন করেছেন যাতে তাঁকে জেলে গ্রেড-ওয়ান বন্দি হিসেবে রাখা হয়। কারণ তাঁর আশঙ্কা, সাধারণ বন্দিদের সঙ্গে থাকলে তাঁর প্রাণসংশয় হতে পারে।
এমন আবেদন শুনে বাঙালি প্রথমে অবাক হয়েছে। তারপর ভেবেছে। তারপর হেসেছে। তারপর আবার ভেবেছে। কারণ ঘটনাটি আসলে কৌতুক নয়।
এটি এক ভয়ঙ্কর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার কমেডি সংস্করণ।

পুলিশ যখন পুলিশের ভয় পায়

পুলিশের মূল কাজ কী?সাধারণ মানুষকে নিরাপত্তা দেওয়া।অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা।আইনের শাসনের প্রতি মানুষের আস্থা বজায় রাখা।এখন যদি সেই পুলিশ অফিসারই আদালতে দাঁড়িয়ে বলেন “আমার প্রাণের ভয় হচ্ছে।”
তাহলে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে—আমাদের কী হবে?
যিনি নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ ছিলেন, তিনি যদি নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর আস্থা না রাখেন, তাহলে বাকিরা কার ওপর ভরসা করবে?এটা অনেকটা সেই রেস্তোরাঁর শেফের মতো, যিনি নিজে নিজের রান্না খেতে অস্বীকার করেন। অথবা সেই ডাক্তার, যিনি নিজের হাসপাতালের ওয়ার্ডে ভর্তি হতে রাজি নন।

গ্রেড-ওয়ান বন্দি: গণতন্ত্রের বিজনেস ক্লাস

ভারতীয় জেলব্যবস্থায় “গ্রেড-ওয়ান” বন্দি মানে মোটামুটি কারাবাসের বিজনেস ক্লাস সংস্করণ। অবশ্যই পাঁচতারা হোটেল নয়। কিন্তু সাধারণ বন্দিদের তুলনায় আলাদা সুযোগ-সুবিধা। ভালো থাকার ব্যবস্থা। কিছু অতিরিক্ত সুবিধা। কিছু অতিরিক্ত নিরাপত্তা। অর্থাৎ জেলের মধ্যেও শ্রেণিবিভাগ। সাধারণ নাগরিক ভাবতে পারেন জেল তো জেলই। কিন্তু না। ভারতীয় বাস্তবতায় জেলেরও আবার ভিআইপি সংস্করণ আছে। যেমন হাসপাতালে ভিআইপি কেবিন। স্কুলে ভিআইপি কোটার অভিযোগ। তেমনই জেলেও ভিআইপি বন্দি। গণতন্ত্রে সমতা আছে। কিন্তু সমতারও আবার বিভিন্ন ক্যাটাগরি আছে।

কুমিরের চোখে জল নাকি বাস্তব আতঙ্ক?

এখানে অবশ্য একটা গুরুতর প্রশ্ন আছে। শান্তনু সিনহা বিশ্বাসের আশঙ্কা কি পুরোপুরি অমূলক? সম্ভবত নয়। কারণ পুলিশ অফিসাররা বহু অপরাধীকে গ্রেফতার করেন। বহু শত্রু তৈরি হয়। অনেকের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেন। অনেকের ব্যবসা নষ্ট করেন।অনেকের জেল হয়। সুতরাং জেলের ভেতরে প্রতিশোধপরায়ণ বন্দিদের মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা বাস্তবও হতে পারে। কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায়। এই যুক্তি মেনে নিলে প্রশ্ন উঠবে—তাহলে এতদিন সাধারণ বন্দিদের নিরাপত্তা কে নিশ্চিত করছিল?
যদি জেল এতটাই বিপজ্জনক হয় যে একজন পুলিশ অফিসার সেখানে নিজেকে নিরাপদ মনে না করেন, তাহলে জেল সংস্কার নিয়ে এতদিন কী করা হচ্ছিল?

কর্মফলের দর্শন

ভারতীয় দর্শনে কর্মফলের ধারণা আছে।

মানুষ যা করে, একদিন তার ফল পায়। এখানে কেউ দাবি করছেন না যে শান্তনু সিনহা বিশ্বাস নিরাপত্তার দাবি জানিয়ে ব্যক্তিগতভাবে কোনো অন্যায় করেছেন। কিন্তু ঘটনাটির প্রতীকী গুরুত্ব বিশাল। কারণ দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষ শুনে এসেছে—”সব নিয়ন্ত্রণে আছে।” “আইন নিজের পথে চলবে।””নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণ নেই।” আজ সেই ব্যবস্থারই এক গুরুত্বপূর্ণ সদস্য আদালতের কাছে বলছেন “আমাকে একটু বেশি নিরাপত্তা দিন।” এ যেন রাষ্ট্র নিজেই নিজের রিপোর্ট কার্ড লিখছে।

বাংলার প্রশাসনিক ট্র্যাজেডির সবচেয়ে মজার দৃশ্য

শেক্সপিয়ারের নাটকে যেমন ট্র্যাজেডির মাঝখানে বিদূষক থাকে, বাংলার রাজনীতিতেও তেমন কিছু দৃশ্য থাকে।এই ঘটনাটি সেরকম।
একজন পুলিশ অফিসার জেলে। এবং আদালতের কাছে আবেদন করছেন—“আমি পুলিশ। আমাকে আলাদা করে রাখুন।” এ দৃশ্যের মধ্যে এমন এক অদ্ভুত নাটকীয়তা আছে, যা কোনও চিত্রনাট্যকার লিখলে দর্শক হয়তো অতিরঞ্জিত বলতেন। কিন্তু বাস্তবতা মাঝে মাঝে কল্পনাকেও হার মানায়।

রাষ্ট্রের প্রতি এক অনিচ্ছাকৃত অভিযোগপত্র

শান্তনু সিনহা বিশ্বাস হয়তো নিজের প্রাণরক্ষার জন্য আবেদন করেছেন। কিন্তু তাঁর আবেদনকে অন্যভাবেও পড়া যায়। এটি আসলে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এক অনিচ্ছাকৃত অভিযোগপত্র।
তিনি যেন বলছেন—জেলব্যবস্থার ওপর আমার পূর্ণ আস্থা নেই।
সাধারণ বন্দিদের মধ্যে থাকলে আমি নিরাপদ নই।
বিশেষ সুরক্ষা ছাড়া আমি ঝুঁকিতে।
একজন সাধারণ নাগরিক যদি এই কথাগুলি বলতেন, হয়তো কেউ গুরুত্ব দিত না।কিন্তু একজন পুলিশ অফিসার বলছেন। তাই কথাগুলি অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ।

শেষ কথা: “আমাকে বাঁচান” যুগের সূচনা

বাংলার রাজনীতি ও প্রশাসনের ইতিহাসে নানা যুগ এসেছে। আন্দোলনের যুগ। পরিবর্তনের যুগ। কাটমানির যুগ। সিন্ডিকেটের যুগ।পরামর্শদাতাদের যুগ। ডেটা অ্যানালিটিক্সের যুগ। এখন সম্ভবত নতুন এক যুগ শুরু হয়েছে।
“আমাকে বাঁচান” যুগ।
নেতা বলছেন— আমাকে বাঁচান। আমলা বলছেন— আমাকে বাঁচান। পুলিশ বলছেন— আমাকে বাঁচান। দল বলছে— আমাকে বাঁচান।শুধু সাধারণ মানুষ এখনও পুরনো অভ্যাসে রাষ্ট্রের দিকে তাকিয়ে আছে। ভাবছে, কেউ হয়তো তাকে বাঁচাবে। আর সেই সময়ে রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তর থেকে একটাই উত্তর ভেসে আসছে—“আগে আমাকে বাঁচান।”
শান্তনু সিনহা বিশ্বাসের গ্রেড-ওয়ান বন্দির আবেদন তাই নিছক একটি আইনি আবেদন নয়।
এটি এক যুগের প্রতীক। একটি ব্যবস্থার আত্মস্বীকারোক্তি।
এবং বাংলার প্রশাসনিক নাট্যমঞ্চে সদ্য মঞ্চস্থ হওয়া এক অসাধারণ ব্যঙ্গ-প্রহসন, যেখানে সবচেয়ে জোরালো সংলাপটি সম্ভবত এই— “আমি পুলিশ। আমাকেই পুলিশি সুরক্ষা দিন।”